সহচরী ৩/ শ্রীরূপা মিত্র

Sahachari 4

২০১৯ এর প্রথম এবং আমার সহচরী ৩ হলেন ৫০ বছরের আমেরিকা-প্রবাসী এবং আদ্যন্ত কলকাতার মেয়ে শ্রীরূপা মিত্র। বাঙ্গালি দের কাছে শ্রীরূপা, আমেরিকান বন্ধুদের কাছে শ্রী আর আমার শ্রীদি।

ঠাকুরদা রায়সাহেব জিতেন্দ্রনাথ রক্ষিত গাজীপুর ওপিয়াম ফ্যাক্টরি শুরু করেন। পেশায় ও নেশায় কেমিষ্ট মানুষটি যুক্ত ছিলেন ক্যালকাটা কেমিক্যাল্‌স সঙ্গে।এই পরিবারটি বর্ধমানের অকালপোষের জমিদার পরিবার। এখনও এদের পারিবারিক দূর্গাপূজা হয়। মার দিকে দাদামশাই সতীশচন্দ্র মিত্র ছিলেন প্রথম ভারতীয় রেজিষ্ট্রার।ভীষণভাবে প্রিয় মামাবাড়ীটি আর্মহার্ষ্ট স্ট্রিটে। এখনও কলকাতায় গেলে শ্রীরূপা এখানে বেশ কিছুদিন সময় কাটান।

বাবাকে শ্রীরূপার মনে পড়ে খুব সুন্দর ও আকর্ষনীয় মানুষ হিসেবে। ইঞ্জিনীয়ার ছিলেন। শিকার করতেন, শিকারের মাংস রান্না করে খাওয়াতে ভালোবাসতেন, বেদে দিয়ে সাপ ধরাতেন। বাবা ছিলেন Spontaneous, adventurous। কলকাতায় মানিকতলায় পৈতৃক বাড়ীতে বেশ দিন কাটছিল এই পরিবারটির। অকস্মাৎ্‌ বিপর্যয় ঘটল।মাত্র ৪৫ বছর বয়সে করোনারী অ্যাটাক হয়ে বাবা মারা যান।শ্রীরূপা তখন সাড়ে ষোল, ভাই আট, মা অসহায়। এই সময় দাদুকে পাশে পেয়েছেন। মামাবাড়ীর ভরসা না পেলে পরিবারটি হয়ত ভেসে যেত। সেই কৈশোর থেকেই তিনি মা আর ভাইয়ের ভরসা। লরেটো থেকে সিনিয়ার কেম্ব্রিজ পাশ করে কাগজে অ্যাড দেখে মেয়েদের ইংলিশ পড়িয়েছেন কিছুদিন।

যাদবপুর বিশববিদ্যালয়ে Electronics and Telecommunications engineering পড়তে শুরু করেন স্কুল পাশের পর। তাদের ক্লাসে ছিল তিনজন মেয়ে। ৫ বছরের কোর্স।অরূপ মিত্রের সঙ্গে আলাপ যাদবপুরে পড়তে পড়তে। অরূপ ও ছিলেন Spontaneous adventurous। বোধহয় সেইখান থেকেই ভালোলাগা আর ক্রমে ক্রমে ভালোবাসায় পরিণত হয়। ১৯৬৯ সালে বিয়ের পর আমেরিকায় পাড়ি দিলেন দুজনে। পিট্‌সবার্গ শহরে বাসা বাঁধলেন। দুজনেরি ইচ্ছা মাষ্টার্স করবেন। ভর্তি হলেন ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু শ্রীর ভালো লাগলো না পড়তে। তিনি চাকরী দেখতে শুরু করেন। কিন্তু চাকরী পাননি বেশ কিছুদিন কারণ তিনি মহিলা ইঞ্জিনীয়ার। সময়টা ১৯৬৯। যারা জুলিয়া রবার্টস এর “মোনালিসা স্মাইল” দেখেছেন তারা জানবেন। যারা দেখেননি তাদের মনে করিয়ে দিই ১৯৫০-১৯৭০ অবধি মেয়েদের পড়ার বিষয় ছিল “হোম সায়েন্স”- এতে সেখানো হতো কিভাবে ভালো ঘরনী হওয়া যায়। সেই সময়ের একজন ইঞ্জিনীয়ার তায় মহিলা- নৈব নৈব চ! অনেক চেষ্টার পর L.K. Comstock এ Drafting এর কাজ পান। এদিকে এদেশে এলেও শ্রীর খুব একটা ভালো লাগছিল না। বাড়ির জন্য মনখারাপ আর চাকরীতে একটু disillusioned অনুভব করছিলেন। ইতিমধ্যে অরূপ এম বি এ শেষ করে চাকরীতে যোগ দিয়েছেন। দুটি মিষ্টি কুকুর নিয়ে তাদের সংসার।

শ্রী Duquesne Light এ Senior Planning Engineer এর চাকরী পেলেন।প্রায় ২৭ বছর চাকরী করেছেন এখানে।এখানে তিনি প্রথম ভালো কাজের পরিবেশ পান।ইতিমধ্যে ব্যাক্তিগত জীবনে পরিবর্তন এসেছে। অরূপের সঙ্গে তার ডিভোর্স হয়ে গেছে। শ্রী একাএকাই তার নিজের জীবন গড়ে তুলেছেন। অসম্ভব স্বাবলম্বী এই মানুষটিকে কখনই কিছু কাবু করতে পারেনি। শ্রীর মতে তিনি কখনো discriminated  হননি গায়ের রং এর জন্য, কিন্তু মহিলা ইঞ্জিনীয়ার হিসাবে কাজ করতে গিয়ে discriminated হয়েছেন। যখনি  কোনো কনফারেন্সে গেছেন ও অন্যান্য মহিলা ইঞ্জিনীয়ারদের সঙ্গে দেখা হয়েছে এবং তাদের কাছেও এই একই কথা শুনেছেন।

ইতিমধ্যে আমেরিকায় Economic crisis  এলো। সময়টা ২০০১ এর পর। অনেকের সাথে শ্রীও চাকরী হারালেন। এরপর অ্যালেনটাউনে কিছুদিন চাকরী করেন। এরপর আবার তার প্রিয় পিট্‌সবার্গে ফিরে আসেন এবং Mitsubishi তে যোগ দেন। পাঁচ বছর কাজ করার পর অবসর নেন। এতদিনে অনেকদিন কাজ করেছেন, পরিবারের প্রতি অনেক কর্তব্য করেছেন। এবার তার অবসর নেবার পালা। দেখতে দেখতে ১০ বছর হয়ে গেল শ্রী খুব আনন্দের সঙ্গে তার অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, প্রতিদিন জিম এ গিয়ে এক্সেসাইজ, দেশবিদেশ ভ্রমণ- এই নিয়েই দিব্যি সময় কেটে যাচ্ছে। অনেক দেশ ঘুরেছেন শ্রীরূপা। কখনো একা, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে।সবথেকে ভালো লেগেছে কেনিয়া। ছবির মতো সুন্দর বাড়ী তার। বাড়ীর দেখাশুনা, গাছের পরিচর্যা করে তার দিন কেটে যায়। কলকাতা যান বছরে একবার। দেশে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে ভালো লাগে।

শ্রীরূপা একা, কিন্তু একাকীত্বে ভোগেন না। সবকিছুই নিজে করেন, কারুর ওপর নির্ভর করেন না। নিজেকে অপূর্ণ মানুষ ভাবেন না। সেই ষোলবছর বয়স থেকেই তিনি মা আর ভাইয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং সারাজীবন ধরে পালন করেছেন। তার মতে জীবনে অনেক ঝড়ঝাপটা আসে, কিন্তু উঠে দাঁড়াতে হয়। তার মতে জীবনে অনেক ঝড়ঝাপটা আসে, কিন্তু উঠে দাঁড়াতে হয়।তিনি তার সব দায়িত্ব পালন করেছেন। বাবা মারা যাবার পর থেকে মা আর ভাই-এর দায়িত্ব নিয়েছেন। মা কয়েক বছর হল মারা গেছেন।

শ্রীর বক্তব্য প্রবাসী বাঙালি মেয়েদের প্রতি – আরো mainstreamed হওয়া উচিত।নিজেদের ethnicity ভালো কিন্তু তার বাইরেও একটা জগত আছে। অন্যান্য মানুষের সাথে মেশা উচিত। বাঙ্গালি মেয়েদের আরো এগিয়ে আসা উচিত। আরো আত্মবিশ্বাসী হওয়া উচিত। বাঙ্গালি মেয়েরা অনেকেই খুব শিক্ষিত কিন্তু নিজের ক্ষমতার ওপর অতটা বিশ্বাস নেই।

     শেষ করার আগে বলে রাখি আমার সঙ্গে শ্রীর আলাপ পিট্‌সবার্গ শহরে আসার আগেই। এখানে এসে বন্ধুত্ব হয়েছে। যদিও তিনি প্রায়ই বলে থাকেন তিনি আমার মায়ের বয়সি, তবুও আমি তাকে একজন বন্ধু বলেই ভাবি। বন্ধুত্ব অনেক রকমের হয়। ঠিক এক বাক্স চকোলেটের মতো- বাইরে থেকে দেখতে হয়ত একই, কিন্তু খেলে একে্কটা একেক রকম। শ্রী সঙ্গে অনেক বিষয়ে আলোচনা করা যায়। বেশী ভালো লাগে তার গল্প শুনতে। শ্রীর সাহস আর প্রাণশক্তি আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমার এই সহচরী নিজের গুনে অপরূপা।

Advertisements

খুচখাচ রান্না ৪/ ভর্তা

১) মাইক্রোওয়েভ-এ বেগুন ভর্তা                  Sahachari 2

সুস্মিতা ঘোষ

উপকরণঃ

একটা মাঝারি বেগুন

১/২ মাঝারি পেঁয়াজ

কাঁচা লংকা ২-৩ টে

সর্ষের তেল

নুন

পদ্ধতিঃ

  • বেগুনটাকে ধুয়ে মুছে নেবে প্রথমে। একটা পাইরেক্স-এর চৌকো পাত্রে রাখবে।
  • পাত্রে থাকা অবস্থায় বোঁটা টা আস্ত রেখে বেগুনটাকে চার ভাগ করে চিরে নেবে।
  • এবারে দু টেবিল চামচ সর্ষের তেল আর পরিমান মতো নুন দিয়ে বেগুনের ভেতরটা ভাল করে মাখিয়ে নেবে।
  • এবারে মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে ১০ মিনিট রান্না করবে।
  • ১০ মিনিট পর বের করে দেখবে নরম হলো কিনা।
  • না হলে ঢেকে ৫ মিনিট রান্না করবে। নরম না হলে আবার মাইক্রোওয়েভে ২ মিনিট ২ মিনিট করে গরম  করবে।
  • বেগুন পুরো নরম হয়ে গেলে, একটা চাকু দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে নেবে। খোসা ফেলে দিতে পারো। আমি রেখে দিই।
  • তারপর পেঁয়াজ, কাঁচা লংকা দিয়ে মেখে নেবে।
  • পরিবেশনের আগে একটু ধনে পাতা কুঁচি ছড়িয়ে দেবে।
  • এটা খেতে খুব ভালো হয়।

 

২) বাঁধাকপি সেদ্ধ বা ভর্তা              Sahachari 2

সুস্মিতা ঘোষ

উপকরণঃ

একটা ছোট বাঁধাকপি

কাঁচা লংকা ২-৩ টে

সর্ষের তেল পরিমান মতো

নুন

ধনেপাতা

পদ্ধতিঃ

  • বাঁধাকপি ধুয়ে ছোট করে কেটে নেবে প্রথমে।
  • প্রেসার কুকারে বাঁধাকপি রেখে ১/২ কাপ জল দিয়ে মাঝারি আঁচে উনুনে বসাবে।
  • কুকারে দুটো হুইসেল হলে বন্ধ করে ঠান্ডা হতে দেবে।
  • একটু ঠান্ডা হলে বাঁধাকপি বের করে একটা পাত্রে রাখবে।
  • এবারে নুন, সর্ষের তেল, কাঁচা লংকা, আর ধনেপাতার কুচি দিয়ে বেশ চটকে মাখবে।
  • গরমভাতে একটু ঘিয়ের সাথে খেতে দারুণ লাগে।

আমার কথা

সহচরী/যশোমান ব্যানার্জী

ভিন্ন দেশের ভিন্ন নিয়ম

কিংবা রান্না বান্না

হাতের কাজের হরেক পুঁতিcropped-sahachari-pic-1

সাজিয়েছি চুনি পান্না

হাজার হাজার গল্প কথা

মনকে আছে ভরে

আয় না সহচরী

সে সব দি তোকে ভাগ করে

********************************************

২০১৯ এর শুরুতে সবাইকে জানাই নতুন বছরের শুভেচ্ছা। আগামী বছর সবার ভালো কাটুক, সবাই সুস্থ থাকুন, আনন্দে, শান্তিতে থাকুন -এই কামনা করি। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি ঘরছাড়া মানুষ, শিশু ও পশুরা যেন এই ঠান্ডায় কষ্ট না পায়। জানি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাড়িতে বসে আমার এই প্রার্থনা খুবই অবান্তর। তবুও আমি বিশ্বাস করি আমার মতো অনেকে যদি এই একই প্রার্থনা করেন, তাহলে তার কিছুটা ফল অন্ততঃ ফলবে। সারাদিনে কয়েক মিনিট আমরা সবাই মিলে দুঃস্থ মানুষের জন্য একটু তো ভাবতেই পারি, তাই না? আমার এক কলিগ এবার কোনো গিফ্‌ট নেয় নি ক্রিশমাসে। স্বামীস্ত্রী টাকাটা ইয়েমেনের রিফিউজি বাচ্ছাদের দান করেছে। কি সুন্দর ভাবনা! পরের বছর আমি ঠিক করেছি কোনো ভাল কাজের জন্য দান করব, নিজের জন্য কিছু না কিনে।

 

সহচরী ২/ সুমিত্রা ভট্টাচার্য্য

Sahachari 4

সহচরী ২ সুমিত্রা ভট্টাচার্য্য

এবার আমার সহচরী পর্ব পোষ্ট করতে একটু দেরী হল। কাজের চাপে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমার সহচরী ২ হলেন সুমিত্রাদি- সুমিত্রা ভট্টাচার্য্য। দীর্ঘদিন পরিচয়। আমার ক্লীভল্যান্ড-জীবনের শুরু থেকে। শান্ত-শিষ্ট, স্নেহময়ী এই মানুষটিকে দেখলে বোঝা যায় না যে ভিতরে একজন শক্ত, দৃঢ়চেতা মানুষ আছেন।আরো গুন আছে, ক্রমশঃ প্রকাশ্য।

সুমিত্রার জন্ম কালিঘাটের পটুয়াপাড়া লেন -এর মামাবাড়িতে।কাছেই নিজেদের বাড়ি।সেখানে বড় হয়েছেন দাদু-ঠাকুমা, মা-বাবা ও পিসির স্নেহছায়ায়, দুই দাদা আর ছোটবোনের সংগে।আদি বাড়ি ছিল ঢাকায়। তারপর কলকাতা চলে আসে এই পরিবারটি।

বাবা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী ঢাকায়।পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে ঢাকা থেকে কলকাতা আসার সময় জাহাজে ধরা পড়ে যান। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে প্রায় বছর আষ্টেক কারাবন্দী ছিলেন।জেলে বন্দী থাকাকালীন বি এ পাশ করেন। মুক্তি পেয়ে ব্যাঙ্কে চাকরী পান। মা ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী। খুব ভালো গান গাইতেন। খুব অল্প বয়স থেকেই অনেক গানের প্রোগ্রাম করেছেন। ১৭ বছর বয়সে বিয়ে হবার পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ল। খুব ভালো সেলাই করতেন। মায়ের তৈরী করা জামা পড়ে বড় হয়েছেন চার ভাইবোন।

এরকম বাবা-মায়ের সন্তান যে বড় হয়ে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হবেন সেটা বলা বাহুল্য।পড়াশুনা দেবেন্দ্র বিদ্যাপীঠে। স্কুলের গন্ডী পেরিয়ে মুরলীধর গার্লস কলেজে ভর্তি হলেন বাংলায় বি এ পড়তে। পরীক্ষার সময় এল ঝড়- বাবা চলে গেলেন অসময়ে, মাত্র ৫০ বছর বয়সে। কলেজে পড়ার আগে থেকেই বাবার শরীর খারাপ। হাইপ্রেসার ছিল আগে থেকেই, স্ট্রোকও হয়ে গেছে।পরীক্ষার চার-পাঁচদিন আগে বাবা ভর্তি হলেন হাসপাতালে সার্জারী হবার জন্য।বাবার জন্য মনখারাপ হলেও যথাসময়ে পরীক্ষা দিতে বসলেন সুমিত্রা।এক্সামিনার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও লেখার খাতা দি্যে গেছেন। প্রথম পাতায় লিখতে গিয়ে পেনের কালিতে পাতা ঢেকে গেল। কোনোমতে লিখে পরীক্ষা দিয়ে বেড়িয়ে এলেন।সাধারণতঃ পরীক্ষার বিরতির সময় মা আসেন খাবার নিয়ে। বেড়িয়ে এসে দেখেন মা নেই, তার বদলে মাসী এসেছেন। একটু অবাক হলেন।মনে উদ্বেগ নিয়ে পরের পরীক্ষায় বসলেন।কিছুক্ষন বাদেই খবর এল বাড়ী থেকে লোক নিতে এসেছে। অর্ধেকলেখা খাতা জমে দিয়ে বেড়িয়ে এলেন।এসেই শুনলেন বাবা মারা গিয়েছেন সকাল দশটায়। মনে পড়ল ঠিক ওই সময়েই তো তার পরীক্ষার খাতা কালিময় হয়ে গিয়েছিল! মনে হল যেন বাবা জানিয়ে গেলেন যে তিনি চলে গেলেন।আর পরীক্ষায় বসতে চাইছিলেন না। কিন্তু মাষ্টারমশাই এর নির্দেশে ওই অবস্থায় পরীক্ষা দিলেন। মনে জানেন পাশ করার কোনো সম্ভাবনা নেই। রেসাল্ট বেরোলে দেখেন যে তিনি পাশ করেছেন। ঘটনাটা খুব অদ্ভুত তাই না! সুমিত্রার ও তাই মনে বিশেষভাবে দাগ কেটেছিল।

এর কিছুদিন বাদেই ১৯৬৯ সালে সুমিত্রা রায়ের বিয়ে হল ইঞ্জিনিয়ার দিব্যেন্দু ভট্টাচার্যের সঙ্গে। বিয়ের পর সবামীর বিশেষ ইচ্ছায় এম এ পড়তে শুরু করলেন। ১৯৭০ -এ দিব্যেন্দু এলেন আমেরিকার মেরীল্যান্ডের বাল্টিমোর শহরে।কিন্তু তখনো সুমিত্রার পড়া শেষ হয়নি। তখন রাজনৈতিক ডামাডোল চলছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরীক্ষার দিন পিছিয়ে যাচ্ছে, রেজাল্ট বেরোতে দেরী হচ্ছে।তার মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে পড়া শেষ করে ১৯৭১ সালে সুমিত্রা পাড়ি দিলেন আমেরিকায়।

বাল্টিমোর শহরে শুরু হল তাদের সংসার।ইতিমধ্যে স্বামী এম বি এ পড়তে শুরু করেছেন University of Maryland এ। সুমিত্রা IBM -এ কম্পিউটার ট্রেনিং এ ভর্তি হলেন। কাজ করলেন কিছুদিন Johns Hopkins University -তে। Data recording এর কাজ।বছর দুয়েক কাজ করে একটি consulting company Euelle & Bomhardt এ computer record keeping এর চাকরী পেলেন। কম্পিউটার ডিপার্টমেন্টের ছয়জনের মধ্যে তিনি একমাত্র মহিলা।সহকর্মীদের কাছে সন্মান পেয়েছেন। ইতিমধ্যে দিব্যেন্দু নতুন চাকরীতে যোগ দিয়েছেন।

ছেলে সায়ন এল ১৯৭৪ এর ডিসেম্বরে। তার আগে নভেম্বর অবধি কাজ করেছেন। মনস্থির করেছেন ছেলে পাঁচমাস হলে আবার কাজে ফিরে আসবেন। ছয়মাসের ছুটি মঞ্জুর হয়ে গেছে।ছোট্ট সায়ন কে নিয়ে চোখের নিমেষে কেটে গেল পাঁচমাস।ছেলের জন্য ডে কেয়ার ঠিক। কিন্তু যখন সময় এল, মায়ের মন কিছুতেই ছেলেকে পাঠাতে পারল না।অগত্যা আর কাজে যাওয়া হল না। ছেলেকে নিয়ে সুমিত্রা ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন। অনেক সময় কাটিয়েছেন ছেলের সঙ্গে।

ইতিমধ্যে তাদের বাসাবদল হয়েছে মেরীল্যান্ড, ভার্জিনিয়া ও মিশিগানে।মিশিগানে ছিলেন দেড়বছর। মেয়ে ঈশানীর জন্ম এখানে। এর ছয়মাসের মধ্যে দিব্যেন্দু বড় চাকরী নিয়ে BP তে যোগ দিলেন ক্লীভল্যান্ডে। জীবন ক্রমশঃ ব্যাস্ত হয়ে উঠেছে। সবামীর বড় চাকরী, ব্যাস্ত জীবন, ছেলে পড়াশুনা ও অন্যান্য extracurricular activity, ছোটো ঈশানী, সঙ্গে আছেন। ছেলের ১৩ বছর বয়সে তাকে একটি ভালো বোর্ডিং স্কুলে পাঠানোর ব্যাবস্থা হল। কিন্তু মায়ের মন মানবে কেন?খুব মনখারাপ। ছেলে চলে যাবার পর আবার চাকরী করা শুরু করেন ডে কেয়ারে।প্রথমে খুব অল্প সময় কাজ করতেন, কারণ মেয়ে তখনো ছোটো। মেয়ে হাই স্কুলে যেতে শুরু করলে সময় বাড়িয়ে দিলেন এবং রোজ যেতে শুরু করেন। বড় হয়ে ঈশানীও এই ডে কেয়ারে কাজ করেছে কিছুদিন। ৭ বছর কাজ করেন United Way র এই ডে কেয়ারে। এরপর অন্য একটি ডে কেয়ারে কাজ শুরু করেন full time employee হয়ে। ২৪ বছর কাজ করেছেন এখানে। এই দীর্ঘদিন কাজে অনেকবার award পেয়েছেন। Pride Award পেয়েছেন ১৯৯৮ তে।তিনি ছিলেন বাচ্ছাদের প্রিয়। বাবা-মাদের কাছে অনেক ভালোবাসা পেয়েছেন। তাদের অনেকে এখন তার ফেসবুক বন্ধু, যদিও বাচ্ছারা বড় হয়ে গেছে।

ইতিমধ্যে মেয়ে ঈশানীর বিয়ে হয়েছে এবং কর্মসুত্রে সে এখন ক্লীভল্যান্ডে। তার দুই ছেলে। ঈশানীর ছোট ছেলে হবার পর সুমিত্রা ঠিক করেন তিনি এবার ডে কেয়ার ছেড়ে দেবেন এবং নাতির সঙ্গে সময় কাটাবেন। কিন্তু তিনি বললে কি হবে, তাকে কর্মস্থল ছাড়বে না। এরকম কর্মনিষ্ঠ এমপ্লয়ী ছাড়তে তাদের মন চায় না। অবশেষে এল কাজের শেষদিন। সহকর্মীদের ও বাচ্ছাদের বিদায় জানিয়ে সুমিত্রা কাজ থেকে অবসর নিলেন।

এখন সবামী -স্ত্রী দুজনেই অবসর জীবন কাটান তাদের বিশাল বাড়ীতে। একা নয়, নাতিদের নিয়ে বাড়ী এখন গম্‌গম্‌ করছে। আর কি?  ৪৯ বছর বিয়ে হয়েছে। জীবনে সব কর্তব্য পালন হয়ে গেছে। ছেলে সায়ন Law farm partner New York এ থাকে। মেয়ে ঈশানী Clinical Psychology তে Ph.D করে এখন প্রাকটিস করছে।তাদের জীবন তাদের নিজস্ব।

আমার এই সহচরীকে নিয়ে লিখব ভাবলাম কারণ সুমিত্রা এমন একজন মানুষ যিনি খুব Simple – সবামী বিশাল চাকরী করেছেন, সুমিত্রার চাকরী করার কোনো দরকার-ই ছিল না। কিন্তু তিনি করেছেন, কারণটা তার কাছে বাচ্ছারা খুব প্রিয়। তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে তিনি ভালোবাসেন। শুধু তাই নয়, সুমিত্রা অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ।নিজের জীবনেও এবং কাজেও। সুমিত্রা এমন একজন মানুষ যিনি সবরকম মানুষের সাথে কথা বলতে পারেন। কোনো অহংকার নেই। আমি তার কাছে জীবনের অনেক শিক্ষা পেয়েছি এদেশে এসে। আমার এই সহচরী নিজগুনে অন্যন্যা।

খুচখাচ রান্না ৩ ডিমের কেক

Sahachari 2

ডিমের কেক

নমিতা ঘোষ

উপকরণ

মুরগীর ডিম ১২ টা

মুরগীর কিমা ২০০ গ্রাম

১ টি মাঝারী পেঁয়াজ (কুচি)

পালং পাতা কুচি, ২ কাপ

নুন (প্রয়োজন মতো)

রসুনবাটা ১/২ চা চামচ

মাখন ২ চামচ

 

পদ্ধতী

প্রথমে ১২ টি ডিম ভেঙে খুব ভালো করে ফেটিয়ে নাও। একটি ফ্রাইং প্যানে অল্প তেল দিয়ে মুরগীর কিমা নুন আর রসুনবাটা মিশিয়ে নেড়ে নাও।শুকনো করে ভেজে নিয়ে ফেটানো ডিম মেশাও।এবারে পেঁয়াজকুচি ও পালং পাতা কুচি, প্রয়োজনীয় নুন মিশিয়ে নাও। এবার একটি ওভেনে রান্না করা যায় এমন একটি পাত্র নাও। ভাল করে মাখন মাখিয়ে নাও। ফেটানো ডিমের মিশ্রন ঢেলে দাও। এবার ওভেনটিকে preheat করে নাও। ২০০ ডিগ্রীতে ২০ মিনিট বেক করে নাও।বের করে ঠান্ডা হয়ে গেলে উপুড় করে কেকটি বের করো। চৌকো করে কেটে পরিবেশন করো।

কথোপকথন/ সহচরী ১

 

Sahachari 4

সহচরী ১ মিতা পল

আমার প্রথম সহচরী হলেন মিতাদি (মিতা পল)। একদিকে পেশায় IT program manager, একাই ৬০ জনের একটি টিম সামলান, অন্যদিকে গৃহিনী, স্ত্রী, মা এবং বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত দীর্ঘদিন ধরে। তবে প্যাশন হল নাটক। এই প্রসঙ্গে পরে বলছি।

জন্ম ইচ্ছাপুরে। বাবা ছিলেন ডিফেন্স-এ। সেই সুত্রে পরবর্তী কালে কানপুরে ডিফেন্স কলোনীতে বসবাস এবং সেখানেই বড় হয়েছেন। প্রবাসে বাংলা শেখা মার ইচ্ছায়। বাড়ীতে ছিল অনেক বাংলা বই। ছোটবেলাতেই পরিচয় রবীন্দ্ররচনাবলীর সঙ্গে। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখেছেন গীতবিতানে।

স্কুলের গন্ডী পেরিয়ে মিতা এলেন যাদবপুর বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়তে । Physics honors  এর ছাত্রী মিতার কলকাতায় হোস্টেলে নতুন জীবন শুরু হল। পড়াশুনার সাথে সাথে বাংলা সাহিত্য পড়া আবার শুরু হল। সতীনাথ ভাদুড়ীর “ঢোড়াই চরিত মানুষ” দিয়ে শুরু। যাদবপুরে কাটানো ৫-৬ বছরে মিতা culturally enriched হলেন। এসবের মধ্যেই কানপুরের মিতা চ্যাটার্জীর পরিচয় হল Chemical engineering এর ছাত্র দিব্যেন্দু পলের সঙ্গে। একসঙ্গে নাটক করা শুরু হল। বিয়ে করেন ১৯৮৪ সালে। আমেরিকার ওকলাহোমাতে পাড়ি দেন ১৯৮৮ সালে। ইতিমধ্যে জীবনে তৃতীয় মানুষের আবির্ভাব হয়েছে। একমাত্র ছেলে প্রিয়াঙ্ককে নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর নতুন জীবন শুরু হল আমেরিকায়। ক্রমে North Carolina এলেন এবং জমে উঠল তিনজনের সংসার।এখানে আবার বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত হন। স্বামী-স্ত্রী মিলে অনেক নাটক produce করেছেন। নাটকের  দল  তৈরী করেন- Carolina Theater Workshop (CLT-W)। সবামী দিব্যেন্দু Creative director আর বাকীটা মিতা সামলেছেন। এই যে বাকীটা বললাম- এটা কিন্তু অনেকটা কাজ একটা নাটকের দলের ক্ষেত্রে।নাটক শুরু করা, রিহারসাল ঠিকঠাক হওয়া, লোকজনের সংগে যোগাযোগ করা এবং রাখা, venue ঠিক করা, টিকিট বিক্রি করা, নাটক মঞ্চস্থ করা- একটা বিরাট ব্যাপার। স্টেজে অভিনয় ছাড়াও অনেক আনুসংগিক কাজ থাকে। নাটকের দল নিয়ে বাইরে গেছেন অনেকবার show করতে। কলকাতা থেকে বিখ্যাত নাটকের দল নিয়ে এসেছেন।

দৈনন্দিন জীবন কিন্তু থেমে থাকেনি। সংসার, ছেলে মানুষ করা, নাটকের সঙ্গে সঙ্গে Network Engineering নিয়ে MBA শেষ করে IBM এ যোগদান করেন ১৯৯৮ সালে।ব্যাংগালোরে কাটান দেড় বছর Service Coordinator Delivery Project Executive হিসেবে।এই সময়ে একটা বড় টিম একাই সামলেছেন। অনেক রকমের মানুষ নিয়ে কাজ করেছেন। এই সময়ে তার people handling skills খুব কাজে এসেছে।

বর্তমানে মিতা থাকেন Washington DC তে স্বামীর সঙ্গে। ছেলে স্কুল-কলেজের গন্ডী শেষ করে এখন Lawyer। এখানে বলে রাখি এই রকম নাটক-পাগল মা-বাবার সন্তান প্রিয়াঙ্ক কিন্তু ছোটবেলায় অনেক নাটক করেছে। মিতার একান্ত ইচ্ছা ভবিষ্যতে দেশে গিয়ে কোন NGO adopt করা এবং তাদের নানাভাবে সাহায্য করা। মিতার মনে পড়ে ছোটবেলায় দেখেছেন মাকে Women welfare এর সেলাই স্কুল চালাতে। Philanthropist বাবাকে- যিনি নিঃশব্দে দান করতেন।

মিতার মতে ভবিষ্যত নাটক – “আমরা অনেকটা সময় পেরিয়ে এসেছি সেই সময় থেকে যখন ছেলেরা মেয়েদের রোল করতেন। এখন অনেক মেয়ে আসছেন মেয়েদের রোল করতে।  কিন্তু একদিন আসবে যেখানে Unisex roles আর Strong character roles আসবে। নাটক এমনি একটা মিডিয়া যেটা একদিকে Therapeutic অন্যদিকে Empowerment আনতে পারে মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে সেই সব মেয়েদের জন্য যারা নিজের জন্য বলতে পারেনি বা পারেনা- নাটক তাদের একটা Front হতে পারে। নাটক শুধুমাত্র আমোদ বা entertainment এর জন্য নয়-একটা ক্ষমতাবান media -যা খুব সহজে মানুষের হৃদয় ছুঁতে পারে। ভবিষ্যত প্রজন্ম নাটক-Therapy র কথা ভাবতে পারে।“

খুচখাচ রান্না ২/ মুশুরের ডালের পাতুরী

 

Sahachari 2

মুশুরের ডালের পাতু্রী

নমিতা ঘোষ

পদ্ধতিঃ ২ কাপ মুশুর ডাল ভিজিয়ে নাও। এবারে ডালের সংগে ২/৩ টি কাঁচালংকা দিয়ে বেটে নাও। ২ টেঃ চামচ সরু পেঁয়াজ কুঁচি, ২/৩ চামচ ধনে পাতা কুঁচি, ১ চামচ সরু করে কাটা আদা কুঁচি ভাল করে মিশিয়ে নাও। পরিমানমতো নুন আর ১ চামচ সর্ষের তেল মিশিয়ে নাও। এবারে কলাপাতা একটু বড় করে কেটে নাও। অল্প আঁচে চাটু বসিয়ে কলাপাতার টুকরোগুলি সেঁকে নাও (পাতুরীর জন্য মুড়তে সুবিধা হবে)। এবারে চারটি কলাপাতার টুকরোর মধ্যে মুশুর ডালের পেষ্ট সমান ভাগে ভাগ করে রাখ। কলাপাতা মুড়ে নিয়ে সুতো দিয়ে বেঁধে নাও। চাটুর ওপরে অল্প আঁচে সেঁকে নাও (৪/৫ মিনিট)। দুই পিঠে ভাল করে সেঁকে পরিবেশন কর।