আমার কথা/নভেম্বর, ২০২০

কোভিড প্রতিষেধক

অরুন্ধতী ঘোষ

এই বিষয়টি নিয়ে কিছু লিখব ভাবছিলাম বেশ কয়েকমাস ধরেই। অবশেষে সেই লেখার অবকাশ মিলল। কোভিড প্যানডেমিক বা অতিমারী এই নামটি উচ্চারিত হবার পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশন্যাল ইনষ্টিটিউট অফ অ্যালার্জী ও ইনফেক্সাস ডিসিস-এর (NIAID) ডাঃ এন্টনী ফাউচি বলেছিলেন “একটি সফল ও সুরক্ষাদায়ী সার্স-কোভ টু (Sars-Cov 2)  প্রতিষেধক তৈরী করা এখন জনসাধারণের সুরক্ষার জন্য বিশেষভাবে জরুরী”। তিনি আরো বলেছিলেন, “ভালো প্রতিরক্ষা দেবে এমন প্রতিষেধক তৈরী করা যেমন দরকার, তেমনি এটি কবে তৈরী হয়ে বাজারে ছাড়া হবে জনসাধারণের জন্য, তা নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়”। এটি খুব সঠিক কথা, কারণ খুব ভালোভাবে পরীক্ষা না করে সবার জন্য ভ্যাকসিন ছাড়া ঠিক হবে না। আরো বড় কথা হল, ভাল ভ্যাকসিন তৈরী হলেও, সারা পৃথিবীর লোকের জন্য বানাতে হবে, সেটাও খুব বড় ব্যাপার। এই প্রবন্ধতে আমি কয়েকটি কোম্পানীর ভ্যাকসিন তৈরীর কথা আলোচনা করব এবং কি ধরণের ভ্যাকসিন এখন বাজারে আসছে এই বিষয়ে একটু বিবরণ দেব।

এম আর এন এ ভ্যাকসিন (mRNA Vaccine)ঃ এটি একটি নিউক্লিক অ্যাসিড, ডি এন এ-র মতোই, তবে গঠনে একটু তফাৎ আছে। শরীরের কোষে এই এম আর এন এ তৈরী হয় নিউক্লিয়াসে। আমাদের ডি এন এ-র মধ্যে বিভিন্ন প্রোটিনের যে তথ্য আছে, তা অনুকরণ করা হয় এম আর এন এ নিউক্লিক অ্যাসিড-এ। বিভিন্ন এম আর এন এ তখন নিউক্লিয়াস থেকে বেরিয়ে আসে কোষের সাইটোপ্লাসমে, যেখানে এম আর এন এ -র তথ্য ব্যাবহার করে প্রোটিন তৈরী হয়। কাজেই এক একটি এম আর এন এ এক একটি প্রোটিনের তথ্য বহন করে। এই রকম একটি এম আর এন এ ব্যাবহৃত হচ্ছে ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক তৈরীর কাজে। এই প্রতিষেধক সাধারণতঃ ভাইরাসের কোন একটি প্রোটিনের এম আর এন এ ব্যাবহার করে তৈরী হয়।

ডি এন এ ভ্যাকসিন (DNA Vaccine)ঃ এখানে একটি প্লাসমিড ডি এন এ (Plasmid DNA) ব্যাবহার করা হয়, যেটি হয়ত ভাইরাস সংক্রান্ত কিছু তথ্য বা সিকোয়েন্স (Protein coding sequence) বহন করছে,  শরীরে ঢুকে প্রতিরক্ষা বিভাগকে সক্রিয় করে দেবে এবং শরীরে অ্যান্টিবডি তোইরী হবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে। অনেক সময়ে অ্যাডেনোভাইরাস (Adenovirus), একধরণের ডি এন এ ভাইরাস ব্যাবহৃত হয়। এই ক্ষেত্রে এই অ্যাডেনোভাইরাস ডি এন এ ভাইরাস সংক্রান্ত কোনো প্রোটিনের তথ্য বহন করে, যা শরীরে প্রবেশ করে শরীরের প্রতিরক্ষা বিভাগকে সক্রিয় করে তোলে।

এবারে আলোচনা করবো বিভিন্ন বায়োটেক কোম্পানির কথা যারা এই মুহূর্তে সার্স- কোভ টু-র প্রতিষেধক তৈরীর কাজে এগিয়ে রয়েছে।

১) ভ্যাকসিন  এম আর এন এ ১২৭৩ (mRNA 1273)

এই ভ্যাকসিনটি তৈরী হচ্ছে মডার্না থেরাপিউটিক্‌স (কেমব্রিজ, ম্যাসাচুসেট্‌স) ও ভ্যাকসিন ইন্সটিটিউট (NIAID-এর অন্তর্গত একটি বিভাগ)।এই এম আর এন এ টি ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের তথ্য বহন করে। ভাইরাস এই স্পাইক প্রোটিন দিয়েই ফুসফুসের কোষের বাইরে যে Ace -2  রিসেপ্‌টার (Receptor) প্রোটিন থাকে, তার সঙ্গে ভাইরাস যুক্ত হয়। এই এম আর এন এ নিউক্লিক অ্যাসিডটি আবার লিপিড ন্যানোপার্টিকেল্‌স (Lipid Nanoparticles) দিয়ে চারিদিক দিয়ে সংরক্ষিত। কাজেই এই ভ্যাকসিনটি শরীরে ঢুকতে পারবে সহজেই। সার্স-কোভ-টু ভাইরাসের গোটা জিনোমের তথ্য চৈনিক বৈজ্ঞানিকরা আগেই পোষ্ট করে দিয়েছিলেন। সেই তথ্য থেকেই তৈরী এই এম আর এন এ ভ্যাকসিনটি। মাত্র ৪২ দিনে তৈরী এই ভ্যাকসিন পরীক্ষা চলাকালীন অবস্থায় ওয়াশিংটন স্টেটের সিয়াটেল শহরের একটি হাসপাতালে জেনিফার হ্যালার নামী এক মহিলা প্রথম ভলান্টিয়ার হিসেবে এই প্রতিষেধক নেন ১৬ই মার্চ।

২) ভ্যাকসিন বি এন টি ১৬২

জার্মানীতে দুটি বায়োটেক কোম্পানি Curevac ও  BioNTech (BNT 162) জোরকদমে এগিয়ে চলেছে তাদের ভ্যাকসিন তৈরীর গবেষনায়। দ্বিতীয় কোম্পানিটি (BioNTech) Pfizer (USA) -এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরেকটি এম আর এন এ ভ্যাকসিন তৈরী করেছে যার নাম বি এন টি ১৬২।

আশা করা যায় মডার্নার এম আর এন এ ১২৭৩ ও ফাইজারের বি এন টি ১৬২ অদূর ভবিষ্যতে ভ্যাকসিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে।

৩) ভ্যাকসিন আই এন ও- ৪৮০০ (INO-4800)

এই ডি এন এ প্রতিষেধক তৈরী করছে ইনোভো ফার্মাসিউটিক্যাল্‌স (Inovo Pharmaceuticals, Plymouth, Pennsylvania)। এদের ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয় ২০২০ র এপ্রিল মাসে ৩০ জন ভলান্টিয়ার নিয়ে। মে মাসে শুরু হয়ে গেছে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ৩০০০ জন ভলান্টিয়ার নিয়ে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়াতে। একা প্রায়   ১০ লক্ষ ভ্যাকসিন তৈরী করবে এই বছরের শেষে।

আমার কথা/ অক্টোবর, ২০২০

প্রবাসে শরত ঋতু

অরুন্ধতী ঘোষ

আমাদের অন্যান্য ঋতুর মতোই আমাদের ভীষণ প্রিয় একটি ঋতু, শরত। প্রতি বছর শরত তার ঝুলি ভরতি করে আনে নানা উপহার আমাদের জন্য। নীল আকাশে তুলোর মতো মেঘের রাশি, গাছে গাছে ফুলের বাহার-শিউলি, রঙ্গন, টগর করবী ইত্যাদি, ভোরের শিশির ভেজা ঘাস ও পথের ধারে ধারে কাশফুলের গুচ্ছ।সেই কবে দেখা, কিন্তু তবু শরতের কথা উঠলে মনটা অনেকদূরে চলে যায়, সেই বাংলায়, যেখানে শিউলিফুল, জলের ওপরে ভাসা পদ্ম ও ঢাকির বাজনা, পাড়ায় পাড়ায় প্যান্ডেলে অধিষ্ঠিতা দেবী দূর্গার কাছে।

উত্তর আমেরিকায় কিন্তু দেশের মতোই বিভিন্ন ঋতু ঘুরে ফিরে আসে- বসন্ত, গ্রীষ্ম, শরত ও শীত। শরতকালকে এদেশে আমরা “Fall” বলে থাকি। এইসময় সবুজ পর্ণমোচি গাছেদের পাতার রঙ বদলের ও পাতা ঝরানোর পালা।গাছেরা তাদের পাতা ঝরিয়ে শীতের চাদরে নিজেদের মোড়ে, আর বসন্তের প্রতিক্ষা করে। এই “Fall” এর সঙ্গে আমাদের দেশের শরত ঋতুর খুব একটা তফাৎ নেই। নীরব নীল আকাশে সাদা মেঘের সারি, ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাস, অসংখ্য Fall flower, যা দিয়ে আমরা মা দূর্গাকে সাজাই, অঞ্জলী দিই।

এদেশে শরত আসে প্রকৃতিকে নতুনরূপে সাজাতে। একটু আগেই বলছিলাম গাছেদের পাতা ঝরানোর কথা। গাছেরা তাদের সবুজ পাতার রাশিকে হলুদ, কমলা, মেরুন, লাল নানা রঙ এ রাঙ্গিয়ে নেয়।যেন প্রকৃতিদেবী তাঁর রঙ ও তুলি দিয়ে নিজের খেয়ালে ছবি এঁকেছেন। প্রকৃতির এই রংখেলাকে আমরা “Fall Color”। এযেন পাতার ঝরার আগে প্রকৃতির প্রোগ্রামের “Grand Finale” ।

এবার কাশফুলের প্রসঙ্গে আসি। কাশফুল ছাড়া শরত অসম্পূর্ণ। আমাদের প্রবাসে কাশফুল না থাকলেও আমরা দেখতে পাই “Fall Grasses”- অনেকটা কাশফুলের মতো দেখতে, তবে রকমভেদ আছে। রাস্তার ধারে ধারে অসংখ্য এইরকম শরতের ঘাস এদেশের শরতের আরেকটি বৈশিষ্ট্য।

প্রকৃতির এই রঙের উৎসব, কাশফুলের মতো এদেশের শরতের ঘাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় আসন্ন দূর্গাপুজার কথা। প্রকৃতির সঙ্গে  সঙ্গে আমরাও নিজেদের নতুন পোষাকে মুড়ে দূর্গাপুজায় মেতে উঠি।প্রবাসে মহালয়া শুনে দেবীপক্ষের শুরু হয় এবং বিভিন্ন শহরে দূর্গাপুজা পালিত হয় এক একটি উইকেন্ডে।

সহচরী ১৮ ২য় পর্ব/নাসীম আহমেদ/সেপ্টেম্বর ২০২০

সহচরী ১৮ ২য় পর্ব/ নাসীম আহমেদ

নাসীম আহমেদ
দিদির নামে ট্রাষ্ট ” শামীম আহমেদ মেমোরিয়াল ট্রাষ্ট”

আগের পর্বে নাসীম আহমেদের কথা শুরু করেছিলাম, কিন্তু শেষ হয়নি। এবারে আবার নাসীমকে নিয়ে এলাম আরো কথা শোনার জন্য। এই পর্বে থাকছে নাসীমের ইউ এস এ আসার পরবর্তী জীবণের কথা।

ঢাকায় পড়াশুনা চলাকালীন তার ইচ্ছা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবেন। সেই ইচ্ছা পূরণ করতে ১৯৭৫ সালে ইউনিভার্সিটি অফ পিটস্‌বার্গে মাষ্টার্স (Masters of Public administration in Graduate school of public and International Affairs, GSPIA) চলে এলেন সুদূর ঢাকা থেকে এদেশে।এক পরিচিত পরিবারের বাড়ি এসে উঠেছেন। ভোরে ঘুম থেলে উঠেই শুনলেন মর্মান্তিক খবর! শেখ মুজিবর রহমান সপরিবারে নিহত হয়েছেন আততায়ীর হাতে।শেখ সাহেব ছিলেন তাদের পারিবারিক বন্ধু। মর্মাহত হলেন খবরটি পেয়ে। এ শুধু তার পারিবারিক নয়, জাতীয় ক্ষতি!

ভালোই পড়াশুনা চলতে লাগল।সেই সময়ে খুব বেশী আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রী ছিলনা। কাজেই দু একজন ছাড়া নিজের দেশের কাউকে চিনতেন না। এখন সময়ের সাথে সাথে প্রচুর ছেলেমেয়ে বিদেশে পড়তে আসছে। এদের আত্মপ্রত্যয় দেখে নাসীমের খুব ভালো লাগে। মাষ্টার্স পড়া শেষ করলেন ভালোভাবেই। এরপর পি এইচ ডি করতে শুরু করেন। কম্প্রিহেন্সিভ (Comprehensive exam)ও কোর্স ওয়ার্ক (Course Work) শেষ করার পর বিয়ে করেন। এদেশে এসে দুজনের আলাপ। তারপর চার বছর ধরে দুজনের সম্পর্ক। নাসীম বরাবরই বিয়ের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। তার কাছে এই বিবাহ নামক সামাজিক প্রতিষ্ঠানটির কোনোদিনই খুব একটা মূল্য ছিল না। তার মতে এটি গড়ে উঠেছে পুরুষদের কথা ভেবে, মেয়েদের কথা ভেবে নয়। কিন্তু আলাপের চার বছর বাদে তার মনে হল যে তার বয়স বেড়েছে, একটি মানূষ তাকে বিয়ে করতে চাইছে, যাকে তিনি ভালোবাসেন। বিয়ে হয়ে গেল। দুজনেই ছিল অনেক গুণ, যা অপরকে পূর্ণ করত। স্বপ্ন দেখেছিলেন পি এইচ ডি করে একসঙ্গে ঢাকায় ফিরে যাবেন, পড়াবেন ও রিসার্চ করবেন একসাথে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি। তাদের অশান্তি হতে লাগল। সম্পর্কটা ছিল উদ্বায়ী (volatile)। এর জন্য তার গবেষণার কাজে ব্যাঘাত ঘটতে লাগল। তার তিনবার গর্ভপাত (Miscarriage) হল। তখন ভীষণভাবে সন্তান চাইছিলেন। না পাওয়ায় ক্রমশঃ অন্ধকারের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিলেন। এই ব্যার্থতা এবং দুঃখ তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। এর প্রভাব পড়ল তাদের সম্পর্কের ওপরে। যদিও দুজনে একে অপরকে ভালোবাসতেন, কিন্তু ঘাত-প্রতিঘাতে দুজনের সম্পর্কে ক্ষয় হতে লাগল। এইসবের মধ্যে আর পি এইচ ডি হল না। । তিনি কাজ নিয়ে চলে গেলেন ইন্ডিয়ানাপোলিসে।

 ওখানে সহকারী পরিচালক (Assistant Director)হয়ে  যোগ দিলেন “Universities Field Staff International (UFSI)” নামক সংগঠনটিতে। এই সংগঠনটি মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে গিয়ে পড়াশুনা করা যায়, অনেকটা “Study Abroad”-এর মতো।এদের কাজ ছিল ১৩ টি বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে “Seminar at Sea” প্রকল্পের আয়োজন করা। এই প্রোগ্রামটিতে স্টুডেন্টরা জাহাজে থেকে ঘুরবে বিভিন্ন দেশে। জাহাজেও পড়াশুনা হবে, আর জাহাজ বিশেষ বিশেষ দেশের বন্দরে গিয়ে থামলে সেখানেও পড়াশুনা করবে। এদের কিছু “In-house” ও কিছু “In-port” প্রফেসর ছিলেন। রাজনৈতিক রিপোর্ট আসত সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পোর্টের ফিল্ড  অফিস থেকে।নাসীমরা তাদের ফিল্ড অফিস থেকে পাবলিশ করতেন সেই সব রিপোর্ট। তার কাজ ছিল সব মেম্বার ইন্সটিটিউশনের সঙ্গে ও ফিল্ড আসোসিয়েট্‌সদের মাধ্যম হয়ে (liaison)সুষ্ঠভাবে কাজ পরিচালনা করা। এছাড়াও কনফারেন্স, সেমিনারের অয়োজন করা, গ্র্যান্ট লেখা ইত্যাদিও ছিল।এর পর তিনি প্রায় এক বছর এদের একটি প্রজেক্টে (UFSI funded) প্রধান গবেষক (Principal Investigator)হিসেবে কাজ করেন। বলাই বাহুল্য, এই প্রজেক্টের গ্র্যান্ট লেখা, ফান্ডিং আনা এবং পরবর্তীকালে পেপার পাবলিশের কাজও তিনিই করেন। প্রজেক্টটির নাম “National Policy affecting women: A study of Bangladesh, Brazil, China & Egypt)”। তার ইন্ডিয়ানাপোলিসে আসার ছয়মাসের মধ্যে তার স্বামী আসেন তার কাছে। এই সময়ে তাদের জীবণে এল একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান। নাসীমের জীবণ ভরে উঠল আনন্দে মেয়েকে নিয়ে। মেয়ে জীবণে এলেও নাসীমের কাজ কিন্তু থেমে থাকেনি। তার প্রজেক্ট ফান্ডিং পেল।ফিল্ড রিপোর্ট থেকে নিজের ভাবা প্রজেক্টে ব্রাজিল, ইজিপ্ট, বাংলাদেশ ইত্যাদি দেশে জেন্ডার সংক্রান্ত কাজ করবেন। এই কাজটি করতে তাকে ছয়মাসের জন্য বাংলাদেশ যেতে হবে। মেয়ে তখন তিন মাসের। ইতিমধ্যে স্বামী ফিরে গেছেন ইন্ডিয়ানাপোলিস থেকে পিটস্‌বার্গে তার নিজের কর্মক্ষেত্রে।

নাসীম মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে প্রজেক্ট শেষ করলেন। এই সময়ে আবার আব্বা আর আম্মার সঙ্গে দেখা হল। ভালো সময় কাটল। কাজ সম্পূর্ণ করে এদেশে ফিরে এলেন, প্রথমে ইন্ডিয়ানাপোলিস, তারপর পিটস্‌বার্গ। মেয়ে তখন দেড়বছর বয়স। এই সময় তার পি এইচ ডির উপদেষ্টার (অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অফ পিটস্‌বার্গ) সঙ্গে আবার কথা বললেন। জোর কদমে লেখা চলতে লাগল। প্রায় তিনটে অধ্যায় লেখা শেষ হল। সেই বছরের শেষের দিকে সবামীকে ছেড়ে মেয়েকে নিয়ে উঠলেন এক এপার্ট্মেন্টে। একদিন তার উপদেষ্টা তাকে জানালেন তিনি কিছুদিনের জন্য তার দেশে যাচ্ছেন, ফিরে এসে আবার কথা বলবেন। কিন্তু কথা আর হয়নি, এক বিমান দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। নাসীম এই সময়ে একটি অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ জোগাড় করেছিলেন এবং তার  সঙ্গে গভর্নর স্কুলে কাজ করে চালাতেন। চাকরী দেখতে শুরু করেছিলেন।

আবার চরৈবেতি। এবার গন্তব্যস্থল ইলিনয় স্টেটের কারবন্ডেল শহরে। সেখানে ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ইলিনয়ের International Program and Services গবেষণা প্রকল্প বিশেষজ্ঞ (Research Project Specialist)হিসেবে যোগদান করলেন। নাসীম চেয়েছিলেন একটু নিরিবিলি জায়গায় শান্তিতে মেয়েকে বড় করবেন। তিনি কারবন্ডেলে এসে সেটাই পেলেন। এখানে ছিলেন অনেকদিন, ২২ বছর। এই সময়ে তিনি নিজেকে মেলে দিলেন তার কাজে। তার কাজ হল ১) গ্রান্ট লেখা ও প্রজেক্ট তৈরী করা ও দেখা; ২) উইমেন এন্ড ডেভেলপমেন্ট (Women and Development); 3) আন্তর্জাতিক শিক্ষা সমন্নয়ক(International Edication Coordinator); ৪) শিক্ষিকা (Teaching Women Studies related courses)। এই ভাবেই ধীরে ধীরে নিজের একটি যোগ্য স্থান গড়ে তুলেছিলেন। ২০১১ সালে মাত্র ৫৯ বছর বয়সে অবসরগ্রহণ করেন।

মেয়েকে ভালোবাসেন, কিন্তু বড় হবার পরে তাকে ছেড়ে দিয়েছেন। মেয়ে ধীর, স্থির, শান্ত। কোনোদিন মাকে কোনরকম বিব্রত করেনি বা অসুবিধায় ফেলেনি। বরাবরি পড়াশুনায় ভালো। মেটিরিয়াল সায়েন্সে ইঞ্জিনীয়ারিং শেষ করে তার মেডিসিন পড়ার ইচ্ছে হল। যেই ভাবা, সেই কাজ। এখন সে এক প্রতিষ্ঠিত এন্ডোক্রিনোলজিস্ট (Endocrinologist)। নাসীমের মতে তার মেয়ে তাকে পরিপূর্ণ করেছে।

এবার আসি নাসীমের অবসরজীবণের কথায়। নাসীমের মনের কথা হল “জীবণে একার জন্য বেঁচে থাকব, এটা কোন জীবণই নয়, অপরের জন্য কিছু করব”। আগেই বলেছি দিদি শামীম ছিলেন নাসীমের ভীষণ কাছের মানুষ। তাদের দুইবোনের অনেক স্বপ্ন ছিল একসঙ্গে কাজ করবেন, গ্রামে গিয়ে ক্লিনিক করবেন ইত্যাদি। ১৯৯৯ সালে খুবই অল্প বয়সে দিদি চলে গেলেন।সেই সময়টা নাসী্মের জীবণে খুব কষ্টকর সময়। ছয়মাসের মধ্যে বাবা ও দিদি দুজনকে হারিয়েছেন। তখন থেকেই নাসীম দিদির নামে একটি বিশেষ বৃত্তি (Scholarship)-র ব্যাবস্থা করেন মেধাবী দুস্থ মেয়েদের জন্য। বিদেশ থেকেই কাজ করছিলেন। অবসরগ্রহণের পরে ২০১১ সালে শুরু করেছেন নিজের দিদির নামে “শামীম আহমেদ মেমোরিয়াল ট্রাষ্ট”। তার নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই টাকার এক-তৃতীয়াংশ  তিনি এই ট্রাষ্ট ও অবসর-নিবাস  (এর কথায় পরে আসছি)-এর জন্য রেখেছেন। তিনি এই ট্রাষ্টের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক (Founder and Executive Director)।এটি একটি নন-প্রফিট সংস্থা, উদ্দেশ্য শিক্ষাবিষয়ক এবং মানবিক কাজের প্রচেষ্টা। এই ট্রাষ্ট থেকে মেধাবী মেয়েদের ডাক্তারী, নার্সিং ও অন্যান্য সবাস্থ্য-বিষয়ক জীবিকা, বিজ্ঞান, বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, আই টি, ফটোগ্রাফি ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশুনার জন্য বৃত্তি দেওয়া হয়। এছাড়াও প্রাকৃতিক বা মানুষকৃত বিপর্যয়ে ত্রানের কাজে নিয়মিত সাহায্য করে থাকে এই সংস্থা।

এছাড়াও নাসীমের বর্তমান প্রজেক্ট হল বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য একটি অবসর-সমাজ (Retirement Community) তৈরী করা। এটিও তার নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া টাকা থেকে সম্পৃষ্ট।নাসীমের মতে বার্ধক্যে মানুষের মধ্যে প্রবল একাকীত্ব, মানসিক অবসাদ আসে। মনে হয় আমার এই পৃথিবীকে আর কিছু দেবার নেই। তাই নিজের কিছু নতুন ভাবনা নিয়ে তিনি শুরু করছেন তাই এই অবসর-নিবাস।বলাই বাহুল্য এই বৃদ্ধাবাস তৈরীর অনেক খরচ নাসীম নিজেই বহন করবেন। ঢাকার বাইরে, মেঘনার পাশে, মধ্যবিত্ত মানুষের বৃদ্ধাবাসের জমি কেনা হয়ে গেছে। এই কমিউনিটিতে ৩০ শতাংশ লোক বিনাখরচে থাকতে পারবে (যাদের ভাড়া দেবার সামর্থ্য নেই), বাকী ৭০ শতাংশকে ভাড়া দিয়ে থাকতে হবে। আর্কিটেক্ট তার পরিকল্পনা শুনে উব্ধুদ্ধ হয়ে  বিনা-পারিশ্রমিকে অবসর-বাসস্থানের প্ল্যান বানাচ্ছেন। কাজও শুরু হবার কথা ছিল, কিন্তু কোভিডের জন্য তিনি ঢাকায় যেতে পারলেন না এই বছর। আশা করা যায় সামনের বছর এই বৃদ্ধাবাস  তৈরীর কাজ শুরু হবে।

এই নিয়েই আছেন নাসীম। আব্বা আগেই চলে গেছেন। দিদি শামীম ডাক্তার, আব্বা-আম্মার দেখাশুনা করতেন। ছোটবোন ও ভাই দুজনেই বিদেশে। আব্বা মারা যাবার পর আম্মা নিজের মধ্যে গুটিয়ে যান। তাদের পৈতৃক বাড়ি আম্মা একাই ধরে রেখেছেন। তিনজন কাজের লোক নিয়ে একাই থাকতেন। ২০১১ তে আম্মার অ্যালজাইমার রোগ (Alzeimer disease) ধরা পড়ে। দিদি শামীমও চলে গেছেন অকালে। নাসীম মনস্থির করেন যে তিনি নিজে চাকরী থেকে অবসর নিয়ে আম্মাকে দেখাশুনা করবেন।  নাসীম এখন প্রতিবছর ঢাকায় যান, আম্মার সঙ্গে সময় কাটান। এখনো মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন নানাভাবে। সেই যে কৈশোরে আব্বার সমর্থনে দুই বোনের একসঙ্গে মানুষের সেবায় পথচলা শুরু হয়েছিল, এখনো থামেনি। এই মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাদের দুইবোনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, শিরায় শিরায় ছড়িয়ে আছে। দিদি চলে গেলেও নাসীমের এই পথচলা থামেনি, থামবেও না।

নাসীম ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন এবং আরো অনেক কাজ করুন এই কামনা করি।

সহচরীর কলমে/অগাষ্ট ২০২০

সহচরীর কলমে / অগাষ্ট ২০২০

Kakoli Image 1

প্রকৃতির মুখোমুখি শেষ পর্ব -তাঁবুর বাইরে

কাকলি মজুমদার

“প্রকৃতির মুখোমুখি” প্রথম পর্বে লিখেছিলাম যে এই গ্রীষ্মে প্রকৃতির কাছে ফিরবো। ২০২০ সালটা আমাদের বড় দুঃসময়ে এনে ফেলেছে। করোনার দৌরাত্য, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং গভীর অর্থনৈতিক মন্দা। জীবনের এখন আর কোন  নিশ্চয়তা নেই। এই নৈরাশ্যে, প্রকৃতিই একমাত্র আশ্রয়। বাড়ির কাছেই রকি মাউন্টেন বড্ড রুপসী। পাহাড়ের বিশালত্বের মধ্যে চলে গেলে, নিজেদের সমস্যাগুলো নিতান্ত জেলো লাগে। প্রকৃতি ধুয়েমুছে সাফা করে নতুন উদ্যোমে জীবনে ফিরিয়ে দেয়। এই মহামারি আমায় শিখিয়েছে যে জীবন বড্ড সংক্ষিপ্ত। দূরে যেতে না পারলেও, হাতের কাছে যা আছে তা করে  ফেলতে হবে। চন্দ্রানী ক’দিন ধরে ফোনে বার বার  বলছে “camping e যাচ্ছি। চল, ঘুরে আসবি।” তিনি তো সপরিবারে  RV তে চেপে Waterton National Park e ক্যাম্পিং করবেন। ওদের RV একটা চলন্ত বাড়ি। শুদ্ধ আর শিউলিও ওখানে ক্যাম্প করবে। এই স্বামী-স্ত্রীর জুটি কেনেডিয়ান বন্ধুদের সাথে ১০ বছর ধরে ক্যাম্প করছে। ওদের গাড়ীর মাথায় তাঁবু ভাঁজকরা থাকে। গাড়ীর উপরে মেলে দিলে দুজনে থাকবার দিব্বি ব্যাবস্থা। সিঁড়ি দিয়ে উঠে তাঁবুতে ঢুকে গেলেই,  বিছানা, নরম  লেপ সব আছে। ছাদের স্বচ্ছ জানালা দিয়ে আকাশও দেখা যায়। “Rooftop collapsable tent” এই রকম কিছু একটা গালভরা নাম থাকলেও, এটাকে “গাড়ী-বাড়ি” বলা যাক।

Kakoli Group photo

ছবি ১) প্রকৃতির মুখোমুখি বন্ধুরা

আমাদের না আছে RV, না আছে তাঁবু। হোটেলগুলো সবে খুলতে শুরু করছে। এখনই নিরাপদ লাগছে না থাকতে। গিয়ে সেদিনই ফিরলে – তিন-তিন ছ’ঘন্টার ড্রাইভ। তাছাড়া Waterton-এ অনেকবার গেছি। চন্দ্রানীর বর অভিজিৎদা বল্লো “আমরা Cardston-এ Fort Heritage Frontier RV Park e ক্যাম্প করছি। Waterton থেকে ৩০ মিনিট। একটা নতুন জায়গা, চলে এসো।”

RV & car house (2)

ছবি ২) আর ভি (R V) ও গাড়ী-বাড়ি

শেষে পর্যন্ত নাছোড়বান্দা বন্ধুদের জন্যই আমাদের শনিবারে কার্ডস্টোনে আসা হোল । ওরা শুক্রবার রাত্তিরে চলে গেছে। কার্ডস্টোন চাষিদের একটা ছোট্ট গ্রাম। মাত্র তিনহাজার লোকের নিবাস। এই  RV পার্কটা সবে খুলেছে বলে, বেশি লোক জানে না। তাই কোন ভিড় নেই। আমরা  গিয়ে দেখি RV আর “গাড়ী-বাড়ি” পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। পিকনিক টেবিলে জোড় আড্ডা চলছে। শুদ্ধ আর শিউলি একটু আগেই পাহাড় থেকে হাইকিং করে ফিরেছে। আমরা আসবো বলে, খুব সকালে গিয়ে ফিরে এসেছে। লকডাউনের আগে স্বাভাবিক জীবনে, আমাদের প্রত্যেক সপ্তাহেই দেখা হোত। কতদিন পরে আবার সবাইকে দেখে কি যে আনন্দ হোল! ক্যাম্প গ্রাউন্ডের এক কোণায় লাল টুকটুকে বাড়ি। সামনে একটা ঘোড়া  দাঁড়িয়ে। এরা এই জমির মালিক। আমাদের চারিদিকে যত দূর চোখ যায় ঘন সবুজ ঘাস। সামনে একটা ছোট্ট লেক। দূরে খোলা আকাশের নীচে রকি মাউন্টেন দেখা যাচ্ছে। লেকের জলে হাঁস পরিবার ছানাদের নিয়ে দিব্বি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে খেলছে। ওদের সোসাল ডিস্ট্যাসিং-এর দুশ্চিন্তা নেই। যত ঝামালা আমাদেরই। দূরে রাস্তা দিয়ে দু চারটে গাড়ি চলে গেলেই, যা কিছু আওয়াজ। তারপর চারিদিক নিস্তব্ধ।  আহা এই শান্তিতে কিছুক্ষণ থেকে, মাথাটা বেশ পরিষ্কার হয়ে গেলো।

farmer's house (1)

ছবি ৩) ক্যাম্প-গ্রাইন্ডের পাশে ফার্ম হাউস

পথে জোরালো হাওয়া পেয়েছি। সৌরভকে রীতিমতন চেষ্টা করে গাড়ী সোজা রাখতে হচ্ছিল। এই অঞ্চলে প্রবল হাওয়াকে কাজে লাগিয়ে উইন্ডমিলে ইলেক্ট্রিসিটি তৈরি হয়। রাস্তার পাশে সারিসারি সাদা পোলের মধ্যে ফ্যানের মতন লাগানো উইন্ডমিলগুলোকে যেন আদিম স্থাপত্যের মতন দেখতে লাগছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে হাওয়ার দৌরাত্যে বাইরে টেকা দায় হয়ে উঠলো। করোনা পরিস্থিতিতে, আমরা সবাই মিলে RV-এর ভিতরে ঢুকতে চাইলাম না। ওটা ওদের পরিবারের লোকেদের জন্যই থাক। শুদ্ধ পাকা ক্যাম্পার।  ওর ঝুলিতে নানা ব্যাবস্থা থাকে। সে মাথার উপরে ত্রিপল টানিয়ে দেওয়াতে বাইরে বসা গেলো। আমাদের জোর গল্প-গুজব হাসাহাসি চলছে।  এই শান্ত জায়গায় আমরাই একমাত্র সশব্দ।

Windmill

ছবি ৪)  উইন্ড মিলের সারি

কাল রাতে এখানে খুব বৃষ্টি হয়েছে। শিউলি বলছিলো “বাইরে রীতিমতন কনসার্ট শুনতে পাচ্ছিলাম।” আমি ভাবছিলাম “এই উলু জায়গায় কনসার্ট? তাও রাত্তিরে!” শিউলি বলে চলেছে “একটানা ব্যাঙ ডাকছিল। তারপরে ভোঁদর গাইতে শুরু করলো। আমি আর শুদ্ধ বাইরে এসে দেখি ঝিরিঝিরি ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। আকাশটা  ছোট-বড় তারায় ছেয়ে গেছে । আকাশের উপর থেকে নীচে ছায়াপথ জেগে উঠেছে।” যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে তো, এখানে শহর থেকে দূরে গেলে, লক্ষ-কোটি-তারায় ঠাসা ছায়াপথ দেখতে পাওয়া যায়। একবার আমরাও পাহাড়ে গভীর রাতে ছায়াপথ (Milkyway) দেখেছিলাম। মনে পড়ে গেল যে সেই অপার্থীব দৃশ্যে প্রায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে, গা ছমছম করে উঠেছিলো। এইসব বিরল অভিজ্ঞতা, কে ভোলে?

Kakoli Pic2

ছবি ৫) পাহাড়-নদী-প্রকৃতি

এরমধ্যে অভিজিৎদা চা বানিয়ে ফেলেছে। চা-এর সাথে টা খেতে খেতে, আড্ডা আরো জমে উঠেছে। আমি বেমাক্কা শুদ্ধকে বললাম “তোমরা তো সামারে সবসময়ে ক্যাম্পিং-এ যাও। কিসের টানে প্রত্যেক সপ্তাহেই যাও?” ও একটু অবাক হোল। কারণ এতো বছর মেলামেশায় এই প্রশ্ন কখনও করিনি। ও যা বল্লো, তা আমি নিজের ভাষায় লিখছি।

শহরের “concrete jungle”-এ, কাজের চাপে কিছুদিন পরপরই পালাতে ইচ্ছে করে। তাছাড়া কানাডার ভয়াভয় শীতে আমরা তো আট ন’মাস বরফচাপা-বাড়িবন্দী থাকি। তাই সামার এলেই ক্যাম্পিং। চেষ্টা করি প্রত্যেক সপ্তাহে যেতে। জানুয়ারি মাসেই কানাডার সব ক্যাম্পিং-এর জায়গা বুক হয়ে যায়। তাই অনেক আগেই আমাদের প্ল্যান করে নিতে হয়। অনেক বছর ধরে ক্যাম্প করে অভ্যাস। পুরো সিজিনে গাড়ীর পিছনে ছোট-বড় বাক্সে জিনিস গুছানো থাকে। ক্যাম্পের সাথে হোটেলে থাকবার কোন তুলনাই হয় না। আমরা খোলা আকাশের নীচে, গাছপালার মধ্যে, পাহাড়-নদীকে একেবারে জড়িয়ে থাকি। প্রকৃতিতে ফাঁকা জায়গার থাকবার একটা অদ্ভুত নেশা আছে। সকালে পাখিরা তোমায় ডেকে ঘুম থেকে জাগাবে। দিনে পাহাড়ে হাইকিং-এ যাই, সাথে কিছু শুকনো খাবার। আর রাতে ফিরে কাঠের আগুন জ্বালিয়ে তার পাশে চুপচাপ বসে থাকি। কাঠের আগুনেই রান্না হয়।  চারিদিকে জন্তু জানোয়ারের ডাক, বহমান নদীর শব্দ। ক্যাম্প করলে বাতাসের প্রত্যেকটা নাড়াচাড়া তুমি অনুভব করতে পারবে। বেশিরভাগ জায়গায় সেলফোন কাজ করে না। তাই বাইরের জগতের থেকে সম্পূর্ণ বিছিন্ন হয়ে যাই। মাথার মধ্যে কোন “to-do-list” নেই। কোন কিছুরই জন্য তাড়া নেই। তাই অনুভূতিগুলো খুব প্রখর -প্রকৃতিমুখি হয়ে যায়।  নিজের ভিতরের কত কথা শুনতে পাই। ব্যস্ত জীবনের দৌড়ে যা সাধারণত চাপা পড়ে থাকে। ক’দিনের জন্য একদম রুটিন থেকে হারিয়ে যেতে কি দারুণ যে লাগে! এটা আমাদের সারা বছরের অক্সিজেন দেয়।

আমরা চুপচাপ শুনছিলাম। এবার আমি চন্দ্রানীর দিকে ফিরি। ও বলে RVটা চলমান বাড়ি বলে, এর ভিতরে বাড়ির সব স্বাচ্ছন্দ্যই  আছে। ছোট্ট কিচেন, সিঙ্ক, ফ্রিজ, বাথরুম। তবে আমরা ক্যাম্পিং-এ এলে রাতে ঘুমাতে যাওয়া ছাড়া বাকিটা বাইরেই থাকি। “আমার শান্ত জায়গা খুব ভালো লাগে। জানিস, নিস্তব্ধতার একটা আলাদা শব্দ আছে। আমি তা এক মনে শুনি।” সৌরভ বল্লো “তোর RVটা তো চলমান বাঙালি রান্নাঘর। তা আজ পোস্ত বড়া পাওয়া যাবে?” আমি চারিদিকে তাকিয়ে দেখি “এখানে পোস্ত – একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছেনা।” দেখলাম চন্দ্রানী-অভিজিৎদা দুজনেই মিটিমিটি হাসছে।

আরো কিছুক্ষণ জমিয়ে গল্পটল্প করে, এবার আমাদের ফিরতে হবে। ওরা রাতে থেকে কাল ফিরবে। চন্দ্রানী আজ ডিনারের ব্যবস্থা করেছে। আমরা আগে খেয়ে নেবো। RVতে খাবার গরম হয়ে এল। আরি বাব্বা – ভাত, মাংস, মেথিশাক আর …প্লেটের এক পাশে দুটো পোস্ত বড়া। না ঠিকই পড়ছেন – কার্ডস্টোন ক্যাম্পিং-এ এসে পোস্ত বড়া খাওয়া হোল। এবার তাঁবুর বাইরে থেকেই ফিরে এলাম। দেখা যাক, যদি পরের বছরে সবাই মিলে ক্যাম্পিং করা যায়।

শেষকথা 👉 লকডাউনের শুরুতে, বন্ধু অরুন্ধতীর উৎসাহে ওর ব্লগ সহচরীতে লিখেছিলাম। তারপরে আর এক বন্ধু তোয়াই-এর অনুপ্রেরণায়  নিজের Facebook page সফরনামচা  খুলে লিখতে শুরু করেছি। অরুন্ধতী আর তোয়াই – তোমাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। লেখার মধ্য দিয়েই আমি মুক্তির স্বাদ পাই। সবাই ভালো থাকুন।

ফটো সৌজন্য – শিউলি রায়, সৌরভ মজুমদার

লেখিকা পরিচিতিঃ কাকলির জন্ম এবং পড়াশুনা কলকাতায়। সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর ছাত্রী।  বর্তমানে কাকালি কানাডার ক্যালগেরি শহরে থাকে সপরিবারে। অনেক  দেশ  ঘুরেছে। লেখা তার বহুদিনের সৃষ্টিশীল ভালোবাসা।  তার লেখায় ছুঁয়ে  থাকে প্রকৃতি, প্রেম পূজা আর মানুষের কাহিনী। কিছু গভীর অনুভবের আর অনুপ্রেরণার উপলব্ধি।  সে লেখে নানা স্বাদের ছোট গল্প, প্রবন্ধ, আর ভ্রমণ কাহিনী। তার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে দেশ, সাপ্তাহিক বর্তমান ও অন্যান্য পত্রিকায়।

সহচরী ১৮ ১ম পর্ব/ নাসীম আহমেদ/অগাষ্ট ২০২০

সহচরী ১৮ প্রথম পর্ব/ নাসীম আহমেদ/ অগাষ্ট ২০২০

Naseem 1

ছবি ১) নাসীম আহমেদ

স্থান কার্বন্ডেল শহর, যেখানে ইউনিভার্সিটি অফ সাদার্ন ইলিনয়ের অবস্থান।এখানকার সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশন্যাল স্টাডিস্‌ বিভাগের গবেষণা প্রশাসিকা  (Research Administrator) একটি গ্লোবাল উইমেন এন্ড লিডারশিপ (Global Women & Leadership) এর ওপরে একটি প্রজেক্ট করছেন। তিনি এই ধরণের কাজ আগেও করেছেন সরকারী ও বেসরকারী ফান্ডিং নিয়ে। এবারে আসবে আফ্রিকার মালায়ি (Malawi) থেকে ১৮ জন মহিলা। এরা সমাজসেবিকা বা সাংবাদিক অথবা স্কুল শিক্ষিকা। এদেরকে তিনি ১০০ জনের মধ্যে থেকে বেছে নিয়েছেন।মালায়ি খুব গোঁড়া ক্রিশ্চান দেশ। প্রজেক্ট শুরু হবার মাত্র কয়েকদিন আগে এদের একজনের স্বামী তাকে ফোন করলেন মালায়ি থেকে। বললেন, “আমার বউ তোমাদের প্রজেক্টে জয়েন করেছে। আমার জানার ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে ও এটা করেছে। আমি চাই না যে ও যায়।” এদিকে এদের টিকিট কাটা হয়ে গেছে স্টেট ডিপার্ট্মেন্টের অর্থে। সকালে উঠে এই প্রশাসিকা ই-মেলে তার কাছে আবেদন করলেন “তিনি অনেক আয়োজন করে মেয়েদের মালায়ি থেকে আনার ব্যাবস্থা করেছেন, টিকিট কাটা হয়ে গেছে সবার। তুমি সন্মতি না দিলে আমার এই প্রোগ্রামটা নষ্ট হয়ে যাবে। ইউনিভার্সিটির পাশেই চার্চ, ইচ্ছা করলেই তোমার বউ সেখানে যেতে পারবে।” কদিনবাদে চিঠি এল  সন্মতি জানিয়ে। মেয়েটি বাকিদের সঙ্গে  তিনসপ্তাহের জন্য এদেশে এল। এরপর প্রোগ্রাম শেষে যখন সে অল্প কিছু ডলার(honorarium)নিয়ে ফিরে যাচ্ছে, সে বললে “তো্মার জন্য আমার গ্রামের কত ছেলেমেয়ে  নতুন জামাকাপড় পেয়েছে। আমি দেখেছি আমাদের ক্যাপিটাল থেকে কত লোক বিদেশে যায়। আমি কোনোদিনই ভাবিনি আমি আসব।” এরপর তারা যখন দেশে ফিরল আমেরিকা থেকে, জাতীয় টেলিভিশন থেকে, সংবাদপত্র থেকে লোক এসেছে তাদের অভিবাদন জানাতে। এবং তাদের সাথে সামনের সারিতে হাতে গোলাপ নিয়ে বউকে অভিনন্দন জানাতে এসেছিলেন সেই মেয়েটির স্বামী।

এই প্রশাসিকা (Research Administrator) হলেন আমার এবারের সহচরী নাসীম আহমেদ।বাড়ী বাংলাদেশের ঢাকায়। এদেশে মাষ্টার্স করে পি এইচ ডি শুরু করলেও শেষ হয়নি।এরপর দীর্ঘদিন ইউনিভার্সিটি অফ সাদার্ন ইলিনয়ে কাজ করেছেন। প্রধান কাজ ছিল  Gender studies, Women studies  এর ওপর গ্র্যান্ট লিখে ফান্ডিং আনা।এই ফান্ডিং আনা হত ইউনিভার্সিটির International Studies Office এর সহযোগীতায়। মেয়েদের কেন্দ্র করে Women Studies and Sociology -র মাধ্যমে Study Abroad প্রোগাম শুরু করে বিভিন্ন ডিপার্ট্মেন্টের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে মরক্কো, কোস্টা রিকা  ইত্যাদি জয়গায় নিয়ে গেছেন। এভাবে অনেক প্রোগ্রাম তৈরী করে, সেগুলি খুবই সাফল্যের সঙ্গে চালিয়ে নিজের একটা স্থান করে নিয়েছিলেন ওই ইউনিভার্সিটিতে। মেয়েদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক  স্থান (Social and Economic Status)-এই বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করতেন।এই ভাবেই নিজের কাজকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিলেন। নাসীমের অনেক প্রজেক্ট ছিল বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আজারবাইজান ইত্যাদি দেশের কোনো ছোট শহরে বা গ্রামে (দেশের রাজধানীর বাইরে)। কাজের সূত্রে অনেকদেশ ঘুরেছেন। বেড়ানো তার অন্যতম ভাললাগা। এইভাবেই ২১ বছর কার্বন্ডেলে কাটিয়ে কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন নাসিম।না, কথা এখানেই শেষ নয়। এবার যাব নাসিমের ছোটবেলায়।

নাসীমের বাড়ী ঢাকার ধানমন্ডীতে। ছোটবেলা বেশ ভালোই কেটেছে। তারা তিন বোন, এক ভাই। দেড়বছরের বড় দিদির সঙ্গে নাসীম খুব ঘনিষ্ট ছিলেন। ছোটবোন ও ভাই নাসীমের থেকে বেশ অনেকটাই ছোট। দিদির সঙ্গে নাসীম একসঙ্গে স্কুলে যেতেন। স্কুলের শিক্ষিকারা বলতেন তারা যমজ বোন। দিদি নাসীমের পুরো জীবণ ঘিরে আছে। নাসিমের কথায় “ওকে বাদ দিয়ে কোনো শুরুও ছিলনা, -শেষও হবে না।”

নাসীমের আব্বা ছিলেন পেশায় উকিল এবং রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ভারতের বালুরঘাট (পশ্চিম দিনাজপুর), রাজশাহী কলেজে ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্ট  সরকারের আমলে নাসীমের আব্বা তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সম্পাদক (Political Secretary)হন। নাসীমদের বাড়ীতে সেই সময়কার অনেক রাজনৈতিক নেতাদের আনাগোনা ছিল, তারা সকলেই আব্বার বন্ধু ছিলেন এবং সেই সূত্রে নাসীমদের চাচা।

নাসীমের মা সংসার নিয়ে ব্যাস্ত থাকতেন। আব্বা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতেন, খেলতেন, আর মা রান্নাঘর থেকে ক্রমাগতঃ খাবার যোগান দিতেন। নাসীমের নারীস্বত্বা জেগে উঠেছে কিছুটা মাকে দেখে। আব্বা মেয়েদের খুব স্বাধীনভাবে বড় করেছেন, তখনকার বাংলাদেশে অনেকটাই রীতিবিরুদ্ধভাবে। বাড়ীতে ছেলেবন্ধুরাও আসত, গল্প হত। মেয়েরা তাদের আব্বাকে আদর্শ হিসেবে দেখে বড় হয়েছেন। আব্বা ছিলেন চলন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া, প্রচুর বিষয়ে পড়াশুনা ও জ্ঞান ছিল।নিজে আধ্যাত্মিক মানুষ হলেও তাঁর কাছে অন্য ধর্ম নিয়ে কোনো বাঁধা ছিলনা। আব্বা প্রতি শুক্রবার নামাজ পড়তে যেতেন মসজিদে। যে রিক্সাওয়ালা নিয়ে যেত, সেও সঙ্গে বসে পড়ত নামাজ পড়তে। নিজের সন্তানদের তিনি সেভাবেই বড় করেছেন। নাসীম ও তার দিদি সেই সময়কার একটি নামকরা ইংলিস মিডিয়াম ভিকারুন্নেসা স্কুলে (Viquarunnesa School) পড়েছেন। দু-তিন জন শিক্ষিকা তার জীবণের ভিত তৈরী করে দিয়েছেন।ইংরেজী ও বাংলা খুব যত্ন করে শিখেছেন স্কুলে। এখনকার বাংলাদেশের সাথে তখনকার স্কুলের পড়াশুনার পরিবেশের অনেক ফারাক।

১৯৬৮-৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানে (অধূনা বাংলাদেশ) Martial Law পাশ হল। নাসীম তখন ম্যাট্রিক শেষ করে হোলি ক্রশ কলেজে ঢুকেছেন ইন্টারমিডিয়েট পড়তে। এখানে নানরা পড়াতেন, কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছিল না এই কলেজের ওপরে। নাসীমরা ৭-৮ জন বন্ধু (যাদের বাবারা সবাই ছিলেন প্রগতিশীল মানুষ ও পরস্পরের বন্ধু) কালো ব্যাজ পরে ঢাকা ইউনিভার্সিটির “বটতলা” আর্টস্‌ বিল্ডিং-এর চত্বরে ছাত্রনেতাদের বক্তৃতা শুনতে যেতেন। এইসময় থেকেই গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র -র হয়ে গ্রামে গ্রামে গেছেন। জাফরুল্লা চৌধুরীর (পরবর্তীকালে নাসীমের প্রিয়বন্ধুর স্বামী) প্রচেষ্টায় তৈরী এই সংস্থা একটি অন্যতম অগ্রগামী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান (NGO) গরিব লোকেদের স্বাস্থ্যরক্ষার চেষ্টা করেন। এদের “নারীপক্ষ” নতুন বাংলাদেশের প্রথম মহিলা সংগঠন। এদের সঙ্গে ফ্যামিলী প্ল্যানিং ইত্যাদি শেখানোর জন্য গ্রামে যেতেন ও কাজ করে বাড়ী ফিরে আসতেন।।এসব কাজ করতে নাসিমের খুব ভালো লাগত। কোনো বিদেশী মেয়ে ফ্লিল্ম বানাচ্ছে, নাসীম তার দোভাষীর কাজ করে দিয়েছেন। একবার একটি কাজে গ্রামে গেছেন। সেখানে গ্রামের প্রধাণ চত্বরে সবাই জমায়েত হয়েছে। এক মহিলা এসেছে, কোলে বাচ্ছা নিয়ে, হাতে জখম। জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে। সে না বলাতে, আশেপাশের মহিলাদের কাছে জানা গেল তার স্বামী তাকে মেরেছে। নাসীম জিজ্ঞেস করলেন,” স্বামী মেরেছে, আপনি কিছু বলছেন না?” উত্তরে মহিলা বললেন, “স্বামী মারবে না তো কে মারবে?” ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছেন মেয়েরা অত্যাচারিত নানাভাবে। কোনোদিন দেখতেন বাড়ীর কাজের মেয়ে মার খেয়ে এসেছে।এইসব দেখে তার মনে “বিবাহ” এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি একটু একটু করে অবিশ্বাস জন্মাতে শুরু করে। এর ওপরে সমাজের প্রভাব আরো ক্ষতিকারক। আস্তে আস্তে মনে হতে লাগল যে বিয়ে করতেই হবে তার কোনো মানে নেই। আরো পাঁচটা মেয়ের মতো ঝলমলে বিয়ে, বাড়ী, সংসার- এইসব নিয়ে কোনো উৎসাহ ছিল না। এভাবেই নানা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তার চরিত্র গড়ে ওঠে।

হোলি ক্রশে পড়াকালীন নাসীম আস্তে আস্তে দেশের রাজনৈতিক যুদ্ধে ঢুকে পড়েন। বাড়ী থেকে কোনো বাঁধা ছিল না। আগেই বলেছি, আব্বা ছিলেন একজন রাজনীতিজ্ঞ মানুষ এবং মেয়েদের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন দেশের মানুষের সেবা করার। ১৯৬৮-১৯৭০ এই সময়ে তাদের বাড়ীতে তাজউদ্দিন মহম্মদ ও অন্যান্য নেতারা নিয়মিত আসতেন। শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন তার আব্বার বিশেষ বন্ধু। বাড়ী ও পারিপার্শিক পরিবেশ তার ভিতরের ভিত গড়ে দিয়েছিল। ১৯৬৯ সালে বিশাল সাইক্লোনে গ্রাম-বাংলা ভেসে গেল। তারা দুই বোন প্রফেসার ও অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে  দুটো লঞ্চ ভর্তি সামগ্রী নিয়ে রওনা হয়ে পড়লেন মানুষের সাহায্যার্থে। সঙ্গে যাচ্ছে কাপড়-চোপড়, ওষুধপত্র, ইঞ্জেকশন ইত্যাদি।গিয়ে দেখলেন গ্রামের পর গ্রাম ভেসে গেছে। কোথাও লোহার শিকে শুধু একটি হাত আটকে আছে। সমুদ্রের প্লাবনে জলের তোড়ে মানুষটির দেহটা ভেসে গেছে, শুধু যে হাতটি দিয়ে সে প্রাণপণে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল, সেই হাতটি রয়ে গেছে।

এই ত্রানকাজ করতে করতেই নাসীমের জীবণে আকস্মিক এল প্রথম রোমান্স। তিনি তখন হোলি ক্রশে পড়েন, আর সেই মানুষটি ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র। ত্রানের কাজ করার সূত্রেই প্রথম আলাপ। একদিন দেখলেন একটি ছেলে দিদির সঙ্গে গল্প করছে। মাঝে মাঝেই দিদিকে বাড়ীতে ফোন করত। একদিন নাসীম ফোন ধরলেন এবং সেই ছেলেটি বুঝে বললেন, “দিদিকে ডেকে দিচ্ছি।” সেই ছেলেটি বললে, “তোমার সঙ্গেই তো কথা বলতে পারি।” সেই প্রথম পরিচয়। তার বয়স ১৮, ছেলেটির বয়স ২১ বছর। মাত্র ২২ বছরে মারা গেছেন মুক্তিযুদ্ধে। এর মধ্যে সেই মানুষটির সঙ্গে দেখা হয়েছে ৬-৭ বার। নাসীমের এই ভালোবাসার মানুষটি ছিলেন বাংলাদেশের এক মুক্তিযোদ্ধা। মানুষটি যুদ্ধে চলে যাবার পর তিনি সোয়েটার বুনে, কাঁথা সেলাই করে পাঠাতেন মুক্তি্যোদ্ধাদের জন্য। বাংলাদেশের এই যুদ্ধ এক গভীর প্রভাব ফেলেছিল নাসীমের জীবণে যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জুড়ে আছে নাসীমের প্রথম ভালোবাসার মানুষটি। তখন প্রতিদিন রাতে একটু বেশী নামাজ পড়তেন বাংলাদেশের জন্য প্রাণপণে সংগ্রামেরত প্রতিটি মুক্তি্যোদ্ধার জন্য। এখানে বলে রাখি মুক্তিযুদ্ধ হল পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হবার স্বাধীনতা যুদ্ধ। এটি একটি স্বাধীন দেশ গড়ার যুদ্ধ যার জাতীয় ভাষা বাংলাভাষা। সেই সময়কার পটভূমিতে এবং অধূনা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্রপূর্ণ্। ১৯৭১ সালের নভেম্বরের ২০ তারিখে, ঠিক দেশ স্বাধীন হবার তিন সপ্তাহ আগে খবর পেলেন যে সেই মানুষটি মারা গেছেন যুদ্ধে। নাসীম ভেঙ্গে পড়লেন। এক গভীর শোকে আছন্ন হয়ে পড়লেন।ভীষণ রাগ আর অভিমান হল আল্লার প্রতি।তার সমস্ত প্রার্থনা ব্যার্থ করে ভালোবাসার মানুষটি চলে গেল। প্রিয়সাথীকে হারানোর যন্ত্রনায় দীর্ঘদিন কষ্ট পেয়েছেন তিনি। তার সেই শোক কাটিয়ে উঠতে প্রায় অনেক সময় লেগেছিল। সেই মানুষটির বাড়ীতে যেতে শুরু করলেন। তারাও শোকার্ত আর তিনিও। কোথাও যেন একটা যোগসূত্র তৈরী হল। ১৯৭২-এর শেষে আব্বা মালএশিয়ার Ambassador হয়ে চলে গেলেন। নাসীম তখন পড়েন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পলিটিক্যাল সায়েন্সে অনার্স নিয়ে। কিন্তু সদ্যোজাত বাংলাদেশের টালমাটাল অবস্থা।ক্রমাগতঃ পরীক্ষা পিছোচ্ছে। ১৯৭৩ সালে বাবার কাছে গিয়ে নয়মাস থাকলেন। দুই সেমেস্টার পড়লেন ইউনিভার্সিটি অফ মালায়া তে (University of Malaya)। এরপর ঢাকায় ফিরে পরীক্ষা দিয়ে বি এ পাশ করলেন খুবই কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে। এর কিছুদিন বাদে পাড়ি দিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাষ্টার্স করতে। এই পর্বে নাসীমের প্রাক-ইউ এস এ জীবণের গল্প বললাম, পরের পর্বে থাকবে তার এদেশে জীবণের কথা।

সহচরী ১৭ ২য় পর্ব/ সুস্মিতা ঘোষ/জুলাই ২০২০

সহচরী ১৭ ২য় পর্ব/ সুস্মিতা ঘোষ/জুলাই ২০২০

susmita 3 ছবি ১) সুস্মিতা ঘোষ

আবার ফিরে এলাম ১৭ নং সহচরীকে নিয়ে। আগের পর্বে বলেছিলাম সুস্মিতার জীবনের এক পর্বের কথা। এবারে বলব তার জীবনের আরেক পর্বের কথা। আগের পর্বে যে সুস্মিতাকে দেখেছি, এবার তাকে সম্পূর্ণ অন্যরূপে দেখব। জানব মা সুস্মিতা, সবায়ের সুস্মিতাদি, বাংলা স্কুলের সুসি মাসী ও রামকৃষ্ণ বেদান্ত সোসাইটি অফ পিটস্‌বার্গের “দি” হিসেবে।

এবার একটু পিছিয়ে যাই। সময়টা ১৯৮৪ সাল।  বিয়ে হয়ে কুনালের সঙ্গে এলেন আইওয়াতে। দুবছর পরে তাদের প্রথম সন্তান সায়ন এল পৃথিবীতে। এরপর কুনালের পি এইচ ডি শেষ হলে পরিবারটি রওনা দিলেন জ্যাকসন, মিসিসিপির দিকে। এখানেই কুনালের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে কাজ শুরু হল। নতুন শহরে নতুন সংসার। সুস্মিতা চেষ্টা শুরু করলেন ডেন্টিস্ট্রি পড়ার ব্যাপারে। জানলেন সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। ঠিকঠাক খবর পান নি, আর মিসিসিপি ছোট জায়গা। যাই হোক আরো দেড় বছর সায়নের সঙ্গে কাটিয়ে সায়নের প্রি-স্কুলে যাওয়া শুরু হতে তিনিও জ্যাকসন স্টেট ইউনিভারসিটিতে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স (Environmental Science) -এ মাষ্টার্স করতে শুরু করলেন।  মাস্টার্স এ রিসার্চ করতেন বলে সকালে ছেলেকে প্রি স্কুলে দিয়ে ল্যাব এ যেতেন, প্রি স্কুল শেষ হলে বাড়ি ফিরে রাতে আবার ক্লাস। মাষ্টার্স এ প্রথম বছর থেকেই স্থানীয় কম্যুনিটি কলেজে পার্ট টাইম পড়াতে শুরু করলেন। ১৯৯০ তে যখন মাষ্টার্সের থিসিস লিখছেন, তখন ছোট ছেলে দীপন হল। এরপর আর না থেমে পি এইচ ডি তে যোগ দিলেন ডাঃ রাইন এর কাছে। বাবা বিয়ের সময় কুণাল কে বলেছিলেন “ওর যা পোটেন্‌সিয়াল, উচ্চশিক্ষা করে ভালো লাগবে।” প্রথম বছর দীপনের ডে-কেয়ার নিয়ে একটু ঝামেলা হল। যা দেখলেন, পছন্দ হল না। অবশেষে একটিতে সপ্তাহে তিনদিন রাখতেন, বাকী সময়ে সঙ্গে কাজে নিয়ে যেতেন। ল্যাবরেটরীতে লেড, ক্যাডমিয়াম নিয়ে কাজ হত, ছোট্ট দীপনকে বেশী নিয়ে যেতে চাইতেন না। শ্বশুর – শাশুড়ি প্রত্যেক দুবছরে ছয়মাস করে এসে থাকতেন তাদের সঙ্গে।এসবের মধ্যেই দীপনের কিন্ডারগার্ডেনের সময় হয়ে গেল। ইতিমধ্যে অসম্ভব ব্রিলিয়্যান্ট বড়ছেলে সায়ন ৫ বছরের মধ্যে ১-৮ ক্লাসের সবকিছু শেষ করে মাত্র ৯ বছরে ক্লাশ নাইনে ভর্তি হয়ে ১৩ বছরের মধ্যে ১২ ক্লাশ পাশ করল। মায়ের পি এইচ ডি আর ছেলের হাই স্কুল গ্রাজুয়েশন একসঙ্গে হল। এবার কলেজে ভর্তি হতে হবে।কিন্তু ১৩ বছরের ছাত্রকে কোনো কলেজ নেবে না। ইউনিভার্সিটি অফ মিনেসোটা, মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটি অনেক টাকা স্কলারশিপ দিল।  সায়ন কারনেগি মেলন ইউনিভার্সিটিতেও  চান্স পেল। কিন্তু ওরা জানাল পুরো পরিবারের ইন্টারভিউ নেবে সায়ন এত ছোট বলে। ওদের এই পরিবারটিকে ভালো লাগল। ভর্তি হযে গেল সায়ন।  ঠিক হল সুস্মিতা সায়নকে নিয়ে পিটস্‌বার্গে আসবেন, আর দীপন কুণালের সঙ্গে ক্লিনটনে থাকবে। ইতিমধ্যে কুণাল টেনিওর্ড (Tenured) হয়ে তিনটে ডিপার্টমেন্টের হেড হয়ে গেছেন। বেশ ভালোই ছিলেন চারজনে ক্লিনটনে। কিন্তু এটা তাদের অত্যন্ত মেধাবী ছেলের খুব অল্প বয়সে কলেজে ভর্তি হবার ব্যাপার, কাজেই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সব যখন প্রায় ঠিক, ছোটছেলে দীপন বেঁকে বসল।  এইরকম আলাদা থাকার ব্যাপারে সে একটুও রাজী নয়।  খুব কান্নাকাটি করতে লাগল সে। কুণাল তখন পিটস্‌বার্গে স্যাবাটিক্যাল নিয়ে আসবার চেষ্টা করতে লাগলেন। কারনেগি মেলন সব শুনে একটা বিশেষ পোষ্ট (Teaching Professor and Assistant head for  the Undergraduate Affairs) তৈরী করে তাকে নিয়োগপত্র পাঠিয়ে দিল।  সায়ন কে সিএমইউ এক সেমিস্টার জ্যাকসন স্টেট এ পড়ার অনুমতিও দিল।  ফলে গুছিয়ে গাছিয়ে   ডিসেম্বরে ক্লিনটনের পাট চুকিয়ে এই পরিবারটি  পিট্‌সবার্গে চলে এল।

Susmita 2

ছবি ২) বিয়ের পর কুণাল-সুস্মিতা

নতুন শহর, সবই নতুন! স্বামীর চাকরী, বড় ছেলের কলেজে পড়াশুনা, ছোটছেলের স্কুল- এসবের সঙ্গে সঙ্গে সুস্মিতা Adjunct Faculty হিসেবে কারনেগি মেলন-এ পড়াতে লাগলেন। কারনেগি মেলনের প্রভোস্ট (Provost) তাকে বলেছিলেন এডুকেশনের ডিগ্রী নিয়ে নিতে। কিন্তু তখন ছেলেরা ছোট, তার ওপরে আর পড়াশুনা করতে তিনি চাইলেন না। বেশ কিছুদিন পড়িয়েছেন।

এবার সুস্মিতার অন্য আরেকটি দিক নিয়ে কিছু বলব। এর জন্য অবশ্য আমাদের আবার একটু ক্লিনটন, মিসিসিপিতে ফিরে যেতে হবে, আবার ফিরে আসব পিট্‌সবার্গে। সন্তান হবার আগেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে বাচ্চাদের বাঙলা শেখাতে হবে।  তারা যেহেতু দুজনেই খুব সঙ্গীতপ্রিয়,   বড় ছেলে খুব ছোটবেলা থেকেই নানা রকমের বাংলা গান শুনে অভ্যস্ত।বাড়ীতে বাংলায় কথা বলতেন। অতটুকু ছেলে সবজায়গায় গেলে বাংলায় ঝরঝরে কথা বলে দেখে ক্লিনটন ও তার আশেপাশের বাঙ্গালী পরিবারেরা তাকে ধরল যে তাদের ছেলেমেয়েদের ও বাংলা শেখাতে হবে। ১৯৯২ সালে মিসিসিপিতে বাংলা স্কুল প্রথম শুরু হল “মিসিসিপি বাংলা একাডেমী” নামে। ক্রমে ক্রমে ওখানে নববর্ষ, সরস্বতী পুজা, বিজয়াসন্মেলনী ইত্যাদিতে যত প্রোগ্রাম হত, বাংলা স্কুলের বাচ্ছারাই প্রোগ্রাম শুরু করত। ৮-৯ টি বাচ্ছা নিয়ে স্কিট তৈরী করে সায়নের গান, অন্যান্য বাচ্ছাদের নাচ ইত্যাদি নিয়ে ৩০ মিনিটের এক একটি সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান করিয়েছেন। এরপরে ছোটছেলে দীপনও ছিল ওখানকার স্টুডেন্ট। ইউনিভার্সিটি অফ মিসিসিপির ক্যাম্পাসে একটি কমুনিটি হল ছিল। সেখানে চলত বাংলা একাডেমীর ক্লাশ শুক্রবার, একসপ্তাহ অন্তর। বড়রাও আসতেন, যারা কোনোদিন বাংলা শেখেন নি। পিট্‌সবার্গে যখন এলেন, তার দুই ছেলের বাংলা শুনে সবাই অবাক। এখানকার মায়েদের উৎসাহে বাংলা স্কুল শুরু হল ২০০৩ সালে পিট্‌সবার্গে, নাম পাঠশালা। অনেক ছেলেমেয়ে এখানে বাংলা শিখে বেরিয়ে গেছে। বড়রাও পড়েছে এবং পড়ে। ২২-২৫টি বাচ্ছা নিয়ে বাংলা স্কুলের ক্লাশ চলে। উচ্চারণে তিনি জোর দেন। প্রতিবছর এই বাচ্ছাদের নিয়ে বেঙ্গলী অ্যাসোসিয়েশন অফ পিট্‌সবার্গ-এর অনুষ্ঠানে নাটক করেন। এটি খুব জনপ্রিয়। বাচ্ছাদের তার বাংলাস্কুলের স্ন্যাক খুব ভালো লাগে।তাদের কাছে তিনি সুশিমাসী, বাংলামাসী, দিদা ইত্যাদি অনেক নামে পরিচিত। সুস্মিতা চান যে ছোটরা যেন বাংলাকে ভালোবেসে বাংলা বলে। ওদের লেসন্‌ প্ল্যান (lesson plan) তৈরী করেন সেভাবেই। পাঠশালার এখন বয়স ১৭ বছর।

susmita 1

ছবি ৩) সুস্মিতা ঘোষ

এবার আসব সুস্মিতার রামকৃষ্ণ বেদান্ত সোসাইটি অফ পিট্‌সবার্গের “দি” হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে। সত্যি গল্পের মতোই, কিন্তু সত্যি ঘটনা। বিয়ের পর দীক্ষা নিতে গেছিলেন বেলুর মঠে, কিন্তু সেবার হয়নি। পিট্‌সবার্গে এসে শুনলেন হলিউড আশ্রমের প্রধান মহারাজ স্বহানন্দজী এখানে ভক্তদের বাড়ীতে আসেন। ২০০২ সালের মে মাসে এল সেই সুসময়। প্রথম দর্শনেই মনে পড়ল নিজের শ্বশুরমশাই এর কথা,  যার কাছে তিনি অনেক ভালোবাসা পেয়েছেন। প্রথম দর্শনেই ভগবানের আসনে বসালেন, প্রণাম করলেন। প্রথম বছরে সুস্মিতার ও তার পরের বছর কুণাল ও দুই ছেলের  দীক্ষা হল।এরপর যখনই মহারাজ এসেছেন, সুস্মিতারা সপরিবারে মহারাজের সঙ্গে দেখা করেছেন। মহারাজের ইচ্ছায় পিট্‌সবার্গে একটি বেদান্ত আশ্রম খোলার আলোচনা চলতে লাগল। সুস্মিতা মহারাজের নির্দেশে বাড়ী দেখতে শুরু করলেন। কাছেই একটি বাড়ী পাওয়া গেল, বিক্রীতে আছে।মহারাজের নির্দেষে ও হলিউড বেদান্ত সেন্টারের অর্থে  বাড়ীটি কেনা হল। কিন্তু শুধু কিনলেই তো হবে না, কাজের শেষ নেই। বাড়ীটিতে অনেক কাজ করাতে হবে। সুস্মিতা একাই লেগে পড়লেন। লোক ঠিক করে বাড়ীটি আশ্রমের উপযুক্ত করার চেষ্টা চলতে লাগল। রোজ সকালে কুণাল কাজে বেরিয়ে যেতেই তিনি ছোট ছেলেকে নিয়ে চলে যেতেন আশ্রমের বাড়ীটিতে বাড়ী পরিষ্কারের কাজে। দীপন সেই বছরেই গ্রাজুয়েট স্কুলে চলে যাবে। তার আগের একটু অবসর সময়ে সে পরিষ্কারের কাজে মাকে সাহায্য করতে লেগে পড়ল। মহারাজ বাড়ী দেখতে এলেন, বলে গেলেন সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখে আশ্রমের উদ্বোধন হবে। সুস্মিতা একটা Remodeling এর প্ল্যান করেছিলেন।  মহারাজ বলে দিলেন যে যাবতীয় খরচ মহারাজ দেবেন। ইতিমধ্যে আরেকজনকে সুস্মিতা পেয়ে গেলেন।অল্পবয়সী যুবক নাম হরিচরণ মন্ত্রিপ্রগাদা, কার্নেগী মেলন এ সদ্য Ph.D করে Post Doctoral Fellow হিসেবে কাজ করছে।  তার ইচ্ছে সে আশ্রম প্রতিষ্ঠার ব্যপারে সাহায্য করবে। সেই শুরু হল যাত্রা। সব কাজ সুষ্ঠ ভাবে হয়ে গেল। ২০০৯ সালে আশ্রমের উদ্বোধন হল। তিনি মহারাজের নির্দেশে জেনারেল ম্যানেজার নিযুক্ত হলেন। তার কাজ হল গোটা আশ্রমের তদারকি করা। এক কথায় জুতো সেলাই থেকে চন্ডী পাঠ করা।  মহারাজ বছরে দুবার করে আসতেন। এছাড়াও অন্যান্য মহারাজরা বিভিন্ন সেন্টার থেকে আসতে লাগলেন, লেকচার, আধ্যাত্মিক আলোচনা চলতে লাগল। বেলুর মঠের তালিকা অনুযায়ী আশ্রমে নানাবিধ উৎসব ও চলতে লাগল। ভক্তরাও আসেন। তাদের সাহা্য্যে আশ্রম একটা পূর্ণাঙ্গ আশ্রমে পরিণত হয়ে উঠলো। ক্রমশঃ একটি বাড়ীতে আর আশ্রমের স্থান সঙকুলান  হল না। মহারাজরা এলে, অন্যান্য স্টেট থেকে ভক্তরা আসেন। থাকবার অসুবিধা। আশ্রমের বাড়ীটির পাশেই আরেকটি বাড়ী বিক্রীতে ছিল।মহারাজের নির্দেশে সেই বাড়ীটি কেনা হল ২০১১ সালে। এখন পাশাপাশি দুটি বাড়ীতে পিট্‌সবার্গের রামকৃষ্ণ আশ্রম অবস্থিত। নতুন বাড়ীটিতে একটি লেকচার হল, মহারাজদের থাকবার ব্যাবস্থা, নিচে রান্নার ও খাওয়ার ব্যাবস্থা। প্রথম বাড়ীটিতে মন্দির, লাইব্রেরী এবং নীচে মহিলাদের থাকবার জন্য একটি বড় ঘরের ব্যাবস্থা হয়েছে। দুটি বাড়ীর পিছনের লনকে একত্র করে একটি বড় পার্কিং-এর ব্যাবস্থা হয়েছে। সবকিছু একদিনে হয়নি। আস্তে আস্তে হয়েছে। এর পিছনে কিন্তু আছেন সুস্মিতা এবং আশ্রমের ভলান্টিয়াররা।সব ছেলেমেয়েদের কাছে তিনি “দিদি” বা “দি”। এইভাবেই সুস্মিতা অক্লান্তভাবে কাজ করে চলেছেন। ২০১৯ এ আশ্রমের ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বেশ বড় করে অনুষ্টান হয়েছে প্রেসিডেণ্ট মহারাজ শ্রী সর্বদেবানন্দজীর উপস্থিতিতে। এখানে একটা কথা বলার আছে।সুস্মিতা তার সব কাজেই কুণালকে পাশে  পেয়েছেন। স্বহানন্দজী মহারাজ দেহ রেখেছেন। তিনি বলতেন, “তোমরা একদম একটা Presbyterian Minister Couple, কুণাল কথা বলবে, আর তুমি কাজ করবে”।

বাংলা স্কুল এবং আশ্রমের কাজ ছাড়াও সুস্মিতা এখানকার স্থানীয় বাঙ্গালী সংগঠন বেঙ্গলী অ্যাসোসিয়েশন অফ পিট্‌সবার্গের (BAP) সঙ্গে যুক্ত দীর্ঘদিন ধরে। পরপর দুবছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও বাচ্ছাদের নিয়ে নিয়মিত অনুষ্ঠান করেন। কুণাল সম্প্রতি অধ্যাপণা থেকে অবসর নিয়েছেন। বড়ছেলে সায়ন কম্পুটার সায়েন্টিষ্ট এবং Lawyer , চাকরী করে ডিসিতে। ছোটছেলে দীপন ইয়েল স্কুল থেকে নিউরোসায়েন্স এ পি এইচ ডি করে বর্তমানে বোষ্টনের এম আই টিতে পোষ্ট-ডক্টরাল সায়েন্টিষ্ট। এইভাবে স্বামী কুণাল, দুই ছেলে, বড়ছেলের স্ত্রী প্রিয়া (হেল্থ কনসালটেন্ট) এই নিয়ে তার সংসার। সুস্মিতা ভাল থাকুন, আরো কাজ করুন মানুষের জন্য এই কামনা করি।

 

 

সহচরী ১৭ ১ম পর্ব/ সুস্মিতা ঘোষ/ জুন ২০২০

সহচরী ১৭ ১ম পর্ব/ সুস্মিতা ঘোষ/ জুন  ২০২০

IMG_8547 (1)

স্থান বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল, গাঁয়ের পথ দিয়ে একটি পালকি চলেছে। পালকির মধ্যে বসে আছে  ১৮ বছরের একটি নববধূ। বিয়ে হয়ে চলেছে শ্বশুরবাড়ী। রাস্তা আর ফুরায়না। প্রথমে ট্রেনে, তারপর ভ্যানরিক্সা, তারপরে পালকি। একভাবে বসে আছেন কোনরকমে পালকির মধ্যে, নড়াচড়া করা যাবে না। গ্রামের পর গ্রাম পার হয়ে যাচ্ছেন। পৌঁছলেন প্রায় মাঝরাতে। শাঁখ, উলু দিয়ে বউ বরণ হল।সবাই ভালো করে মেয়েকে মেপে দেখে নিল সব ঠিকঠাক আছে কিনা। মাথার চুল, হাত, পা ইত্যাদি। মনে হচ্ছে খুব আগেকার কথা তাই না? সময়টা কিন্তু খুব আগেকার নয়। ১৯৮০ সালের কথা। নতুন বর পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, এম-ফিল করছেন কেমিষ্ট্রি্তে, নতুন বউটি পড়ে ঢাকার ডেন্টাল স্কুলে। সবে দ্বিতীয় বছরে উঠেছে। এই বিয়ের কথা চলছিল অনেকদিন ধরে। সম্বন্ধ এসেছিল আগেই ছেলের বাড়ী থেকে। তখন মেয়ে স্কুলে পড়ে, তাই বিয়ে হয় নি। এরপর স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে, ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে কলেজে ভর্তি হতে আর ঠেকিয়ে রাখা গেল না।

এই মেয়েটি হলেন আমার এবারের সহচরী, নাম সুস্মিতা ঘোষ। বিয়ের ঘটনা দিয়ে শুরু করলেও ফিরে যাব সুস্মিতার ছোটবেলায়। জন্ম এবং বড় হওয়া সবই বাংলাদেশে। বাবার আদি বাড়ী যশোরে। কাকা পরবর্তী কালে পশ্চিমবঙ্গে চলে এলেও বাবা বাংলাদেশে রয়ে যান। পেশায় উকিল বাবার বদলীর চাকরী ছিল। সুস্মিতার জন্ম হয়েছে বগুরায়। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। তিন বোন, দুই ভাই। বড় দিদি সুস্মিতার থেকে ১৮ বছরের বড়। দিদির কাছে খুব আদরে বড় হয়েছেন। ছোটবেলা থেকে বিয়ের আগে অবধি জীবণ ভরে ছিল আনন্দে। মা ছিলেন খুব করিতকর্মা। সাংসারিক কাজকর্ম ছাড়াও ভালো লিখতে পারতেন। যখনি সময় পেতেন লিখতেন। তখনকার দিনে “বেগম” পত্রিকার নিয়মিত লেখিকা ছিলেন।

৪ বছর বয়সে বাবার কর্মসুত্রে দিনাজপুরের এক গ্রামে বদলী হলে তারা সবাই চলে এলেন সেখানে। বড়দি তখন ঢাকা ইডেন কলেজে থেকে বেড়িয়ে এক কনভেন্ট স্কুলের শিক্ষিকা, বড়দা ঢাকা কলেজে পড়ছেন। ঢাকা শহর থেকে এসে গ্রামের মধ্যে ওদের কিন্তু কোনো অসুবিধাই হল না। মা কিছুদিনের মধ্যেই সবাইকে আপন করে নিলেন। স্কুলের অনুষ্ঠানগুলোতে নিজে নাটক লিখে, গান তৈরী করে, শিখিয়ে, পোষাক বানিয়ে মজাদার সব অনুষ্ঠান নামিয়ে দিতে পারতেন।

এরপর ৮ বছর বয়সে সুস্মিতা বাবার কর্মসুত্রে দিনাজপুর শহরে এসে সারদেশ্বরী স্কুলে ভর্তি হলেন। ততদিনে দিদির বিয়ে হয়ে গেছে ভারতের জলপাইগুড়িতে। দাদাও চাকুরী সূত্রে দেশের বাইরে। মা, বাবা, ছোড়দি, ছোড়দা আর ছোট সুস্মিতাকে নিয়ে এক আনন্দের পরিবার। ছোড়দির খুব জীব জন্তু পোষার বাতিক ছিল। একবার ছোড়দির সখ  হল বাড়ীতে মুরগী পুশবে। তার সাকরেদ ছিলেন সুস্মিতা। এরমধ্যে একটি কালো, আরেকটি মেরুণ মুরগী ভালো ডিম দিত। তারা গাছে ঝাঁপ দিতে দিতে ডিম পাড়ত, আর সুস্মিতার কাজ ছিল মুরগী কলাগাছে চড়লেই হাতে বাস্কেট নিয়ে সেই পড়ন্ত ডিম ধরে ফেলার। এছাড়াও বেড়াল,কুকুর, হাঁস তো ছিলই। একবার গরুর শখ ও হয়েছিল, কিন্তু মায়ের বকাতে সে আর হয় নি।

ছোটবেলা থেকেই খুব খোলামেলা পরিবেশে বড় হয়েছেন। পড়া শেষ করে রোজ ছোড়দার সঙ্গে পাড়া টহল দিতে বেরোতেন। বেড়াল, কুকুরদের ঘুম থেকে তুলে দিতেন, তারা কিরকম করে আড়মোরা ভাঙ্গে আর কি কি করে খুব নকল করে দেখিয়ে সবাইকে আনন্দ দিতেন। বাড়ীর সবাই রবীন্দ্রসঙ্গীত ভালোবাসতেন। ছোড়দা তাকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বৈচিত্রময় অনেক গান জোগাড় করে শোনাতেন। রবিবারের ছায়াছবির গানের অনুষ্ঠান ছিল ছিল সবার প্রিয়। বাড়ীতে ছিল অনেক বই, পড়েছেন এবং মায়ের কাছে শুনেছেন। বাবা ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। নাটক, কবিতা সব মুখস্থ ছিল। এভাবেই  তিনি শুনে শুনে বড় বড় সব বিখ্যাত কবির কবিতা শিখেছেন। ম্যাকবেথ, ওথেলো, এসবও বাবা অনায়াসে বলে যেতেন। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়েন। তাদের বাড়ীর রাস্তার পাশে এক বিশাল কালিবাড়ী ছিল, সঙ্গে এক বিশাল বটগাছ। একদিন হঠাৎ শোনেন চিৎকার! এক পকেটমারকে ধরে সবাই খুব মারছে। তিনি আর কিছু না ভেবেই সটান গিয়ে তার ওপর গিয়ে পড়লেন আর বলতে লাগলেন “ওগো ওকে তোমরা মেরো না, ওকে পুলিশে দাও।” পিটুনি থেমে গেল। সবাই পকেটমারকে থানায় নিয়ে গেল। এদিকে বাড়ীতে মা লাঠি নিয়ে বসে আছেন মেয়েকে শাসন করবেন বলে। বাবা বললেন “তোকে নিয়ে আমার গর্ব হচ্ছে!” ছোড়দি বললেন “মা তোমার এই মেয়ে পাগল!” একবার হল কি মা সেলাই করছিলেন সেলাই কলে। সুস্মিতা গেছেন বন্ধুদের সাথে খেলতে।অন্যমনস্ক হয়ে হাতের ওপর মেশিন চালিয়ে দিলেন। তর্জনীতে সূঁচ ঢুকে গেল। ছোড়দি দেখে চিৎকার করতে লাগল, ছোড়দা দেখেই বাড়ী থেকে বেরিয়ে সুস্মিতাকে ডাকতে গেল। সুস্মিতা গিয়ে মায়ের আঙ্গুলটা ধরে দাঁত দিয়ে সূঁচটা বার করে দিলেন। যেন কিছুই হয়নি।মা মেয়েকে দেখে অবাক হয়ে গেছেন। এরপর অ্যান্টিবায়োটিক ক্রিম লাগানো হল। সেই দিন খেতে বসে শোনেন মা বাবাকে বলছেন “একে ডাক্তার বানানো উচিৎ।” তখন সুস্মিতা পড়েন সপ্তম শ্রেনিতে।

এরপর ছোড়দি রাজসাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ছোড়দা ঢাকায় মেডিক্যাল কলেজে পড়তে গেলেন। কিছুদিন পর সুস্মিতা ঢাকায় গেলেন ইন্টারমিডিয়েট পড়তে ইডেন গভর্ন্মেন্ট গার্লস্‌ কলেজে বিজ্ঞান নিয়ে। পড়াশুনায় বরাবর ভালোই ছিলেন, বৃত্তিও পেয়েছেন স্কুলে ও কলেজে। মেডিক্যালের বদলে ডেন্টিস্ট্রি নিয়ে পড়বেন ভাবলেন। ইডেন কলেজে পড়ার সময়ে একবার দাঁতের ব্যাথায় কষ্ট পেয়েছিলেন। ছোড়দার ডেন্টিষ্টবন্ধু আনসারীভাই তার দাঁতের ফিলিং করে দিলেন, সব ব্যাথা চলে গেল।সেই দেখে তার মনে হল “ডেন্টিষ্ট হলে আমি তো লোকের দাঁতের ব্যাথা এক পলকে ভালো করে দিতে পারি!” বাবাকে বোঝাতে হল। বললেন যে ডেন্টিষ্ট্রি তার ভালো লাগে, ডেন্টিষ্টদের এমারজেন্সি ডিউটি থাকে না, ছোটাছুটিও কম। ভর্তি হয়ে গেলেন ঢাকা ডেন্টাল কলেজ এ (Dhaka dental college and hospital)।খুব ভালো লাগল ডেন্টিষ্ট্রিতে পড়তে ঢুকে। পড়াশুনায় বরাবরি ভালো ছিলেন।ভেবেছিলেন ওরাল সার্জেন (Oral Surgeon) হবেন। কিন্তু পড়া শেষ হবার আগেই বিয়ে হয়ে গেল। তখন সুস্মিতা থাকেন মেডিক্যাল কলেজের হোষ্টেলে।

images 2

এবার বিয়ের কথায় আসি। স্কুলে পড়ার সময়েই বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল, বিয়ের কথা ঠিক হয়ে ছিল। আগেই বলেছি পাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিষ্ট্রিতে এম-ফিল করছে। ডেন্টাল কলেজে দ্বিতীয় বছরে ওঠার পর বিয়ের দিন ঠিক হল। এরমধ্যে একদিন হবু বরের সঙ্গে দেখা করলেন। প্রথম আলাপে খুব একটা অভিভূত হলেন না। তবুও ভাবলেন কিছু করার নেই, অনেকদিন ঠিক হয়ে আছে। বাবার একটাই ইচ্ছা ছিল মেয়েকে পড়তে দিতে হবে। বিয়ে হয়ে গেল। স্বামীস্ত্রী ঢাকায় ফিরে এলেন। যে যার নিজের মত হোষ্টেলে থাকতেন।মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতে যেতেন একসঙ্গে, কিন্তু ফিরে আসতেন মনখারাপ নিয়ে। কথা হলেই দুজনের মতের অমিল হত। সবসময়ে সুস্মিতার দোষ দেখেন, তার সবকিছুতেই আপত্তি। ছোটদেওর পড়তো ঢাকা মেডিক্যালে। তার কাছ থেকে অনেক উল্টো-পাল্টা খবর পেত আর দেখা হতেই দুজনের অশান্তি হত। এরপর পরবর্তী দুটো বছর তার জীবণ দুর্বিসহ  করে দিয়েছিল। কোন অধ্যাপক স্নেহ করতে পারবে না, কোন বন্ধু হতে পারবে না ইত্যাদি অনেক শর্ত। যখনি মনখারাপ নিয়ে হোষ্টেলের ঘরে ফিরে আসতেন, সবচাইতে কাছের বন্ধু চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলত “ছাইর‍্যা দাও।” এরপর মাষ্টার্স করতে বর চলে গেলেন ক্যানাডায়। তিনি ডেন্টাল পাশ করে ওরাল সার্জারীতে ইন্টার্ন করতে শুরু করলেন। এদিকে বাড়ী থেকে বাবা-মা বলছেন ক্যানাডা যেতে। কি করবেন জানতে চাইলে বর লিখলেন, “বাবাকে বলো টাকা দিতে। কিছুই শিখলে না। বাবা-মায়ের কাছে টাকা নিতে শেখো।”  সুস্মিতাও জেদী, কিছুতেই বাবার কাছে টাকা নেবেন না। বলেই দিলেন, “তাহলে আমি যাবো না।” অবশেষে বরের টিকিটে যাবার দিন ঠিক হল। তিনি পাড়ি দিলেন সুদূর ক্যানাডায়। ওখানে তারা একটি পরিবারের বাসায় একটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকবেন। ভাই আর ভাবী, তাদের দুই বাচ্ছা। এক বাসায় থাকলেও তাদের রান্না আলাদা। তিনি দেখলেন তার স্বামী তার হাতে একটি পয়সাও দেন না, সকালে, বিকেলে কি রান্না হবে সব বলে দেন। এবং খাবার ব্যাপারে তার জন্য সবকিছু মাপামাপি। এই নিয়ে সুস্মিতা কোনদিন কোন প্রশ্ন তোলেন নি। মুরগী রান্না হলে, দুটো ড্রামস্টিক (Drumstick, মুরগীর ঠ্যাং) ও একটা  উয়িং (wing, ডানা) রান্না হবে। সুস্মিতা যেহেতু মেয়েমানুষ, তাই তার জন্য বরাদ্দ কম পয়সার ডানার মাংস। ছোট থেকেই কখনো কিছু চাওয়ার অভ্যেস ছিল না। তাই কোনদিনই এই ব্যাপারে কিছু বলেন নি, মুখ বুজে থেকেছেন। মাঝে মাঝে ভাবীর সঙ্গে বাজারে যান।সংসারের যা কিছু বাজার হয় সব দাম ভাবী দেন, পরে তার স্বামীর কাছ থেকে নিয়ে নেন। ভাবী দেখেন এদের সংসারের অদ্ভুত নিয়মকানুন, বেশ কয়েকবার তাকে উপদেশ দিয়েছেন, সাবধান করেছেন, কিন্তু সুস্মিতা গায়ে মাখেন নি। এদিকে দেশ থেকে বাবা চিঠিতে লিখলেন পড়াশুনা শুরু করার কথা। স্বামীকে বলতে উড়িয়ে দিলেন।

download

এরপর তারা এলেন আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পি এইচ ডি করতে। সদ্যাগত বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের বাড়ীতে নেমন্তন্ন করলেন ভেটেরিনারী স্কুলের প্রফেসর ও তার স্ত্রী। প্রচুর রান্না। বিশাল টেবিল জুড়ে এলাহি ব্যাবস্থা। এখানে শুনলেন কুণাল ঘোষ নামে আরেকজন বাঙালি ছাত্র এসেছে ফিজিক্সে পি এইচ ডি করতে, সে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট। পড়িয়ে আসতে তার দেরী হবে। সবাই খাবার নিয়ে টিভিতে সিনেমা দেখতে বসেছে ড্রয়িংরুমে। এমন সময়ে একজন এসে ঢুকলেন। তিনি এত খাবার দেখে কোথা থেকে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না। সুস্মিতা তাকে সব দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন। পরেরদিন সকালে কুণাল ফোন করে তাকে ধন্যবাদ জানালেন, সেই থেকে কুণাল এই পরিবারের পরিচিত হয়ে গেলেন। সুস্মিতারা থাকে স্টুডেন্ট আপার্ট্মেন্টে। আবার সেই হিসেব করে জীবণ। প্রত্যেক পাই-পয়সা গুনে বাজার। বাসে করে বাজার করতে যেতেন, বাজার বয়ে এনে রান্না করতেন রোজ দুটো ড্রামস্টিক আর একটা ডানার ঝোল। বাজার হত সাতদিনের সাতটা কমলালেবু তার স্বামীর জন্য। কথা শুনতে হত “এই যে তুমি প্রতিদিন চা খাও, আমার পাঁচ সেন্ট করে রোজ যায়। তুমি তো আবার দিনে দুবার চা খাও।” বাড়ীতে লোক ডেকে খাইয়ে রান্নার প্রসংশা পেলে বা পার্টিতে গিয়ে গান গাইলে, মজার কথা বললে, তার স্বামী বিরক্ত হতেন। আর সমানে তার নিজের বাড়ীর লোকের নিন্দে শুনতে হ্ত। এরমধ্যে আরো ঝামেলা জুটল। কোর্স ওয়ার্কে ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রির পরীক্ষায় তার বর সি ( C ) পেতে লাগলেন। যত ব্যার্থতা আসতে লাগল, ততই তার রাগ বেড়ে যায়। একদিন কুণালকে জিজ্জেস করে বসলেন “তুই কেমিষ্ট্রি পড়েছিস? তোকে দেখে মনে হয় খুব ব্রাইট, আমার হোমওয়ার্ক করে দিবি?” কুণাল উত্তরে বললেন, “করে দেবো না, তবে সাহায্য করতে পারি।” পরে শুনলেন কুণালকে পান্তুয়া খাইয়ে কাজ উদ্ধার করার প্ল্যান। এদিকে কুণাল কিছুতেই তার কোর্সের হোমওয়ার্ক করে দেবে না। পুরো হোমওয়ার্ক করে দেবার মধ্যে যে নৈতিক সমস্যা থাকতে পারে, এটা সুস্মিতার বরের মাথায় আসতো না। অগত্যা বাড়ীতে নেমন্তন্ন করতে শুরু করলেন। বলে দিলেন “আমাকে পড়াবি, রাতে খেয়ে যাবি।” প্রথমদিন কুণাল তাদের বাড়ী এসেছেন রাতের খাওয়া খাবেন বলে, দেখলেন মাংসের ঝোলের মধ্যে চারটে ড্রামস্টিক আর একটা ডানা। তিনজনের খাবার। কুণালের খুব ভালো লেগেছে। মাংস নিজেই নিলেন তার প্লেটে, সেই ডানার মাংস। বর বললেন, “কিরে ওটা নিলি কেন? তোর জন্য ড্রামস্টিকস্‌।” কুণাল শুনলেন ডানাটা সুস্মিতা খাবে। সহজ সরল মানুষ, জিজ্ঞেস করলেন, “ওর বুঝি খুব ডানা খেতে ভালো লাগে?” সুস্মিতা উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ আমার খুব ভালো লাগে।” আবার আরেকদিন এসেছেন কুণাল তাদের বাড়ীতে পড়াতে। খেতে বসে  বলেই ফেললেন “আমি কি তোর ডানাটা  খেতে পারি?” বর উত্তর দিলেন “ডানার দাম কম, ওটা খাস না। ড্রামস্টিকস্‌ খা।” এরকম অনেক ব্যাবহারের মধ্য দিয়ে সুস্মিতার কাছে তার বরের মানসিকতা ক্রমশঃ প্রকট হতে থাকে।

একদিন সুস্মিতার খুব জ্বর হয়েছে। শুনে এক পরিচিতা বাংলাদেশী বৌদি, দাদাকে পাঠালেন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার জন্য। তাতে বরের তো ভীষণ রাগ। কিন্তু কিছু করার নেই। যেতেই হল। ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক প্রেস্‌ক্রিপশন লিখে দিলেন, প্রচুর জুস খেতে বললেন। এদিকে ওষুধ কেনা হয়নি। কুণাল ফোন করে সব শুনে তার ছাত্রকে ওষুধ আনা হল কিনা জিজ্ঞেস করাতে উত্তর “তোর মাথা খারাপ! এই ১৪ ইঞ্চি বরফ ভেঙ্গে ওষুধ এনে দেব! জানিস না মেয়েমানুষের নয় জন্ম? এরা মরে না।” কুণাল তখন বরের অনুমতি নিয়ে সুস্মিতার জন্য ওষুধ ও তিন কার্টন জুস এনে দিলেন। পরেরদিন ফোন করে জিজ্ঞেস করে জানলেন যে পাছে তার নিজের জ্বর হয়, সেই ভয়ে বর সব জুস খেয়ে ফেলেছে। অবাক হয়ে বলেই ফেললেন, “আমি কি কানে ঠিক শুনছি? ওর হবে বলে সব জুস খেয়ে ফেলেছে? কি জানি, আমি তোদের ব্যাপারস্যাপার কিছু বুঝি না!”

images (1)

যাই হোক, কুণালের পড়ানো ব্যার্থ করে রেজাল্ট ভাল না করায় অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ নাকচ হয়ে গেল সুস্মিতার বরের। আবার ক্যানাডার আরেক শহরে  কেমিস্ট্রি ডিপার্ট্মেন্টে ফিরে গেলেন সুস্মিতাকে নিয়ে। ইচ্ছা এখানে পি এইচ ডি করবেন। এবারে বাসা এক পাঞ্জাবী বৃদ্ধ-বৃদ্ধার বাড়ীতে। আরো দু-একজনের সঙ্গে আলাপ হল। এদের মধ্যে এক দম্পতি বাংলাদেশের এক ভাই আর ভাবী। একদিন শুয়ে আছেন, ধূম জ্বর। সেদিন তাদের দুজনের নেমন্তন্ন। বাড়ী ফিরে এসে সুস্মিতাকে শুয়ে থাকতে দেখে ঠিক করলেন তিনিও যাবেন না। জিজ্ঞেস করলেন, “কি রান্না করেছ?” সুস্মিতা উত্তরে বললেন “গতকালের তরকারী আছে। রান্না করতে পারিনি।” বর শুনেই প্রচন্ড রেগে সুস্মিতাকে টানতে টানতে  উপরে তুলে দরজা দিয়ে বার করে দিলেন। দোষ? টাটকা রান্না নেই কেন?এদিকে ঘটনা দেখে সেই পাঞ্জাবী ভদ্রলোক চিৎকার করে উঠলেন এবং পুলিশ  ডাকবেন বলতে লাগলেন। তাতে তার গলা টিপে ধরে আরো কুৎসিত কদর্য ভাষায় সুস্মিতাকে আক্রমন করলেন। এদিকে বাইরে ঠান্ডায় সুস্মিতার নাক-মুখ, শরীর জমতে শুরু করেছে। মনে হল কি দরকার তার বেঁচে থেকে? অসহ্য অপমান! কিন্তু তারপরেই তার জগত যেন আলোকিত হয়ে গেল। ভাবলেন মরার জন্যে তো তার জন্ম হয় নি। নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে তার বেঁচে থাকার।কোথা থেকে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, অপরিসীম শক্তি এল মনে। সিদ্ধান্ত নিলেন কিছু একটা করতে হবে এবং এই অপমান থেকে তাকে বেরোতেই হবে।

এর পরে তারা এক স্টুডেন্ট অ্যাপার্টমেন্টে জায়গা পেলেন। একদিন বর তাকে ফোন করে একটা বই দিয়ে যেতে বললেন স্কুলে। যেতে হবে বাসে কিন্তু তার সঙ্গে তো যথারীতি কোনো পয়সা নেই। নির্দেশ হল সেই বন্ধুভাবীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিতে। সুস্মিতা পারবেন না বলায় উত্তর “এক পয়সাও তো আয় করতে পারো না, যত ঢং! তুমি তো কিছু করবা না। বেবীসিট করে পয়সা উপার্জন করতে পারো না! আমি ভাবীকে ফোন করে দিচ্ছি। তুমি ৫ ডলার নিয়ে আস।” এখানে বলে রাখি এফ ২ ভিসাতে কিন্তু কোন কাজই করা যেত না তখন, ছাত্র হওয়া ছাড়া।

ভাবী দেখা হতে বললেন, “এক কাপ চা খেয়ে যান। আপনাকে পাঁচ ডলার দেব। আপনার কাছে বড় বড় নোট। খুচরা নোট নাই।” বোঝা গেল ওই ভাবেই মিথ্যা বলা হয়েছে ভাবীকে। ভাবী চা খেতে দিলেন। বললেন, “আপনার সাথে  কথা আছে।”

চা দিয়ে, পাশে বসে বললেন ভাবী “আচ্ছা বৌদি আপনি সত্যিই কি ডেন্টিষ্ট? আমার না সন্দেহ লাগে! আর আপনার মা-বাবা-ভাই-বোন নাই?”

সুস্মিতা বললেন “কেন বলছেন?”

ভাবী বললেন, “আমার দিকে তাকায়ে দেখেন। স্কুল ফাইনাল পাশ করি নাই। আপনার ভাই পি এইচ ডি করছে। আমি যদি বলি বাঁ দিকে হেল, বাঁদিকে হেলে, ডানদিকে বললে ডানদিকে হেলে। কি অত্যাচার আপনি সহ্য করেন! নিজের বাড়ীতে ফোন করে তো জানাবেন! আমারে তো বলবেন! বৌদি আমি দুঃখে মরে যাচ্ছি। ভাবছি, কি রকম বাবা-মা! তারা তো ভাববেন আপনার কথা! আমি আর আপনার ভাই আলোচনা করেছি। আমি আপনাকে সবরকম সাহায্য করবো, আপনি পালান এখান থেকে। আমার ইচ্ছা করে লাঠি দিয়া ওনার দুইটা পা ভাঙ্গি।”

সব শুনে সুস্মিতার বুকের মধ্যে তোলপার হতে লাগল। এতদিনের জমে থাকা কান্না, অভিমান, অপমান, বেদনা সব যেন মনের বন্ধ আগল ভেঙ্গে বেরিয়ে এল, তাকে আর আটকে রাখার সাধ্য তার ছিল না। কোনরকমে বাসে করে গিয়ে বই দিয়ে আবার কাঁদতে কাঁদতে বাড়ী ফিরে এলেন। আবার এটাও মনে হল যে একজন তাহলে জানে তার কষ্টের কথা।

বর বাড়ীতে এসে পাঁচ টাকার খুচরো নিয়ে গুনতে গুনতে বলল, “কি আমার সাথে চালাকি হচ্ছে? একটা কোয়ার্টার কম কেন?” তারপরেই সেই চিৎকার! “তুই আমার পকেট থেকে টাকা চুরি করিস। কাকে পাঠাস টাকা? মা-বাবা তো খবর রাখে না।”

এরপর একদিন কুণাল ফোন করতে তিনি সব খুলে বললেন। শুনে কুণাল স্তব্ধ হয়ে রইলেন কিছুক্ষন। তারপর বললেন, “তুই এটা ঠিক করছিস না। তোর ওপর অত্যাচার করে যাচ্ছে, তুই সহ্য করছিস?”

সুস্মিতা বললেন, “আমি কি করে কি করবো বুঝতে পারছি না।”

কুণাল বললেন, “তুই ভাব কি করবি? ভেবে আমাকে জানাস।”

সাহায্যের হাত বাড়ালে, কুণাল তাকে তার বাবার সঙ্গে কথা বলিয়ে দিলেন। বাবা সব শুনলেন। তারা ভেবেছিলেন মেয়ে আমেরিকা এসে তাদের ভুলে গেছে। বাবা বললেন, “তোমার আমাকে আগে বলা উচিত ছিল। তুমি এক্ষুনি বাড়ী চলে এস।” কুণালকে টিকিট কেটে দিতে অনুরোধ করলেন।

সুস্মিতা জানালেন যে তিনি দেড়মাস বাদে বরের কম্প্রিহেন্সিভ (Comprehensive Exam, এটা পাশ না করলে পি এইচ ডি করতে পারবে না) পরীক্ষা করিয়ে দিয়ে তিনি যাবেন। এই সুবাদে অনেক কিছু জানতে পারা Yellow page দেখে সাহায্য পাবার সব খবরাখবর পাওয়া গেল। সেই প্রথম “Battered Women Center” সম্বন্ধে  জানা হলো। এর মধ্যে গায়ে হাত তুললে “Battered Women Center”-এ যে যাওয়া যায় তাও জানা গেল।

image 6

একদিন সময় করে বরকে জানিয়ে দিলেন যে তিনি চলে যাবেন। বরের কোন প্রতিক্রিয়া হল না। এইখানেই লোকটা হেরে গেল! ভাবে নি যে মেয়েদের যেমন নটা জন্ম থাকে, তাদের শক্তিও থাকে অপরিসীম! টিকিটের ব্যাবস্থা হয়ে গেল। এর মধ্যে বাড়ীতে সবকিছু গুছিয়ে রেখে, শ্বশুরবাড়ী থেকে পাওয়া গয়না রেখে চলে যাবার জন্য তৈরী হলেন সুস্মিতা। এরপর সেই বিস্ফোরনের সময় এল। জানালেন যে তিনি দেশে ফিরে যাচ্ছেন। তার সব ব্যার্থতার রাগ ঝরে পড়ল সুস্মিতার ওপরে। শুরু হল কদর্য চিৎকার – “তুই আমাকে ছেড়ে যাবি? তোর তো শুধু দেহ বিক্রি করতে হবে। আর কিছু তো করার ক্ষমতা তোর নেই। দেখবো কি করে পালাস……… ইত্যাদি ইত্যাদি।”

উত্তরে সুস্মিতা বললেন, “যেখানে সন্মান নেই, সেখানে আমি নেই। আর, আমি কি করব তা তোমাকে ভাবতে হবে না।”

“তোকে এখানেই ডিভোর্স দেব।”

“হ্যাঁ দিতে পার, তবে তোমাকেই সব খরচা দিতে হবে।”

শুনে তো লোকটা শিউরে উঠলো! “যা যা বাড়ী যা। ভাই-বৌ লাথি মেরে বার করে দেবে।”

যাবার আগেরদিন কুণাল তার সহপাঠী দীপাকে পাঠালেন সুস্মিতার কাছে। সে সুস্মিতাকে প্লেনে তুলে দেবে। দীপা এসেই সাবধান করে দিল লোকটাকে। সে যেন যাবার সময় কোনো রকম ঝামেলা না করে। তাকে পরিস্কার বলে দিল যে ঝামেলা করলেই পুলিশ ডাকা হবে এবং তাতে ছাত্র ভিসা নাকচ হয়ে যাবে। এই একটি কথায় সে একদম চুপ করে রইল।

দেশে ফিরে এলেন বিকেলবেলা। বাবাকে একদিন সবকিছু খুলে বললেন, সারা রাত ধরে। কথা শেষ হতে চায় না। অনেকদিনের না বলা কথা যেন বাঁধ ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে থাকে হু হু করে। সব শুনে বাবার প্রেশার বেড়ে যায়। বাবা ভাবতে পারেন না তাঁর ছোট্ট আদরের মেয়ের এত কষ্ট পাবার কথা! এক সপ্তাহ লেগেছিল সুস্থ হতে। চিঠি লিখলেন জামাইকে। “আমায় খুলে বল কি হয়েছে। আমিও তোমার কথা শুনতে চাই।” দীর্ঘ একমাস পরে উত্তর এলো। তাতে লেখা যে এবারের ভাড়ার টাকা ও আর দিতে পারবে না। বাবাকে দিতে হবে। বাবা সেইদিনই এক বন্ধু উকিলের কাছে গেলেন এবং তারপর ডিভোর্সের মামলা করা হল।

সুস্মিতা আবার বাবা-মায়ের কাছে থেকে আগের জীবণে ফিরতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোথায় যেন একটা অদৃশ্য স্ট্যাম্প মারা হয়ে গেছে তার ওপর ডিভোর্সী মেয়ে বলে। সবার ভেতরে একটা চাপা যন্ত্রনা। মা ভেঙ্গে পড়লেন। ক্রমশঃ মনে হতে লাগল তিনি আর এখানে আগের মতো থাকতে পারবেন না। তার ফিরে আসার আগে কুণাল তাকে বলেছিলেন যে তিনি সুস্মিতাকে ভালোবাসেন। এ নিয়ে ভাববার তার অত সময় ছিল না তখন। এদিনে বাবা ফোন পেতে লাগলেন কুণালের কাছ থেকে।  বাবাকে চিঠি লিখে বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছেন। তাদের বাড়ী থেকে এক এক করে সবার চিঠি আসতে লাগলো বিয়ের কথা জনিয়ে। সেই বিষয় নিয়ে বাবা-মা কিছুদিন ভাবলেন, তারপর বিয়েতে সন্মতি দিলেন। ১৯৮৪ সালে বিয়ে হল দুজনের কলকাতায়। সুস্মিতার জীবণের এক পর্ব শেষ হল।আরেক পর্বের শুরু হল।

প্রশ্ন জাগে মনে যে এত দিন সহ্য করেছিলেন কেন? ভেবেছিলেন মানিয়ে নেবেন। সবার সংসারেই তো কিছু না কিছু থাকে খুঁত থাকে। কিন্তু যেখানে মনের ব্যাবধান অনেক বেশী, চিন্তা-ভাবনার অনেক তারতম্য, সেখানে হাজার চেষ্টা করলেও মানানো মুশকিল। এছাড়াও যে কোনো মানুষের চরিত্র তৈরী হয় তার বড় হবার পরিবেশ থেকে। এখানেও দুজনের বড় হবার মধ্যে অনেক ফারাক। যে সময়ের কথা বললাম, সেই সময়ে মোবাইল ফোন ছিল না, টেক্সট (Text) করা বা ওয়াট্‌স এপ (Whats App) ইত্যাদির কথা ছেড়েই দিলাম। কাজেই তিনি কাউকেই বলতে পারেন নি যে তিনি বাড়ীতে জানাতে চান, কারণ সেটা বলতে গেলে তো তার বরের নামেই বলতে হবে। সুস্মিতা এখনো খুব ভাবেন সেই সব মেয়েদের কথা যারা স্বামীর স্টুডেন্ট ভিসায় তার ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে বিদেশে যান এবং অত্যাচারিত হন। কারণ তিনি নিজেই তো ভুক্তভোগী।

IMG_8547 (1)

সহচরীর কলমে/ জুন ২০২০

প্রকৃতির মুখোমুখি প্রথম পর্ব

সুশান্ত সিং রাজপুতের জন্য

কাকলি মজুমদার, ক্যালগেরি, ক্যানাডা

Kakoli Image 1

ছবি ১) এই কাহিনীর লেখিকা কাকলি মজুমদার

এই গ্রীষ্মে বার বার প্রকৃতির কাছে চলে যাবো। ২০২০ সালটা আমাদের খুবই দুঃসময়ে এনে ফেলেছে। করোনার দৌরাত্য, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং গভীর অর্থনৈতিক মন্দা। ইদানিং আমাদের জীবনের আর কোন  নিশ্চয়তা নেই। এই অস্থির নৈরাশ্যেভরা  সময়ে, নিজের সহজাত সত্ত্বাকে প্রায়ই হারিয়ে ফেলছি। নিজেকে খুঁজে পেতে তখন প্রকৃতির কাছে আশ্রয় নিতে হয় । যেখানে গেলে প্রকৃতির আদি এবং অকৃত্রিম রূপ দেখতে পাই । এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পারিপার্শিকের মধ্যে, জীবনের একটা কিছু যে স্থিতধী আছে, সেই অনুভব আমাকে এগিয়ে চলবার সাহস দেয়।

কানাডার পশ্চিমে রকি মাউন্টেন বড্ড রুপসী।  বাড়ি থেকে মাত্র এক-দু’ঘন্টা ড্রাইভ করলেই অচেনা কোন পাহাড়ি পথে, ছোট্ট নদী বা লেকে পৌঁছে যাওয়া যায়। এই বছরে আর জনপ্রিয় জায়গাগুলোতে যাবো না। চলে যাবো অন্যস্থানে, যেথায় আগে যাওয়া হয় নি। এখন জীবনের যে ধ্বংসলীলা দেখছি, তাতে যা কিছু করা হয়ে ওঠে নি  – তা চটপট করে নিতে হবে।

লেখার মধ্য দিয়ে আমার নতুন করে বেঁচে উঠবার কাহিনীগুলো আপনাদের কাছে নিয়মিত পৌঁছে দেবার ইচ্ছে রইলো।

শুরুতেই গেরো। সপ্তাহান্তে, শনিবারে বৃষ্টি এলো ঝেঁপে। আমাদের কোথাও যাওয়া হোল না।

রবিবার ঘুম থেকে উঠে বিছানায় শুয়ে সেল ফোনে খবরের পাতায় চোখ বোলাতেই সুশান্ত সিং রাজপুতের জ্বলজ্বলে হাসি মুখ। তার নীচে  লেখা “found dead in his Bandra apartment।” সটান উঠে বসলাম।  সুশান্ত আমার – আমাদের সবারই খুব প্রিয় অভিনেতা – দারুণ প্রতিভাবান। মাত্র ৩৪ বছর বয়স।  এই মর্মান্তিক মৃত্যু সত্যি বিশ্বাস হচ্ছে না। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে জানিয়েছে আত্মহত্যা। মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে সংবাদ মাধ্যমে অভিনেতার “clinical depression” নিয়ে পাহাড় প্রমাণ কথা হয়ে গেছে। খুব মনে হতে লাগলো “M.S. Dhoni – the Untold Story” তে দুর্দান্ত অভিনয়, কেদার নাথের রোমান্টিক “sweetheart”, “কাই পো চে” সেই নায়কটিকে। সুশান্ত খুব সহজাত ভঙ্গিমায় চরিত্রগুলোর সাথে এক হয়ে যেতো।  আর কিছু না হলেও, সে M.S. Dhoni এর মধ্যেই বেঁচে থাকবে। স্বল্পভাসি, সপ্রতিভ এবং দুর্দান্ত প্রতিভাবান এই নায়কটির অস্বাভাবিক মৃত্যুতে, তার ব্যক্তিগত জীবন ঘিরে চূলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।  Instagram-এ লক্ষাধিক follower, নানা ভক্তমন্ডলী, বলিউডের স্টার, সাংবাদিকরা কেউ বাদ নেই। এরা এতো দিন কোথায় ছিলো? তখনও শেষকৃত্য হয়নি। পুলিশের তদন্ত সবে শুরু হয়েছে। হত্যা না আত্মহত্যা? হঠাৎ সুশান্তের জীবনটা খবরের কাগজের খোলা পাতা হয়ে গেছে।

Sushant-Singh-Rajput-biopic-in-the-works-1200x675-1

ছবি ২) সুশান্ত সিং রাজপুত (গুগুলের সৌজন্য)

সারাটা দুপুর ধরে খুব মন খারাপ। কোন মানুষের অসময়ে চলে যাওয়াটা আমাকে খুব নাড়া দেয়। অন-লাইনে সুশান্ত সংক্রান্ত সব পোস্ট পড়েই চলেছি। খুব ভয় করছে। তথাকথিত বিদগ্ধ বিশেষজ্ঞেরা সুশান্তের গায়ে না জানি কি তকমা এঁটে দেবে! সব শুরুর শেষ আছে। সেই শেষে সব বিবাদ, গ্লানি ও অবসাদ ঘুচে গিয়ে, যেন ওর অসাধারণ অভিনয় প্রতিভাটাই উজ্জ্বল হয়ে থেকে যায়।

আমার অবস্থা দেখে সৌরভ বল্লো  “চলো একটু ঘুরে আসি।” “কোথায় যাবো?” ততক্ষণে রবিবারের দুপুর তিনটে গড়িয়ে গেছে। “AllTraills” App দেখে এক ঘন্টার ড্রাইভে চেনা পাহাড়ি শহর ক্যানমোরে (Canmore) চলে এলাম। আরও ১০ মিনিটের মধ্যে  কোয়্যারি লেকে (Quarry Lake)-এ পৌঁছে গেলাম। “ওমা কি অপূর্ব! ক্যানমোরে এতোবার এসেছি, এই লেকের কথা তো জানতাম না?” ঘন সবুজাভ-নীল কাঁচের মতন স্বচ্ছ জলে ভরা ছোট্ট লেক। চারিধারে নরম-সবুজ মাঠের মাঝে গাঢ়ো-কালচে-সবুজ পাইনবন ছড়িয়ে আছে।  আর সেই বনের মধ্যে ডানা মেলেছে কচি সবুজের দলবল ।  ক’দিন আগে বসন্তের শুরুতে, এ্যাস্পেন আর পপলারের ডালে নতুন পাতা এসেছে। তাই বনে সবুজের মহোৎসব। পিছনে  পাহাড়ের সারি – Mount Rundle, Ha Ling Peak, Three Sisters।

Quarry Lake 1

বি ৩) Quarry Lake,  সঙ্গে পাহাড় ও গাছের সারি

বরফ গলে গিয়ে ছিঁটেফোঁটা সাদা শীতের চিহ্ন বাদামি-নীল পাহাড়ের গায়ে লেগে আছে। দূরে Three Sisters-এর মাথায় হিমবাহের আভাস দেখা যাচ্ছে। আজ ভারি ঝকঝকে সুন্দর দিন। জুন মাসের হাল্কা ঠান্ডা মেশানো তরতাজা বাতাসে ভরপুর জীবনের গন্ধ।  চারিপাশে নিতান্ত অলসভাবে পড়ে থাকা লেক-পাহাড়-বন-রদ্দুর আমার মনের মধ্যে একটা জলছবি হয়ে ওঠে। যেন কোন শিল্পী একটু আগেই এঁকে রেখে গেছে।

লেক ঘিরে পিকনিক টেবিল, হাঁটার পথ, মাছ ধরবার ব্যবস্থা। লেকের চারপাশে বাঁধানো পথে দু’চারটি পরিবার হাঁটছে। মাঠে বসে কেউবা আড্ডা দিচ্ছে। টুকটাক খাওয়া দাওয়া চলছে। এতো ছড়ানো জায়গায়, গুটি কয়েক মানুষের মধ্যে “social distancing” এর সমস্যা নেই। আমরা  দুজনে বনের পিছনে নুড়ি বিছানো পথে খানিকটা হেঁটে এলাম।  এই পথটা জুড়ে মাথার উপর দিয়ে ইলেকট্রিক তার চলে গেছে। ঘন্টা খানেক হাঁটলে এখানকার সবচেয়ে বড় লেকে (Spray lake) পৌঁছে যাওয়া যাবে। আপাতত সেটা তোলা থাক।

Quarry Lake 2

ছবি ৪) Quarry Lake

লেকের ধারে মেঘে-মাখা আকাশের তলায় অনেকক্ষণ হাত পা ছড়িয়ে বসে থাকলাম। কি যে নির্ভার লাগছে, তা আর কি বলবো। অনেকটা যেন মায়ের আঁচলের স্নেহে আশ্রয় নেওয়ার মতন।  লেকের মধ্য থেকে কলকল খুশির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। কাছে গিয়ে দেখি চারটি ছোট ছেলে এ-পাড় থেকে ও-পাড়ে সাঁতার কাটছে। লেক কিন্তু ৮০-১০০ মিটার গভীর। দেখে মনে হয় এরা স্থানীয় এবং প্রায়ই সাঁতার কাটে। ছুঁয়ে দেখি যে জল ইষৎ-ঊষ্ণ আর ভারি মনোরম। কয়েক মাস ধরে “lockdown” – এর বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে, ছেলেরা আজ জীবনের উৎসবে মেতেছে।

সারাদিনের দমবন্ধ অবস্থয় থেকে, এবার আমার মাথাটারও মুক্তি হোল। প্রকৃতির কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ হোই। Dear Zindagi- সিনেমার প্রিয় গানটি গুনগুন করতে করতে গাড়িতে  উঠি “love you জিন্দেগি। love me জিন্দেগি। love you জিন্দেগি।”

লেখিকা পরিচিতিঃ কাকলির জন্ম এবং পড়াশুনা কলকাতায়। সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর ছাত্রী।  বর্তমানে কাকালি কানাডার ক্যালগেরি শহরে থাকে সপরিবারে। অনেক  দেশ  ঘুরেছে। লেখা তার বহুদিনের সৃষ্টিশীল ভালোবাসা।  তার লেখায় ছুঁয়ে  থাকে প্রকৃতি, প্রেম পূজা আর মানুষের কাহিনী। কিছু গভীর অনুভবের আর অনুপ্রেরণার উপলব্ধি।  সে লেখে নানা স্বাদের ছোট গল্প, প্রবন্ধ, আর ভ্রমণ কাহিনী। তার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে দেশ, সাপ্তাহিক বর্তমান ও অন্যান্য পত্রিকায়।

সহচরী ১৬/ কমলপ্রিয়া রায়/ মে ২০২০

Sahachari 4সহচরী ১৬/ কমলপ্রিয়া রায়

 

IMG_2480

ছবি ১) কমলপ্রিয়া রায়

এবার গল্প শুরু করবো হিউষ্টনের দূর্গাবাড়ীর কলাভবনে। সময়টা ২০১৪ সাল। একটি সাংস্কৃতিক মিটিং চলছে বন্ধ দরজার ওধারে। সেই সময়কার হিউষ্টনের আগামী বঙ্গসন্মেলনের প্রেসিডেন্ট শ্রী শঙ্কু বোস কলাভবনের রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিক্ষিকাকে জিজ্ঞাসা করলেন “পরের বছর আমাদের এখানে বঙ্গসন্মেলন হবে। সেখানে শতকন্ঠে রবীন্দ্রনাথ  অনুষ্ঠানটি হবে। তুমি কি সবাইকে নিয়ে এই অনুষ্ঠানটি করতে পারবে?” শিক্ষিকা অভিভূত হয়ে গেলেন। তিনি অনেক গানের অনুষ্ঠান করিয়েছেন। এটা যে তার অনেক দিনের ইচ্ছা। সবাইকে নিয়ে গানের অনুষ্ঠান করা! সেই বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে বঙ্গসন্মেলন হয়েছিল ফ্লোরিডায়। সেখান থেকে আবার ফোন এল সেই প্রেসিডেন্ট ভদ্রলোকের এবং তিনি জানালেন যে এই প্রোগ্রাম টি পরের বছর তাদের হিউষ্টনে হবেই। সেই শিক্ষিকাই পরিচালনা করবেন।সেই শুরু ২০১৫ সালে বঙ্গসন্মেলনে “শতকন্ঠে রবীন্দ্রনাথ” অনুষ্ঠানটির এবং প্রত্যেকবছর হয়ে চলেছে।

এতক্ষণ যে রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিক্ষিকার কথা বললাম, তিনি হলেন শ্রীমতী কমলপ্রিয়া রায়, আমার এবারের সহচরী। তিনি হিউষ্টনের দূর্গাবাড়ির  কলাভবনে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখিয়েছেন  ১০ বছর। কিভাবে ২০১৫ সালে হিউষ্টনের বঙ্গসন্মেলনে শতকন্ঠে রবীন্দ্রনাথ অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছিলেন, সেই গল্প পরে বলছি। আগে শুরু করছি তার ছোটবেলার গল্প দিয়ে। কারণ ছোটবেলা না জানলে যে কমলপ্রিয়াকে জানা হবে না।

IMG_4197

ছবি ২) টেগোর সোসাইটি অফ হিউষ্টনের অনুষ্ঠান-নিজের ছাত্রী ও অন্যান্যদের সঙ্গে

কমলপ্রিয়ার জন্ম শান্তিনিকেতনে। বাবা ছিলেন বিশ্বভারতীর ইংরেজির প্রফেসর। তারা চার বোন। তিনি সবার ছোট। বিশ্বভারতীর পাঠভবনে পড়াশুনা করেছেন।তারা থাকতেন অ্যান্ডরুস্‌ পল্লীতে, বিশ্বভারতীর কোয়ার্টারে। এখানেই ছোটবেলা থেকেই পাড়ার দাদা-দিদিদের সাথে নাটক, গানের অনুষ্ঠান করেছেন, স্পোর্টস্‌ খেলেছেন অনেক।

তার মনে পাঠভবনের নানান স্মৃতি মনে ভিড় করে আসে। স্কুলে যেতেন ব্যাগে বই খাতার সঙ্গে আসন নিয়ে। তাদের ক্লাস হত গাছের তলায়। কাজেই আসন পেতে বসে ক্লাস করতে হত। বৃষ্টি হলে ক্লাস হত ঘরে বা বারান্দায়। খুব বেশি বৃষ্টি হলে স্কুল ছুটি থাকত। তাদের নানান ধরণের ক্লাস ছিল। পড়াশুনার সঙ্গে  সঙ্গে  ছিল গানের ক্লাস, ছবি আঁকার ক্লাস, নাচের ক্লাস, হাতের কাজের ক্লাস। ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রসঙ্গীত খুব মন দিয়ে শিখতেন। পরবর্তী কালে উঁচু ক্লাসে (নবম, দশম ও একাদশ শ্রেণী) সঙ্গীতভবনের অধ্যক্ষ শ্রীমতী নীলিমা সেন গানের ক্লাস নিতেন। নীলিমাদি হারমোনিয়াম, তবলা ছাড়াই ক্লাস নিতেন। এরপর তিনি ১১ ক্লাস পাশ করলেন (এইচ এস, H.S.)। পড়াশুনার সাথে সাথে দুবছরে গানের সার্টিফিকেট নিয়ে নিয়েছেন। শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন অনেক ভালো ভালো অনুষ্ঠান দেখেছেন গৌরপ্রাঙ্গনের মুক্তমঞ্চে। পন্ডিত রবিশঙ্করের সেতার, হেমন্ত মুখার্জী, সাগর সেনের গান ইত্যাদি। এখানে প্রতিবছর দোল উৎসব হত। শান্তিনিকেতনের সবাই আনন্দে মেতে উঠতেন ওইদিন। ২২ শে শ্রাবণ হত বৃক্ষরোপন। একটি প্রাণ চলে গেলে আরেকটি প্রাণকে স্বাগত জানিয়ে নিয়ে আসার এ এক অভিনব প্রচেষ্টা।

IMG_2272

ছবি ৩) শতকন্ঠের অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গে কমলপ্রিয়া

এই শান্তিনিকেতনেই প্রকৃতিকে চিনেছিলেন কমলপ্রিয়া। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত – প্রত্যেকটি ঋতু  অপূর্ব সুন্দরভাবে ধরা দিত।  পৌষউৎসব খুব ভালো হত। খুব বড় মেলা বসত, গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে ব্যাপারীরা নানা রকমের জিনিস এনে বিক্রি করত। নানারকমের পুঁতির মালা  ও মনোহারী জিনিস পাওয়া যেত। পুজোর আগে শারদোৎসব বলে এক নাট্যমেলা হত। একেক সন্ধ্যায় একেক বিভাগের  লোকজন এসে নাটক করতেন । শান্তিনিকেতন ব্রাহ্ম স্থান, পুজা হত  কাঁচের ঘরের উপাসনা গৃহে। প্রথমে আচার্য এসে বসবেন। প্রার্থনান্তে পাঠ  ও রবিঠাকুরের গান গাওয়া হবে। প্রতি বুধবার শান্তিনিকেতন ছুটি, রবিবারে খোলা। বুধবার ব্রহ্মউপাসনার দিন।  এদিন মূর্তিবিহীন পরমেশ্বরের আরাধনা হত। বুদ্ধপূর্ণিমা, নববর্ষ, বসন্তোৎসব, বর্ষাশেষ ইত্যাদি খুব সুন্দর সুন্দর অনুষ্ঠান হত। এই পরিবেশ মনটাকে শুদ্ধ, সুন্দর করে দেয়। এইরকম পরিবেশে সকলের সঙ্গে মিলেমিশে বড় হয়েছেন। এখান থেকেই সকলকে নিয়ে একসঙ্গে কিছু করবেন এই ভাবনা তার মনে এসেছে। তার মনের এই ইচ্ছাকে পুষ্ট করেছে প্রতিদিন  বৈতালিকে সবাই মিলে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা। এটিও রবিঠাকুরের দর্শনে তৈরী। প্রতিদিন  (একসপ্তাহের বৃহস্পতি বার  থেকে পরের সপ্তাহের মঙ্গলবার) সকালে ক্লাস শুরু হবার  আগে সাড়ে ছটায়  ১৫-২০ মিনিট দাঁড়িয়ে  মেয়েরা ও ছেলেরা পুজা পর্যায়ের গান গাইত। একেকদিন  একেক বিভাগের  (সঙ্গীতভবন, বিজ্ঞানভবন, কলাভবন ইত্যাদি) ছেলেমেয়েরা গানে নেতৃত্ব দিত। এই বৈতালিকে খুব সুন্দর করে গান পরিবেশন হত। সবাই গানের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে গান গাইত। দীর্ঘদিন স্কুলজীবনে এই বৈতালিকের গান তার মনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে।

তিনি অনেক  গানের অনুষ্ঠান করেছেন। বিশ্বভারতীর হয়ে এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে। কলকাতা, দূর্গাপর, আসানসোল, মাইথন, শিলিগুড়ি প্রভৃতি জায়গায় অনুষ্ঠান করতে গেছেন। তার ওপরের দিদি শ্রীমতী সুকৃতি লাহিরী ভালো গান গাইতেন। দিদির সঙ্গে সঙ্গে তিনিও গান গেয়েছেন প্রচুর গানের অনুষ্ঠানে। “আশ্রমিক সংঘ” -এর হয়ে অনেক অনুষ্ঠান করেছেন। এই রকম অনেক স্মৃতি মনে ভিড় করে আসে কমলপ্রিয়ার। এই ব্যাপারে বাবা-মায়ের সমর্থন ছিল। এর মধ্যে সংস্কৃতে এম এ করেছেন। ১৯৮৮ -র  মার্চে বিয়ে হল কেমিক্যাল ইঞ্জিনীয়ার আলোক রায়ের সাথে। ছয়মাস পরে এদেশে আসেন ড্যালাস ফোর্ট ওয়ার্থে। হিউষ্টনে  ছিলেন প্রায় ২৮ বছর। বড় মেয়ে নাতাশা ইউনিভার্সিটি অফ হিউষ্টনে পড়া শেষ করে এখন  হিউষ্টনে স্কুল শিক্ষিকা। তাদের ছেলে  ইউনিভার্সিটি অফ পেন্সিল্ভ্যানিয়াতে কম্পুটার সায়েন্স নিয়ে পড়েছে, এখন ওয়াশিংটন ডিসিতে কাজ করে। কমল্প্রিয়া এখন তার স্বামীর কর্মসুত্রে  অগাষ্টায় (জর্জিয়া) আছেন বছরদেড়েক। ছোট জায়গা, এখানে মানুষের মধ্যে একটা আন্তরিক ব্যাপার আছে। অনেক সুন্দর সুন্দর বেড়ানোর জায়গা আছে। স্বামীর কাজ শেষ হলে তারা আবার হিউষ্টনে ফিরে যাবেন।

IMG_2222

ছবি ৪) শতকন্ঠে রবীন্দ্রনাথ অনুষ্ঠানে কনলপ্রিয়া, বঙ্গসন্মেলন, বাল্টিমোর,২০১৯

প্রথম “শতকন্ঠে রবীন্দ্রনাথ” অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে গিয়ে মনে  হয়েছিল এত বড় ব্যাপার, কি করে করবেন? তারপর অনেক লোকের কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছেন। কমলপ্রিয়ার মনে পড়ে তিনি অষ্টিনের বাঙ্গালীদের খুঁজে বার করে তাদের জনে জনে ফোন করেছিলেন জানতে যে কেউ যোগদান করতে ইচ্ছুক কিনা। অবশেষে অষ্টিনের বাঙ্গালী সমিতির প্রেসিডেন্টের সাহায্যে প্রায় ১০ জন শিল্পীকে  পেলেন। হিউষ্টন থেকেও অনেক ছেলে -মেয়ে এসেছিলেন। এছাড়া অন্যান্য স্টেট থেকে বাকিরা এসেছিলেন। এতজনের একসঙ্গে গান, এবং অনেকেই অন্যান্য জায়গায় থাকেন। কাজেই একসঙ্গে প্র্যাকটিস্‌ করা সম্ভব নয়। এর জন্য চাই গানের  সুর, তবলা ও অন্যান্য যন্ত্রের ট্র্যাক,  যার সঙ্গে প্রত্যেকে তার নিজের সুবিধানুযায়ী প্র্যাকটিস্‌ করবেন। এটাই এই অনুষ্ঠানের প্রধাণ অংশ। প্রত্যেক  গানের কথা এবং কোন অংশ কতবার হবে, কোন অংশ ছেলেরা বা মেয়েরা গাইবেন এবং কোন অংশ কোরাস্‌ হবে তার মাষ্টার কপি পাঠানো হয় এবং গানের ট্র্যাক পাঠানো হয়। মাষ্টারকপি তৈরী করেন কমলপ্রিয়ার স্বামী, শ্রী আলোক রায়। সবাই সেটি অনুসরণ করে যে যার বাড়ীতে প্র্যাকটিস্‌ করে এসে অনুষ্ঠান করেন। অনুষ্ঠানের আগে একবার সবাইকে দিয়ে প্র্যাকটিস্‌ করিয়ে কমলপ্রিয়া দেখে নেন  শুনতে কেমন লাগছে। এরপর সবাই  মিলে মঞ্চে অনুষ্ঠান করেন। প্রথমবার ১০টা গানের ট্র্যাক তৈরী করে দিয়েছিলেন  কলকাতার শ্রী শান্তনু  মুখোপাধ্যায়। সেই ট্র্যাক ব্যাবহার করে পরপর তিন বছর “শতকন্ঠে  রবীন্দ্রনাথ” হয়েছে। প্রথমবার (২০১৫) হিউষ্টনে গানের সঙ্গে পাঠ করেছিলেন শ্রী সৌনক চট্টোপাধ্যায় এবং শ্রীমতী  শান্তশ্রী সেন। সঙ্গীত নির্বাচনে ছিলেন শ্রীমতী বুলবুল সেনগুপ্ত, ভাষ্যরচনায় ছিলেন শ্রীমতী শ্রাবণি আকিলা।গান করেছিলেন ৬০ জন শিল্পী। দ্বিতীয়বার (২০১৬) নিউ ইয়র্কে, ৮০ জনকে নিয়ে ও তৃতীয়বার  (২০১৭) সান্টা ক্লারা (বে এরিয়া), ৮০ জনকে নিয়ে। এই বছর থেকেই টেগোর সোসাইটি অফ হিউষ্টন এই  অনুষ্ঠানটির সামগ্রিক দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন। চতুর্থবার (২০১৮) হিউষ্টনের টেগোর সোসাইটির অনুরোধে দেবজ্যোতি মিশ্রের দুটি গানের ট্র্যাক ও সৌনকের চট্টোপাধ্যায়ের একটি গানের ট্র্যাকের সঙ্গে গাওয়া হয়েছিল অ্যাটলান্টিক সিটিতে। শ্রী দেবাশীষ অধিকারী সহায়তা করেন। পঞ্চমবার (২০১৯) হল বাল্টিমোরে শ্রীমতী ভারতী মিত্রের সহায়তায়।গানের  ট্র্যাক করেছিলেন শ্রী শান্তনু ঘোষ।  সেবার গানের সঙ্গে পাঠ  করেছিলেন  সাহিত্যিক সমরেশ বসুর পুত্র ডাঃ নবকুমার বসু (ইনিও সাহিত্যিক, ইংল্যান্ডে থাকেন)। ভাষ্যরচনায় ছিলেন শ্রীমতী ভারতী মিত্র। টেগোর সোসাইটি অফ হিউষ্টনের দেবলীনা ও রাজা বাঙ্গা, মিলা সেনগুপ্ত  ও মৃনাল চৌধুরী তাকে বিভিন্ন সময়ে নানাভবে সাহায্য করেছেন। এছাড়াও হিউষ্টনের বাইরে থেকে সহায়তা করেছেন আরো অনেকে, তাপস সান্যাল প্রণতি চৌধুরী, স্বপ্না রায়, অনামিকা সরকার , সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়, সোনালী ভট্টাচার্য,চান্দ্রেয়ী মুখার্জী, প্রসেনজিত বিশ্বাস, সংঘমিত্রা ভট্টাচার্য প্রমুখ।

এছাড়াও ২০১৯ এর তিনি ন্যাশ্‌ভিলে বেঙ্গলী পারফরমিং আর্টস্‌ কনফারেন্সে (বি পি এ কন, BPA Con) অনেকজনকে নিয়ে প্রোগ্রাম করিয়েছেন। বি পি এ কন এর কর্ণধার শ্রী সলিল দাসের আমন্ত্রণে তিনি এই অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন। পাঠ করেছিলেন তার বন্ধু  ও অগাষ্টা ইউনিভার্সিটির প্রফেসার  সোমা মুখোপাধ্যায়।  তাদের এই গানের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন দেশ থেকে আগত বেশ কিছু শিল্পীরা। কমলপ্রিয়া তাদের আগে থেকে গানের কথা, নির্দেশ ও ট্র্যাক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অ্যাটলান্টা, অ্যালাব্যামা ও মিশৌরী থেকে কিছু শিল্পী অংশগ্রহণ করেছিলেন, বাকিরা অন্যান্য জায়গা থেকে এসেছিলেন। প্রায় জনা তিরিশেক গানের শিল্পীকে নিয়ে হয়েছিল এই অনুষ্ঠানটি।

IMG_2220

ছবি ৫) শতকন্ঠে রবীন্দ্রনাথ অনুষ্ঠানে শ্রী দেবাশীষ অধিকারীর সঙ্গে কমলপ্রিয়া রায়

বর্তমানে  আগামী ৯ই মে  টেগোর সোসাইটির উদ্যোগে  ভারচুয়াল রবীন্দ্রজয়ন্তী  উপলক্ষ্যে “শতকন্ঠে রবীন্দ্রনাথের” একটি গানের কোলাজের ওপরে কমলপ্রিয়া ও অন্যান্য গানের শিল্পীরা কাজ করছেন। এটি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সম্প্রচারিত হবে ৮ই ও ৯ই মে ।

স্বামী আলোক রায় কে সবসময় নিজের পাশে পেয়েছেন। “শতকন্ঠে” র  স্টেজের পিছনের সব কাজ আলোক সামলান। কমলপ্রিয়া তার পরিবারের সবাইকে  নিয়ে  ভালো থাকুন এবং প্রতিবছর  “শতকন্ঠে রবীন্দ্রনাথ”অনুষ্ঠানটি করে নিজে আনন্দ পান ও সবাইকে আনন্দ দিন এই কামনা করি।

IMG_2325 (2)

ছবি ৬) স্বামী আলোক রায়ের সঙ্গে কমলপ্রিয়া রায়

সহচরীর কলমে/ এপ্রিল ২০২০

সহচরীর কলমে/এপ্রিল ২০২০

এই প্রথম এই ব্লগে প্রকাশিত হল এক সহচরীর কলমে রবি ঠাকুর কে নিয়ে স্মৃতিচারণ। আমার এই সহচরীর নাম কাকলি মজুমদার এবং আমার স্কুলের সহপাঠী।  কাকলির পরিচিতি রয়েছে এই লেখার শেষে।

Kakoli pic 1

এই রবীন্দ্র জয়ন্তীতে ছেলেবেলার রবি ঠাকুরের মুখোমুখি

কাকলি মজুমদার, ক্যালগেরি, কানাডা

আজ করোনা মহামারীতে বিশ্ববাসী এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিদিন চোখের সামনে দিয়ে এক অবিশ্বাস্য এবং ভয়াবহ মৃত্যু মিছিল চলে যাচ্ছে। এই নতুন সন্ত্রাস আমাদের আপন অস্তিত্বকে বিপন্ন করে ফেলেছে।  কাল কি অপেক্ষা করে আছে, তা আমরা জানি না। শুধু জানি যে এক অনিশ্চয়তার কালো মেঘে আকাশ ঢেকে আছে। তবুও আমরা এগিয়ে চলেছি। কেন না, এগিয়ে যাওয়াই জীবনের ধর্ম ,আর থেমে যাওয়া মৃত্যুতুল্য।

এই সর্বনাশা মহামারীর মধ্যে থাকতে থাকতে হঠাৎ কেন জানি না মনে পড়ে গেল যে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ  পরে ২৫শে বৈশাখ।  আগামী ৮ মে রবীন্দ্রজয়ন্তী। আহা! প্রত্যেক বছর এই সময় থেকেই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। এই বছর, সংকটের দিনে আমরা যেন এই বিশেষ দিনটিকে ভুলে না যাই। কোন মতেই যেন রবীন্দ্রজয়ন্তী নীরব অবহেলায়  চলে না যায়। আসুন, সবাই মিলে রবীন্দ্র স্মৃতিতে নিমগ্ন হই।  খোলা আকাশের নীচে ছাতিমের ছায়ায় একত্রে বসে,  পাঞ্জাবি-লাল-সাদা ঢাকাই শাড়িতে সেজে গুজে একত্র হয়ে অনুষ্ঠান  করতে নাই বা পারলাম। একাকি ঘরে বসে আমরা তাঁর তর্পণ তো করতে পারি। আমরা zoom, skype -এর মাধ্যমে virtually একত্র হয়ে লেখায়, গানে, কবিতা পাঠের মধ্য দিয়েও তাঁকে স্মরণ করতে পারি।

এ’কথা সে কথা, নানা কথায় মন আজ রবীন্দ্র কথায় ডুব দিয়েছে। ভাবছি কবে, কখন কিভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার জীবনে ঢুকে পরেছিলেন?  আমার সাথে তাঁর পরিচয় সেই কোন শৈশবে। মা আমাকে ছোটবেলা থেকে পাড়ার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃতি করাতে নিয়ে যেতেন। চার বছর বয়সে প্রথম মঞ্চে উঠেছিলাম । অনেক কসরত করে মা আমাকে মুখস্থ করিয়েছিলেন

“আমি আজ কানাই মাস্টার, পোড়ো মোর বেড়াল ছানাটি।

আমি ওকে মারি নে মা বেত, মিছিমিছি বসি নিয়ে কাঠি।”

গল্প শুনেছি যে স্টেজে উঠে রীতিমতন বিপর্যয় ঘটিয়েছিলাম। মাইকের সামনে গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে, আবৃতি করতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করি। পাড়ার লোকেদের সামনে মেয়ের এই বেয়াদপিতে, বাবা রেগে আগুন হয়ে ঠামাকে নিয়ে বাড়িমুখো হাঁটা দিয়েছেন। ঠিক তখনই আমাকে ফুলের মালা পরিয়ে উদ্যোক্তারা আবার মঞ্চে ফিরিয়ে আনলেন। এবং আমি পুরো কবিতাটা বলেছিলাম। কিছু মেয়ে সেজেগুজে মালা পরে মঞ্চের পিছনে বসেছিল নাচবে বলে। কি অন্যায়, আমি কেন ওদের মতন মালা পাবোনা?

 

এইভাবে একদম ছোট্টবেলায় আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  এসে গেলেন। আপনাদের জীবনেও নিশ্চয়ই কবিগুরুকে নিয়ে এইরকম নানা গপ্পো আছে? নেই? একটু ভেবে দেখুন তো। এরপর থেকে ২৫ বৈশাখে পাড়ার অনুষ্ঠানের জন্য কবিতা শিখেছি আর আবৃতি করেছি। শিশু, শিশু ভোলানাথের কবিতা আর তার সাথে সহজ পাঠ, যার ভাষা, ছন্দ আর ছবি ছিলো শিশু মনের এক আশ্চর্য্য আনন্দের ভান্ডার। এই দাঁড়িওয়ালা প্রশান্ত মানুষটি যে কে, আর কি ব্যাপক গভীর যে তাঁর সৃষ্টি, তা উপলব্ধি করবার বয়স তখনও হয়নি। তবুও তিনি এক বিশুদ্ধ শিশু মনের সঙ্গী হয়েছিলেন।  তাঁর হাত ধরে কখনও বীরপুরুষ হয়ে মাকে নিয়ে ঘুরে এসেছি

“মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে, মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।

তুমি যাচ্ছো  পাল্কিতে মা চড়ে, দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে”

আবার কখনও বা মায়ের সাথে লুকোচুরি খেলেছি

“আমি যদি দুষ্টুমি করে, চাঁপার গাছে  চাঁপা হয়ে ফুটি,

ভোরের বেলায় মা গো, ডালের পরে কচি পাতায় করি লুটোপুটি”

মা আমি এলেম কোথা থেকে? শিশু মনের সেই আজন্ম প্রশ্ন যার উত্তর দিতে মায়েরা যদিও বা বিব্রত হতেন, কবি কিন্তু এর জবাব এক অনবদ্য ভাবে দিয়েছেন। যা শুধু রবি কবিই দিতে পারেন। একেবারে শিশুদের উপযোগী করে।  মা বলছেন হেসে কেঁদে –

“ছিলি আমার পুতুল-খেলায়, ভোরের শিবপূজার বেলায়। তোরে আমি ভেঙেছি আর গড়েছি।

তুই আমার ঠাকুর সনে ছিলি পূজার সিংহাসনে, তাঁরি পূজায় তোমার পূজা করেছি।”

কবিতার হাত ধরে তাঁর সাথে পরিচয় হলেও, পরে স্কুলে প্রাথমিক বিভাগে পরবার সময়ে নৃত্য নাট্যেও অংশ নিয়েছি। নানা রঙের শাড়ি পরে, মাথায়-গলায়-কানে ফুলের গয়না পরে আলো ঝলমলে স্টেজে গানের তালে তালে নাচা খুবই আনন্দের ছিল। নাচে পটু না হলেও শিক্ষিকারা ঠিক চালিয়ে নিতেন।  এইসব কিছুই আমার শিশু মনকে রঙে, রসে, কল্পনায় সম্বৃদ্ধ করেছে। মনে পড়ে ডাকঘর নাটকে সুধার ভূমিকায় অভিনয় করবার কথা। বহুদিন ধরে পাশের ফ্ল্যাটে কাকিমার  ঘরে রিহার্সাল হয়েছিলো। ছোট্ট ডাইনিং রুমে বাচ্চারা ভিড় করে বসে থাকতো। আর তাদের ধাক্কাধাক্কি, খিলখিল হাসিতে একদম জমজমাট রিহার্সাল। স্নেহশীলা কাকিমা আমাদের দুষ্টুমিকে খুব প্রশ্রয় দিতেন। আমাদের মধ্যে বোধহয় সবাই ছেলেবেলায় ডাকঘরে ছোট বড় ভূমিকায় অভিনয় করেছি। ঠিক কিনা?

দেখতে দেখতে শৈশব পার করে কৈশোর, যৌবন, তারপর এই দীর্ঘ প্রবাস জীবন। আমার সকল সুখে-দুঃখে, সকল ভালোবাসায়, সকল প্রেমে-পূজায়, কবিগুরু তুমি আমার প্রিয় সখা হয়ে সাথে ছিলে। তোমার কোন কবিতায় হয়তো কোন বাল্যবন্ধুর স্মৃতি মিশে আছে। আবার কোন গানের মধ্যে এগিয়ে চলবার প্রেরণা । তুমি আমার শহুরে জীবনে গ্রাম বাংলার সোঁদা গন্ধ এনেছো। তোমার কবিতায় আমি না দেখা নদীর উচ্ছলতার শব্দ শুনেতে পেয়েছি। তোমার হাত ধরে আমার প্রেম মিশেছে পূজায়, আর পুজা মিশেছে প্রেমে।

সেই কোন ছোট্টবেলা থেকে কত যে দিয়েছো দু হাত ভরে। তাই আমি তোমার কাছে চির ঋণী। কবি গুরু তোমায় সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়ে তোমারই  কবিতার মধ্য দিয়ে এই লেখা শেষ করছি।

“দিনের আলো নিবে এলো সূ্য্যি ডোবে ডোবে।

আকাশ দিয়ে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।

মেঘের উপর মেঘ করেছে, রঙের উপর রঙ।

মন্দিরেতে কাঁসর ঘন্টা বাজল ঢং ঢং।

ও পারেতে বিষ্টি এলো, ঝাপ সা গাছপালা।

এপারেতে মেঘের মাথায় একশ মানিক জ্বালা।

বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে ছেলেবেলার গান –

বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এলো বান।”

এই কঠিন সময়ে তুমি আমাদের অন্তরের ভিতরে থেকে সাহাস যুগিয়ে যাও। আজকের এই মহামারির দিনে, কবিগুরু এ যে বড্ড জরুরি।


লেখিকা পরিচিতিঃ কাকলির জন্ম এবং পড়াশুনা কলকাতায়। সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর ছাত্রী। বর্তমানে কাকালি কানাডার ক্যালগেরি শহরে থাকে সপরিবারে।  পেশায় কাকলি  ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালগেরির শুলিক স্কুল অফ ইঞ্জিনীয়ারিং -এ সিনিয়ার রিসার্চ অ্যাডভাইসার। অনেক  দেশ  ঘুরেছে। লেখা তার বহুদিনের সৃষ্টিশীল ভালোবাসা। তার লেখায় ছুঁয়ে  থাকে প্রকৃতি, প্রেম পূজা আর মানুষের কাহিনী। কিছু গভীর অনুভবের আর অনুপ্রেরণার উপলব্ধি। সে লেখে নানা স্বাদের ছোট গল্প, প্রবন্ধ, আর ভ্রমণ কাহিনী। তার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে দেশ, সাপ্তাহিক বর্তমান ও অন্যান্য পত্রিকায়।