সহচরী ৮, রীতা কর্মকার

Sahachari 4

সহচরী ৮ রীতা কর্মকার

আন্তর্জাতিক মিউসিক দিবস ছিল গত শনিবার। এটা জুন মাস। এই মাসের সহচরী হলেন ক্যালগরিবাসী রীতা কর্মকার। রীতার খবর আমি পাই আমার বন্ধু কাকলির কাছে।  এম বি এ রীতার নিজের একটি কন্‌সাল্টিং ফার্ম আছে।এছাড়াও প্রসিদ্ধ গানের শিল্পী, সুরকার, গানের স্কুল আছে এবং মিউসিক ইনস্ট্রাক্টার (Instructor)। রীতা স্ত্রী এবং মা। এক্কেবারে দশভুজা। নাঃ এভাবে না, রীতার সম্বন্ধে বিস্তারিত জানলে তবেই আপনারা বুঝতে পারবেন কেন আমি রীতাকে দশভুজা বললাম।

রীতার জন্ম ঢাকায়। বাবা ছিলেন গভর্ন্মেন্ট চাকরীতে। অনেকবার চাকরীসুত্রে বদলী হয়েছেন।ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে গানের পরিবেশ ছিল। ওস্তাদজী আর তবলাবাদকের সঙ্গে গানের চর্চা চলত। তারপর মা একদিন জোর করে ভর্তি করে দিলেন প্রসিদ্ধ গানের স্কুল “ছায়ানট”-এ। রীতা তখন কার্টুন দেখতে ভালোবাসেন। বেশ রেগেমেগেই গেলেন গান শিখতে। কিন্তু সেই তার গানের জগতে প্রবেশ। ছায়ানটে শিখেছেন ৭ বছর। ট্রেনিং শেষ করে প্রসিদ্ধ সাংস্কৃতিক যোদ্ধা ও বিশ্বভারতীর পি এইচ ডি সঞ্জিদা খাতুনের হাত থেকে উত্তরীয় ও রবীন্দ্রসঙ্গীতে সার্টিফিকেট নিয়ে রীতার যাত্রা শুরু হল গানের জগতে গায়িকা হিসেবে।

গানের পাশে পাশে পড়াশুনা কিন্তু থেমে থাকেনি। ভারতেশ্বরী রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে ক্লাস এইট থেকে ক্লাস টুয়েল্ভ ওবধি পড়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে বিজনেস আডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে পড়াশুনা করেন। স্কুল থেকেই সংগঠন করে প্রোগ্রাম করেছেন। ইউনিভার্সিটির স্যোসালে ডিপার্টমেন্টের ছোট অর্গানাইজেসনের হয়ে প্রোগ্রাম করেছেন। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে বি কম (Honors) ও এম কম পাশ করলেন। ২০০০ সালে প্রথম ক্যানাডায় আসেন। এখানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালগরিতে  ১৪ বছর ইঞ্জিনীয়ারিং কেরিয়ার সার্ভিসেস-এ চাকরী করেন। এখান থেকে এম বি এ করে নিজের কন্সাল্টিং ফার্ম খোলেন।

রীতা ক্যালগরির মাউন্ট রয়াল ইউনিভার্সিটির ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল মিউসিকের ইনস্ট্রাক্টার। এছাড়াও ইঊনিভার্সিটি অফ ক্যালগরির ডিপার্টমেন্ট অফ  ক্ল্যাসিক আন্ড রিলিজিয়নের ইনভাইতেড স্পিকার হিসেবে মিউসিক এভোলিউসানের (Evolution) ওপর লেক্‌চার দেন প্রতিবছর। বিষয়টা হল কিভাবে সুরে্র উদ্ভব হল সামবেদের স্ত্রোত্রপাঠের সুর আর ছন্দ থেকে বর্তমান মিউসিকে।

২০০০ সালে ক্যালগরিতে প্রথম গানের জগতে প্রবেশ SILPA(School of Indian Language and Performing Arts) সংস্থাতে ভলান্টিয়ার টিচার হিসেবে। এখানে ভারতীয় ভাষা, গান, নাচ শেখানোর হয়। রীতা এখানে গানের শিক্ষিকা হিসেবে প্রথমে গানের ক্যারিকুলাম তৈরী করলেন একটা কাঠামো দেবার জন্য।পরবর্তীকালে পারফরমিং আর্টস্‌ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন।

বিদেশে এসেও যে সঙ্গীত হারিয়ে যায় না, তার প্রধান প্রমান রীতা।এখানে বিভিন্ন প্রোগ্রামে গান গাইতে শুরু করলেন।  ১০০ জনকে  নিয়ে “শতকন্ঠে বাংলাদেশ” গানের প্রোগ্রাম পরিচালনা করেন। বঙ্গভঙ্গ থেকে আধুনিক গানের ওপর।এছাড়াও রাগমালা মিউসিক সোসাইটির আমন্ত্রণে আসা পন্ডিত অজয় চক্রবর্তী এবং পন্ডিত যসরাজের সংগে তানপুরায় সংগত করেছেন। ইতিমধ্যে মহারাষ্ট্রের ক্ল্যাসিক্যাল গানের শিল্পী ডাঃ থাট্টে ভাটের কাছে ৫ বছর চালিম নিয়েছেন রীতা। এছাড়াও ছায়ানটের ট্রেনিং তো আছেই।বাড়িতে মিউসিক স্টুডিও করে সবাই কে নিয়ে গান শেখাতে শুরু করলেন।ছাত্র-ছাত্রীরা বাঙালি ও অবাঙ্গালি। বেশির ভাগই দ্বিতীয় প্রজন্ম। আর আছেন কিছু ক্যানাডিয়ান  মিউসিয়ান যারা ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যালের সঙ্গে জ্যাজ্‌ বা ওয়েষ্টার্ন মিউসিকের ফিউসন করতে চান।

ক্যালগরির আর্ট কমন্স্‌ একটি সরকারী সংগঠন যেটি বিভিন্ন ধরনের মিউসিকের একটা প্ল্যাটফর্ম। রীতা এখানে নিয়মিত পারফর্ম করেন। রীতা ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালগরিতে ওয়েষ্টার্ন ক্ল্যাসিক্যালের ওপর কোর্স নিয়েছেন স্টুডেন্ট হিসাবে,  ইষ্টার্ন ও ওয়েষ্টার্ন মিউসিকের তারতম্য ও সংযোগ করতে পারেন। তার এই ইউনিক গুনের জন্য তিনি দুইদিকের মিউসিকপ্রেমীদের কাছে বিশেষ ভালোবাসা ও সন্মান পান।

এবার আমি সুরকার রীতার কথায় আসব। এটাও তার অনেক পরিচয়ের মধ্যে একটা।প্রথম শুরু হয় বাংলাদেশ আসোসিয়েশনের বড় কবি শ্রী মহাদেব সাহার লেখা কবিতা নিয়ে।রিটায়ার্ড হয়ে ছেলের কাছে চলে আসেন এই কবি।অনেক গান লিখেছেন। রীতা তার সঙ্গে তার লেখা কবিতার ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে সুর দিয়েছেন। তৈরী হয়েছে ১০০ র ওপর গান রীতার সুরে।

একবার এক পাকিস্তানী কবি ক্যানাডায় এসেছেন। এদিকে দেশে মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, কিন্তু বাবা তার মেয়ের বিয়েতে যেতে পারছেন না। এই উপলক্ষ্যে একটি শায়রী লিখেছেন, একান্ত ইচ্ছা বিয়েতে মেয়েকে উপহার দেন। রীতা তার কাছে গিয়ে উর্দু শায়রীর কথা বুঝে তাতে সুর দিয়ে, সেই গান নিজে গেয়ে রেকর্ড করে দিয়েছেন। বাবা তার লেখা, রীতার সুর ও গানের সেই শায়রী মেয়েকে যথাসময়ে পাঠান বিয়ের উপহার হিসেবে।

এছাড়াও চলে তার কোলাবরেশনের কাজ।লোকাল মিউসিয়ানদের সঙ্গে মিউসিকের ওপর আলোচনা ও চর্চা চলে। পিয়ানোর নোটস্‌ নিয়ে বিস্তারিত রিসার্চ করে ইষ্টার্ন মিয়সিকের সঙ্গে ওয়েষ্টার্ন মিউসিক মেশান রীতা, যাতে সেই সুরে গান গাওয়া যায়।

মিউসিকে তার অবদানের জন্য ক্যালগরির হিন্দু মন্দিরে গুরুপূর্নিমায় অনেক সিনিয়ার লেভেলের গুরুর সঙ্গে মিউসিক গুরু হিসেবে সন্মানিত হয়েছেন রীতা। মিউসিক কম্পিটিসনে মিউসিক জাজ্‌ হিসেবে নিয়মিত যোগদান করেন।কম্পিটিসনের শেষে বিস্তারিত আলোচনা করেন র‍্যাঙ্কিং এর ওপরে।কিভাবে র‍্যাঙ্কিং করা হল, কেন করা হল ইত্যাদি।রীতার এই আলোচনা সবাই খুব পছন্দ করেন।

রীতার পছন্দের প্রোগ্রাম-যেখানে পারফর্ম করে তার ভালো লেগেছে- আর্ট কমন্স্‌ এর “লাভ নোটস্‌” যাতে মিউসিকের দ্বারা সবাইকে সংগঠিত করা যায়। “ওয়াল্ড মিউসিক” জ্যাজ্‌ মিউসিকের সঙ্গে তারাণা ব্লেন্ড করে স্টেজে পার্ফম করেছেন যেখানে রীতা একমাত্র ইষ্টার্ন মিউসিয়ান, বাকি সবাই ওয়েষ্টার্ন মিউসিয়ান।

এছাড়াও রীতা গত চার বছর ধরে বাংলাদেশ-ক্যানাডা আসোসিয়েশন অফ ক্যালগরি র সাংস্কৃতিক সেক্রেটারী। মিউসিকের জগত ছাড়াও রীতার পারিবারিক জীবন আছে। স্বামী রঞ্জন নন্দী, পেশায় চাটার্ড আকাউটেন্ডেট এবং তার নিজের একটি ফার্ম আছে। মেয়ে রিকুল (১৪) ও ছেলে রাতুল (৭)। তারা দুজনেই স্কুলের কয়ারে গান করে, তবে ইন্টারেষ্ট স্পোর্টস্‌ এ।

এখন পর্যন্ত আমাদের পরিচয় হল সঙ্গীত শিল্পী, সুরকার, ইনস্ট্রাক্টার, সঙ্গীত গুরু, সঙ্গীত জাজ, বিজনেস কন্সালটেন্ট, স্ত্রী ও মা রীতার তার সাথে। এখন দেখলেন তো কেন আমি বলেছিলাম দশভুজা রীতা।

ইচ্ছা আর উদ্যম থাকলে একজন মানুষ জীবনে অনেক কিছু করতে পারে। তার প্রমাণ রীতা।আমার রীতার প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল।

আমার কথা, জুন ২০১৯

cropped-sahachari-pic-1

আমার কথা জুন, ২০১৯

জুন মাস চলে এল, আজকে ১৫ই জুন। এই মাসের সহচরীর পোষ্টএর জোর প্রচেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে কলকাতা-তথা পশ্চিমবঙ্গে জুনিয়ার ডাক্তারদের জোর আন্দোলন চলছে। প্রচন্ড কাজের চাপ কমানোর জন্য। মনে পড়ে অনেক বছর আগে (আমি তখন ইউনিভার্সিটি তে পড়ি) এরকম আন্দোলন হয়েছিল। এদেরকে ছাড়া হাস্পাতাল চলবে না, আর এদের কে দিয়েই বেশিরভাগ পেশেন্ট দেখার কাজ করানো হয়। তাই এদের কথা কিছুটা তো মানতেই হবে। এরা এদেশের রেসিডেন্ট ডাক্তার দের মতো। কিন্তু ন্যুনতম সন্মান টুকু যদি না দেওয়া হয়, তাহলে খুব দুঃখের কথা। শুনছি এরা জনতার কাছে, পেশেন্টদের পরিবারের কাছে মার খাচ্ছেন! কার কতটা দোষ জানিনা আর এত দূরে বসে নিক্তিতে মাপা সম্ভব নয়। তবু মনে হয় সরকারের উচিত এদের কথা শুনে সমস্যার সমাধান করা।

গতসপ্তাহে ছিল আন্তর্জাতিক সঙ্গীত দিবস। সেই উপলক্ষ্যে আমার এই মাসের সহচরী হলেন রীতা কর্মকার। ক্যানাডাবাসী রীতা একজন সঙ্গীত শিল্পী, মিউসিক নিয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়ান, গানে সুর দিয়েছেন, মিউসিক নিয়ে রিসার্চ করেন ইষ্টার্ন ও ওয়েষ্টার্ন মিউসিকের ফিউসন করার জন্য ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু নাঃ আর বলছি না! বাকিটা সহচরীতে পড়তে হবে।

পরের মাসে, জুলাই এর প্রথমে বঙ্গ সন্মেলন হচ্ছে বাল্টিমোরে। ইচ্ছা আছে এই নিয়ে কিছু লেখার আমার ব্লগে। আবার ফিরে আসব আপনাদের কাছে পরের মাসে।

সহচরী ৭ সুকন্যা ঠাকুর মুখ্যার্জী

কবিগুরুর জন্মতিথি উপলক্ষে এবার আমার সহচরী ৭ হলেন ঠাকুরবাড়ীর মেয়ে সুকন্যা ঠাকুর মুখার্জী। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর সুকন্যার প্রপিতামহ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন গগনেন্দ্রনাথের কাকা। পিতামহ কনকেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন গগনেন্দ্রনাথের ছোটছেলে। এই হল বাবার দিকের পরিচয়। মায়ের দিক থেকে চিল্ড্রেন্স লিটিল থিয়েটার (সি এল টি) বা অবনমহলের সৃষ্টিকর্তা শ্রী সমর চ্যাটার্জী হলেন তার মাতামহ।এই দাদু ছোট্ট সুকন্যার (ঝুমকু)জীবনে খুব প্রভাব ফেলেছেন। বাড়ীতে গান-বাজনার পরিবেশ ছিল। যোগসাহেব (ভি জি যোগ) খুব আসতেন। দেখেছেন দাদুর সঙ্গে সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণা্ন, জওহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধীর ছবি। কিন্তু সেগুলো কোনোদিনই ডিস্প্লেড হয় নি।দাদু ছবি টাঙিয়ে রাখায় বিশ্বাস করতেন না।বাড়িতে প্রচুর নামীদামী লোক আসতান দাদুর সুত্রে। সি এল ট তে ছোট্ট ঝুমকুর যাওয়া শুরু হয় ৩ বছর বয়স থেকে। তখন সি এল টির অবস্থান ছিল দেশপ্রিয় পার্কের একটি ভাড়া বাড়িতে।এরপর ডাঃ বিধান রায়ের ডোনেট করা জমিতে তৈরী হয় সি এল টি। এর সংক্রান্ত একটি খেলার মাঠ ছিল। কিন্তু সেটি আর খেলার মাঠ হিসেবে রাখা যায় নি। দাদু সমর চ্যাটার্জী  অনেক উদ্যমে অনেক গ্রান্ট পেয়ে অবনমহল তৈরী করেন।

ছোটবেলা থেকেই অবনমহলের এই স্রষ্টার প্রভাব পড়েছিল  ছোট্ট সুকন্যার ওপরে।স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে কোনোরকমে হোমওয়ার্ক শেষ করেই গাড়িতে চেপে বসতেন সি এল টি যাবার জন্য।ক্লাসে গিয়ে বসে নাচ দেখতে তার খুব ভালো লাগত।কিন্তু দানুর ধারণা ছোট্ট ঝুমকুর নাচ হবে না। দিদা মোটেই মানবার পাত্রী নন। একদিন দিদা দক্ষিনীতে ভর্তি করে দিলেন নাচ শেখার জন্য।সেই হল নাচের শুরু। লরেটো স্কুলে পড়েন সুকন্যা। রক্তে আছে নাচের ছন্দ!সেখানে বিখ্যাত পলিটিক্যাল লিডার সাধন গুপ্তর মেয়ে চান্দ্রেয়ী ছিল তার সঙ্গী। চান্দ্রেয়ী ভালো গান গাইতো। দুজনে মিলে একসঙ্গে প্রোগ্রাম করতেন।লরেটোর নানরা বলতেন গুপ্তা আন্ড টেগোর সিঙ্গিং ডান্সিং  টিম।স্কুলের মেয়েদের নাচ শিখিয়ে রবিঠাকুরের নৃত্যনাট্য করিয়েছেন স্কুলের ফাংসানে বহুবার।ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে লিডারশিপের একটা প্রবণতা ছিল।একবার চন্ডালিকা নৃত্যনাট্য হচ্ছে তার তত্ত্বাবধানে, তিনি করছেন “আনন্দ”-এর রোল। সবাইকে তৈরী করিয়ে নিজে যখন “আনন্দ” হয়ে স্টেজে ঢুকছেন, তখন তার  মাথায় বিনুনী আর চোখে চশমা! সবাইকে তৈরী করিয়ে নিজে রেডী হতে ভুলেই গেছেন! এইভাবেই তরতর করে স্কুলের সিনিয়ার কেম্ব্রিজ পাশ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকনমিক্স নিয়ে পড়তে ঢুকলেন। জিওলজীতে পড়ার ইচ্ছা ছিল। প্রেসিডেন্সীতে চান্স পেয়েছিলেন। কিন্তু দাদুর একদম ইচ্ছা ছিল না তার আদরের নাতনীর ফিল্ডট্রিপে যাওয়ায়।

এরমধ্যে ১৯ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে গেল। স্বামী শমীন মুখ্যার্জী, পেশায় ইঞ্জিনীয়ার।শ্বশুরবাড়ি ছিল খুব উদার।শ্বশুর ছিলেন উদার, শাশুড়ি আর্টস্কুলে পড়েছেন। স্বামী শমীনের দাদু ছিলেন শ্রী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। বিয়ের পরপর পার্ট ওয়ান পরীক্ষা। কিছুতেই দিতে চাইছিলেন না। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির নির্দেশ “পরীক্ষা তোমাকে দিতেই হবে”। অগত্যা কি আর করা! পরীক্ষা দিতে হল। পার্ট ওয়ান আর পার্ট টু পাশ করে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়তে ভর্তি হলেন নৃত্য নিয়ে। বি এ পাশ করার ক্রেডিট তিনি সম্পূর্নভাবে দেন তার শ্বশুরবাড়ীকে।ঝুমকু বারংবার স্বীকার করেন তার শ্বশুরবাড়ীর উদারতার কথা। এম এ পড়ার সময় রবীন্দ্রভারতীতে ক্লাস করে গুরুজীর কাছে নাচ শিখে প্রত্যেকদিন রাত ১২টা থেকে দুটো ওবধি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে স্বামীর সঙ্গে বাড়ি ফিরতেন। বাড়ী থাকতেন সাকুল্যে প্রায় ৬ ঘন্টা।

ইতিমধ্যে বেশ কিছু ধরনের ক্ল্যাসিক্যাল ড্যান্সে ট্রেনিং নেওয়া হয়ে গেছে। তবে তার বিশেষ পারদর্শিতা হল ওড়িসি নাচে। পদ্মবিভূষণ গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র তার ওড়িসি নাচের গুরু। এছাড়াও শ্রী বালাকৃষ্ণ মেনন এবং শ্রী চিত্রেশ দাসের কাছে নাচ শিখেছেন। এম এ পাস করলেন গোল্ড মেডেল নিয়ে। এম এ পাশ করে পি এইচ ডি করার ডাক পেলেন সঙ্গীত নাটক একাডেমীতে শ্রীমতী কমলা দেবী চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। বলেছিলেন সোম থেকে শুক্র এখানে থেকে পি এইচ ডির কাজ করবে, তারপর শনি-রবিবার বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু ততদিনে এদেশে আসার ডাক পেয়ে গেছেন স্বামী। শমীন পড়তে এলেন এম আই টি তে, বোষ্টনে।ঝুমকু আসিন্টেটসিপ পেয়েছিলেন স্ট্যানফোর্ড এ। কিন্তু যান নি স্বামীকে ছেড়ে। এই নিয়ে তার কোনো দুঃখ নেই। স্বামী কোনোদিন তার কোনো কাজে বাঁধা দেন নি।

এরপর পাড়ি আমেরিকায়। সময়টা ১৯৮৪ সাল।প্রথমে আভন প্রোডাক্ট সেল করতেন। এরপর কেম্ব্রিজে একজন প্রফেসারের কাছে ডাটা প্রসেসিং এর কাজ করেছেন কিছুদিন।এরমধ্যে হারভার্ড এ সামার স্কুলে কোরিওগ্রাফি নিয়ে কাজ শিখলেন কিছুদিন।

বছরখানেক বাদে স্বামীর সাথে ওয়াসিংটন ডিসিতে চলে এলেন। অনেক নাচ করেছেন লোকাল অনুষ্ঠানে। একবার সংস্কৃতিতে পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর গানের পর নাচ করেন। ১৯৮৭ সালে মেয়ে হল। কিন্তু নাচ থেমে থাকেনি। যে যখনি ডাকত, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করতেন। মেয়ে একটু বড় হলে নাচ শেখাতে শুরু করলেন। সেই সময়ে কমুউনিটির বাচ্ছাদের নিয়ে দাদুর তৈরী সি এল টির “অবনপটুয়া” করলেন।সেই থেকে স্কুল তৈরী করার কথা মাথায় এল।প্রথমে তিনটে বাচ্ছা নিয়ে স্কুল আড়ম্ভ হল।১৯৯৩ সালে তার স্কুল ময়ূর এর শুরু। এখন বড় স্কুল হয়েছে। ১৯৯৩-২০১৯, প্রায় ২৬ বছর ধরে স্কুল চালিয়ে যাচ্ছেন ঠাকুর পরিবারের এই মেয়ে।

বেশীরভাগ চ্যারিটি প্রোগ্রাম করেন। অর্থ যা ওঠে, ফুড ব্যাংকে দিয়ে দেন।ময়ূর এর মধ্যে কলকাতায় গিয়ে চ্যারিটি প্রোগ্রাম করে প্রায় ১ লাখ টাকা সি এল টি তে ডোনেট করা হয়েছে। আরেকটি কথা লেখা খুব জরুরী। ময়ূরের ছাত্র-ছাত্রীদের নাচের পোষাক- যা মঞ্চে নাচার জন্য খুবই দরকারী।ড্রেস এর ফ্যাব্রিক, ডিসাইন, রঙ পছন্দ করা, বানানো এবং দেশ থেকে নিয়ে আসা- সবই তিনি করেন।

অনেক ছাত্র-ছাত্রী তৈরী করেছেন। স্বামী খুব চাকরীসুত্রে ট্যুরে যান। তাই তিনি নিজে বাড়িতে নাচের স্কুল নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। সুকন্যার মতে নিজে কাজ করে খুশী থাকাই ভালো। ১০০ জনের মধ্যে ১০ জন সত্যিকারের নাচের শিল্পী তৈরী হয়। তাই তিনি এই ভবিষ্যত প্রজন্মকে নিয়ে নাচের শিল্পী তৈরী করার প্রচেষ্টায় মেতেছেন। মেয়ে মিশকাকে নিজে হাতে তৈরী করেছেন। সেও ভালো নাচে। ময়ূরের হয়ে প্রোগ্রাম করে।

সুকন্যা মানুষ খুব ভালোবাসেন। ভালো লাগে আড্ডা দিতে। বেড়ানো আর নাচ এই তার দুই প্যাশন। প্রচুর দেশ ঘুরেছেন। সবচেয়ে ভালো লেগেছে জর্ডন। তবে চয়েস করতে বললে, তিনি নাচকেই নেবেন। তার নিজের কথায়- “নাচ যখন করবে শুধু যদি আনন্দ নিয়ে করো তবেই ভালো লাগবে। যদি আনন্দ না পাও তবে ফল ভালো হবে না”।

মেয়ে মিশকা, ছেলে সাগ্নিক দুজনেই চাকরী করে। এখন বাড়িতে শুধুই স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু বাড়ি মোটেই খালি নয়। রোজই চলে ময়ূরের নাচের ক্লাস। এই নিয়েই বেশ আছেন সুকন্যা। আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল সুকন্যার জন্য।

 

আমার কথা মে, ২০১৯

cropped-sahachari-pic-1

আমার কথা মে’ ২০১৯

২৫ শে  বৈশাখ এল আবার চলেও গেল। আমার লেখা পোষ্ট করতে এবার একটু বেশী দেরী হয়ে গেল।আমাদের জীবনে রবিঠাকুর ওতপ্রত ভাবে জড়িয়ে আছেন। জীবনে এমন মুহূর্ত আসেনা যাতে আমরা তাঁকে স্মরণ করিনা!  কি আশ্চর্য তাই না! আমাদের সবরকম মোমেন্টের গান লিখে গিয়েছেন এই অসাধারণ মানুষটি।

জীবন এখন এক গভীর দিঘির জলের মতো শান্ত, জলে পরিপূর্ণ। জলের ঢেউ অনেক স্থিমিত। জীবনের এই পর্যায়ে এসে যখনই কবিগুরুর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়, ক্রমশঃই তাঁর কথার মধ্যে ডুবে যাই। কথার গভীরত্ব অনুধাবন করতে সময় লেগে যায়। ঠিক যেন গীতার শ্লোকের মতো! প্রতিবারই যখন পড়ি, প্রতিটি শ্লোকের মানের গভীরতায় মগ্ন হয়ে যাই। ভাবি কী ভীষণ গভীরতা আর আধ্যাত্মিক ভাবনা নিয়ে গান/কবিতাগুলি লিখেছিলেন আমাদের সেই ভালোবাসার মানুষটি।

এখন এই প্রবাসে, দিঘির শান্ত, গভীর টলটলে জলে ভাবি আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম, যারা এদেশে জন্মেছে, তারা কি পারবে এর গভীর রহস্য-ভাবনা অনুধাবন করতে আর এর চর্চা টেনে নিয়ে যেতে? নাকি, আমাদের সঙ্গেই শেষ হয়ে যাবে! যতদিন বেঁচে আছি এই ভাবনা ভেবে যাব আর চেষ্টা চালিয়ে যাব যাতে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে এই অসাধারণ সৃষ্টি যেন এদেশে হারিয়ে না যায়।

এমাসের সহচরী হলেন সুকন্যা ঠাকুর মুখ্যার্জী। ঠাকুরবাড়ির মেয়ে। শুধু তাই নয়, জীবনে প্রতিটি মুহূর্তে কবিগুরুর প্রভাব পড়েছে। প্রপিতামহ রবিঠাকুরের ভাইপো গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। মাতামহ হলেন বিখ্যাত অবনমহল অর্থাৎ সি এল টি র প্রতিষ্ঠাতা শ্রী সমর চ্যাটার্জী। আশা রাখি সুকন্যাদির কথা পড়তে আপনাদের ভালো লাগবে।

সুকন্যাদির কথা লিখতে গিয়ে আমার খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। বাড়ির কাছেই ছিল সি এল টি। প্রায়ই ছোটদের প্রোগ্রাম দেখতে যেতাম। আমার ছোটবোন সেই তিন-চার বছর থেকে নাচ শিখেছে ওখানে। অনেক প্রোগ্রাম দেখেছি। তাছাড়া ওকে ক্লাসে পৌছে দেওয়া, নিয়ে আসা- এসবের জন্য সি এল টি তে যাতায়াত ছিল। সমরদাকে দেখেছি। অনেক বছর বাদে আবার সুকন্যাদির জন্য ময়ূরের প্রোগ্রামে

“আন্ডার দা সি”  আর “জিজো”দেখার সৌভাগ্য হল। আমার বোন ছোটবেলায় ড্যান্সড্রামা দুটিতে পার্ট নিয়েছিল সি এল টি তে। আর আমি আবার দেখলাম ওর মেয়ে আর ছেলেকে নাচতে দীর্ঘদিন বাদে ওই একই ড্যান্সড্রামায়। অসম্ভব ভালো লেগেছিল।

খুচখাচ রান্না/এপ্রিল, ২০১৯

IMG_3087

ডিসঃ সিম-ধনেপাতাSahachari 2

রেসিপিঃ মীরা চ্যাটার্জী

উপকরণঃ

১) ১/২ পাউন্ড সিম

২) ১ আঁটি ধনেপাতা

৩)১ চা চামচ কালোজিরা

৪) ১ টি কাঁচালংকা

৫) ২ টেবিল চামচ সর্ষের তেল

 

পদ্ধতীঃ

  • স্টোভে প্যান বসিয়ে দেড় চামচ(টেবিল) সর্ষের তেল দাও। তেল গরম হয়ে গেলে কালো জিরে দিতে হবে।
  • কালো জিরে ফুটতে শুরু করলে, কাঁচা লংকা দিতে হবে।
  • এবার সিমগুলি দিয়ে তেলে একটু নাড়াচাড়া করে ঢাকা দিয়ে দিতে হবে।
  • ৭-১০ মিনিট পর ঢাকা সরিয়ে (দেখে নেবে সিম সিদ্ধ হয়েছে কিনা) পরিমান মতো নুন আর চিনি দিতে হবে।
  • আবার ঢাকা দিয়ে দুই মিনিট রান্না করতে হবে।
  • এবার স্টোভ নিভিয়ে পাত্রে ঢেলে নিয়ে আধ চামচ সর্ষের তেল দিতে হবে।
  •   গরম ভাতের সঙ্গে খুব ভালো লাগে

 

 

 

 

সহচরী ৬ অনুমিতা রয়

Sahachari 4

সহচরী ৬ অনুমিতা রয়

 

আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ

তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান

বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান……।

এবারের সহচরী ৬ অনুমিতা রয়। আমার বন্ধু পিয়ার কাছে অনুমিতার সন্ধান পাই। একজন ক্রিয়েটিভ মহিলা, গৃহিনী, মা এবং দীর্ঘদিন কলম্বাসবাসী। অনুমিতার সাথে কথা বলার পর থেকেই আমার মনের মধ্যে কবিগুরুর গানের কথা গুলি খালি ঘুরে ফিরে আসছে …… বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান……। কেন আসছে জানতে হলে কিন্তু পড়তে হবে এই লেখা! কিন্তু তার আগে আমি এই লেখাটি আগামী “মাদার্স ডে” উপলক্ষে উৎসর্গ করলাম।

অনুমিতার জন্ম পুনায়। বাবার চাকরীর সুবাদে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় কাটিয়েছেন ছোটবেলায়। চেন্নাইতে তৃতীয় শ্রেণী ওবধি পড়ে ভেনিজুয়েলাতে ষষ্ঠ শ্রেনী শেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ফিরলেন। বাবা-মা সংসার গুটিয়ে ফিরে এলেন বাটানগরের পৈতৃক বাড়িতে।সাবেকী আমলের বাড়ি, যৌথ পরিবার। ঠাকুর্দা, ঠাকুমা, দুই জেঠু, জেঠিমা, জাঠতুতো দিদিরা। তাদের দুই বোন কে নিয়ে ছয় বোন। জীবনের নতুন পর্ব শুরু হল। বাবা ভর্তি করে দিলেন নিউ আলিপুরের একটি প্রাইভেট স্কুলে। সেন্ট জোসেফ এন্ড মেরীস্‌ এ শুরু হল নতুন স্কুলজীবন। এই সময়ে তাদের পারিবারিক রীতিনীতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছিল। দুই বোন স্কুলে যায় স্কার্ট-ব্লাউস পরে আর বাড়িতে দিদিরা স্কুলে যায় শাড়ি পরে। কিন্তু বাবার বিশ্বাস ছিল তাঁর মেয়েরা সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিতে পারবে। হলও তাই।তারা খুব সুন্দর সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিয়ে দিব্যি বড় হয়ে উঠতে লাগলেন।বাংলার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তৃতীয় ভাষা হিসেবে।বাড়িতে বাংলার চর্চা ছিল, ছিল নাচ-গানের অবকাশ। এই ভাবেই আত্মীয়স্বজন, ঠাকুর্দা-ঠাকুমা, দিদিদের সঙ্গে সঙ্গে অনুমিতার বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়। বাবা ছিলেন মুক্তমনের মানুষ, ছোটবেলায় ললিত কলা একাডেমীতে ট্রেনিং নিয়েছিলেন। মা তাদের একই সঙ্গে স্বাধীনতা আর ডিসিপ্লিনের শিক্ষা দিয়েছিলেন।

স্কুলের গন্ডী শেষ হলে বাবা চাকরী নিয়ে চলে যান মুম্বাই তে। অনুমিতা ততদিনে যোগমায়া দেবী কলেজে  বিএ পড়া শুরু করেছেন। কলকাতায় থেকে গেলেন। বিএ পাশ করে মুম্বাই চলে এলেন বাবা-মায়ের কাছে। সেক্রেটারিয়াল কোর্স নিয়ে বামার লরি তে কিছুদিন কাজ করলেন। বিয়ে হয়ে গেল। স্বামী প্রদীপ আই টি তে কাজ করেন। ছোট্ট পরিবার। শ্বশুর, শ্বাশুরী আর ছোট এক ননদ। শ্বাশুরীর একান্ত ইচ্ছায়মাষ্টার্স করতে শুরু করেন ইতিহাসে। শ্বাশুরী খালি বলতেন “পড়াশুনা ছেড়ো না। নিজের জন্য যদি এইটুকু করতে না পারো তাহলে আর কিছুই কোরো না”। এদিকে স্বামীর চাকরী নরিম্যান পয়েন্টে, আর তার কাজ ভাসীতে- শহরের দুই প্রান্তে। সপ্তাহের পাঁচদিন চাকরী আর যাতায়াতে কেটে যেত। শনিবারে স্বামীস্ত্রী বেড়িয়ে পড়তেন । অনুমিতা প্রেগন্যান্ট হলেন। চাকরী ছেড়ে দিয়ে শুধুই পড়াশুনায় মনোনিবেশ করলেন।ফাইনাল পরীক্ষায় বসলেন, তার পরের মাসেই বাচ্ছা হবার দিন।শ্বাশুরী রোজ খাবার আর ডাবের জল নিয়ে যেতেন পরীক্ষার হলে। হলের পিছনে সিট পড়ায় রাগারাগি করেছিলেন এক্সামিনারের ওপরে।মাষ্টার্স হয়ে গেল। অনুমিতার মতে তার এম এ পাশ করাটা তার শ্বাশুরীর গিফ্‌ট, উনি না থাকলে হতো না। বড়ছেলে দীপক এলো পৃথিবীতে।সবাই খুব খুশী।ছেলেও বাড়ির সবার আদরে বড় হতে লাগল।এরপরেই ১৯৯৯ তে প্রদীপ চলে এলেন চাকরী নিয়ে এদেশে। আড়াই বছরেরে ছেলে কোলে নিয়ে অনুমিতা চলে এলেন।

অসীম কালের যে হিল্লোলে জোয়ার ভাঁটায় ভুবন দোলে

নাড়ীতে মোর রক্ত ধারায় লেগেছে তার টান

বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।

এদেশে জীবন শুরু হল। বন্ধুবান্ধব, নতুন সংসার, ছেলে নিয়ে দিন কাটতে লাগল।কিন্তু এর মধ্যেই তার মায়ের মন বলতে লাগল তার ছেলে একটু অন্যরকম। ফিজিক্যাল গ্রোথ, মাইলওলস্টোন সব ঠিক, কিন্তু সোসাল বিহেভিয়ের এ একটু তফাত্‌ লক্ষ করলেন।ছেলের ডাক্তার তাকে টেষ্ট না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌছতে বারণ করলেন। অবশেষে মায়ের ইচ্ছেয় আরো টেষ্ট করে জানা গেল তার ছেলের Asperger Syndrome (Autism Spectrum Disorder)। ডাক্তারের কথা শুনে প্রথমেই তিনি ভাবলেন “আমি কেন?আমার কেন এরকম হল”। এই রকমের ভাবনা মা-বাবার মনে আসে এই ধরনের ক্ষেত্রে। নিজেকে দোষ দেওয়া, অনুশোচনা হওয়া, মরমে মরে থাকা। তিনিও গেছেন এর মধ্যে দিয়ে। কিন্তু হতাশ হয়ে থাকলে তো চলবে না! মায়ের মন নতুন দৃঢ়তার সংগে এই বিষয়টা নিয়ে জানার জন্য আগ্রহিত হল। তিনি তার মনপ্রাণ ঢেলে দিলেন এর পিছনে। এই বিষয়ে জানা যে তার ছেলেকে জানা! তার মতে “Unlearn to learn again”। প্রত্যেক মাইলষ্টোন যেন সিঁড়ির এক ধাপ উঠে আবার পাঁচধাপ নেমে যাবার মতো।সবকিছু আবার তিনি নতুন করে ছেলের সঙ্গে সঙ্গে শিখলেন।

২০০৩ এ অনুমিতা আবার মা হলেন। ডাক্তার বলেছিলেন দ্বিতীয় সন্তানও অটিস্টিক হতে পারে, কারণ এর মধ্যে জেনেটিক ফ্যাক্টর কাজ করে।যথাসময়ে ছেলে হল।যখন ছোটছেলে অনুজও অটিস্টিক জানলেন, খুবই হতাশ হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তো মা, হতাশ হলে চলবে কেন। তাই নিজেকে আবার ছেলের সঙ্গে সঙ্গে এডুকেট করতে লাগলেন। এখানে অনুমিতার ভাষায় দুই ছেলে দুরকম। কাজেই হ্যান্ডলিং ও দুভাবে। এই সময়ে তারা দুজনেই সামাজিক জীবন থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন বেশ কিছু বছর।

দুইছেলেই Special Olympics এ অংশগ্রহণ করেছে। Special Olympics এ High Functional Autistic  ছেলেমেয়েরা অংশগ্রহণ করতে পারে। তার ছেলেরা এখানে অনেক মেডেল পেয়েছে। এখানে অন্যান্য প্রতিবন্দী বাচ্ছাদের দেখে তার প্রথম মনে হল “আমি Fraud! আমার ছেলেদের তো কোনো প্রবলেম নেই”। ছেলের এলিমেন্টারি স্কুলে ভলান্টিয়ার হয়ে কাজ করতে শুরু করলেন। বাচ্ছাদের সঙ্গে কাজ করে অনেক কিছু শেখেন তাদের কাছ থেকে।

ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি বনের পথে যেতে

ফুলের গন্ধে চমক লেগে উঠেছে মন মেতে

ছড়িয়ে আছে আনন্দেরই দান

বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।

 

দুই ছেলে বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে, তাদেরকে জানতে জানতে নিজের কেরিয়ার গড়ার আর সু্যোগ পান নি।কিছুদিন Job Placement Agency তে কাজ করেছেন। বড়জন কলেজে যাবার পর আবার একটু অবকাশ পেলেন নিজের জন্য কিছু করার। ট্রেনিং নিয়ে তিনি এখন Court Certified Legal Interpreter for Bengali & Hindi. State Government এর হয়ে কাজ করেন।  মাঝে মাঝে ওহাইওর অন্যান্য জায়গায় যেতে হয় কাজের জন্য।

অনুমিতার বড় ছেলে দীপক আর ছোট ছেলে অনুজ পুরো আলাদা ব্যাক্তিত্য। বড়জন অংক ভালোবাসে। মায়ের ভাষায়  “He is the geeky kind. He has a golden heart, always a giver”. এখন পেশায় এঞ্জিনীয়ার, জীবনে প্রতিষ্ঠিত, চাকরী করছে। ছোটজন অনুজের বড়সড় চেহারা।সে এখন Sophomore, মায়ের ভাষায় “He is a typical American kid”। অনেক বেশী কষ্ট পান যখন ছেলের “Down moments” গুলো আসে। মাঝে মাঝে মনে হয় তার মনে সেই জোর বা শক্তি নেই এর সাথে deal করার। যখন কোনো কারণে সন্তান কষ্ট পায়, মায়ের কিছুই করার থাকে না।তিনি তার দুই ছেলেদের বারবার বলেছেন “আমি তোমাদের Road Signs, left side or right side directions দেব, কিন্তু হাঁটতে তোমাদের হবে”। “I don’t want to be your crutch, you have to live separately”. ছোটছেলেকে যোগব্যায়াম করা শিখিয়েছেন। নিজেও ওর সঙ্গে করেন।ছোটছেলের body strength বেশী, রাগও বেশী। রাগ কমানোর জন্য প্রাণায়াম অভ্যেস করিয়েছেন।কি ধরনের খাবার খেলে ছেলের উপকার হবে, তার ওপরও মায়ের রিসার্চ চলে।দুই ভাই ফ্যামিলীকে ভালোবাসে। দেশে যেতে ভালোবাসে।

গত কয়েক বছর ধরে অনুমিতা শ্রী অরিন্দম রায়ের সাথে “Different Truths” নামে একটি Web Site চালান। এই Web Site এর planning, editing, photo selection, post upload- এই সব নানা কাজ করে খুব আনন্দ পান। এখানে food, travel, advocacy -র ওপর নানারকমের লেখা থাকে। CRY-এর সাথে এদের connection আছে। এছাড়াও তিনি নিজে Special Needs ওপর লিখেছেন “Confession of Special Needs Mother”. দুবার সেমিনার দিয়েছেন Special Needs teachers’ workshop-এ। প্রথমবার Special Needs বাচ্ছাদের ডায়েট ও দ্বিতীয়বার Brain Balance এর ওপরে।

এবার দেখলেন তো কেন লিখেছিলাম যে কবিগুরুর গান মনের মধ্যে গুঞ্জন তুলেছে। অনুমিতার সঙ্গে কথা বলার পর মনে হয়েছিল কি অসাধারণ শক্তি নিয়ে এক মা তার দুই ছেলেকে তৈরী করেছেন ও করছেন যাতে তারা সুন্দর মানুষ হয়ে উঠতে পারে।

কান পেতেছি চোখ মেলেছি ধরার বুকে, প্রাণ ঢেলেছি

জানার মাঝে অজানারে করেছি সন্ধান

বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।

আমার কথা এপ্রিল ২০১৯

 

cropped-sahachari-pic-1

তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে

বৎসরের আবর্জনা দুর হয়ে যাক

     এসো হে বৈশাখ এসো এসো।

ফিরে এলাম সহচরীর ব্লগ পোষ্ট নিয়ে। এপ্রিল মাস মানেই পয়লা বৈশাখ। দেশে গরম পড়ে গেলেও এদেশে কিন্তু একটু শীত শীত ভাব আছে। ভোরবেলা আর সন্ধ্যাবেলা গায়ে হালকা কিছু দিয়ে বেরোতে হয়।বসন্তের প্রথম ফুল টিউলিপ, ড্যাফোডিল ফুটতে শুরু করেছে। গাছে গাছে চেরী ফুলের সম্ভার।গত সপ্তাহের শনি-রবিবার ওয়েশিংটন ডিসিতে চেরী ব্লসম ফেষ্টিভ্যাল হয়ে গেল।রাশি রাশি ফুটে চেরীফুলের মধ্যে দিয়ে নীল আকাশ দেখা একটা অভূতপূর্ব অনুভুতি! না দেখলে বর্ণনা করা যাবে না।

পয়লা বৈশাখ- নতুন বাংলা বছরের শুরু। দেশে (পশ্চিমবঙ্গে) দোকানে দোকানে নতুন খাতা খোলা হয়।ছোটবেলা নতুন জামা পরে বাবা-মা কে প্রণাম করে বিকেলে রবিজেঠুর বাড়িতে যেতাম সবাই মিলে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানা। ওদের বড় বিজনেস ছিল আর পয়লা বৈশাখ হতো খুব জাঁকজমক করে। দিনগুলো খুব মনে পড়ে। এখন আর নতুন পোষাক পরা নেই। বন্ধুবান্ধবদের শুভেচ্ছা জানাতে আর তাদের শুভেচ্ছা পেতে খুব ভালো লাগে।

গতমাসে আমি আমার এক বন্ধুকে হারিয়েছি। ডাঃ ডেনিস ও’কিফ, অস্ট্রালিয়ান মেয়ে, এদেশে সেটল্‌ করেছিল। আলাপ এদেশে। আমরা একসঙ্গে কিছুদিন কাজ করেছিলাম। প্রায় তিনবছর ধরে অনেক লড়াই করে অবশেষে শ্রান্ত হয়ে ডেনিস বিদায় নিল বড্ড অল্প বয়সে! অনেক কিছু করেছিল জীবনে। থাকলে আরো অনেক কিছু করতে পারতো। কিন্তু এগ্রেসিভ ব্রেষ্ট ক্যান্সার তাকে হারিয়ে দিল! আর ও ঠিক চলে যাবার পর আমার অর্কিড গাছে এই বছরের প্রথম ফুল ফুটল। গাছটা ডেনিসের দেওয়া।   গত আটবছর ধরে ফুল ফুটিয়ে যাচ্ছে গাছটা। এবার মনে হল বলছে …… আমি আছি তোমাদের সকলের সঙ্গে……। আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা রইল ডেনিসের জন্য। ওর আত্মার শান্তি কামনা করি।ওঁ শান্তি শান্তি শান্তিহিঃ।

তবু প্রাণ নিত্যধারা হাসে সূর্য চন্দ্র তারা

বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্ররাগে

আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহদহন লাগে

তবুও শান্তি তবু আনন্দ তবু অনন্ত জাগে।