সহচরী ১৪ প্রথম ভাগ/ নিদ্রিতা মিত্র সিনহা

Sahachari 4

সহচরী ১৪/ নিদ্রিতা মিত্র সিনহা

Nidrita image 5

ছবি ১) নিদ্রিতা মিত্র সিনহা

শুরু করছি একটি সত্যি ঘটনা দিয়ে।ঘটনাটি ঘটেছিল হাজারীবাগের একটি স্কুলের ক্লাসরুমে। একটি ঘরে বেশ কিছু  মেয়ে স্কলারশিপের পরীক্ষায় বসেছে। সামনে একজন ভদ্রলোক গার্ড দিচ্ছেন। একটি মেয়ে পরীক্ষা দিতে দিতে লক্ষ্য করল যে মাঝে মাঝেই  একটি লোক এসে একটি মেয়ের সামনে এসে ফিস্‌ফিস্‌ করছেন। আসলে স্কুল ইন্সপেক্টর বাবা তার মেয়েকে  প্রশ্নের উত্তর বলে দেবার জন্য একজন লোক নিযুক্ত করেছেন এবং সে এসে মেয়েটিকে প্রশ্নের উত্তর যোগান দিচ্ছে। এমনই দূর্নীতি যে গার্ড সব দেখেও কিছু বলছে না। বেশ কয়েকবার দেখার পর যে মেয়েটি লক্ষ্য করেছিল সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল “আমার পরীক্ষা দিতে অসুবিধা হচ্ছে, আপনারা বাইরে গিয়ে কথা বলুন”। বলেই সে আবার লিখতে শুরু করল। দেখা গেল এতে কাজ হল, কারণ ভদ্রলোকের ওই ঘরে আসাটা বন্ধ হল। পরীক্ষাটির দুটি ভাগ। দ্বিতীয়ভাগে আবার মেয়েটি পরীক্ষায় বসেছে। হঠাৎ অন্য মেয়েটির বাবা তার দলবল নিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন “বাঙ্গালী লেড়কী কৌন হ্যায়?” মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে একটুও ভয় না পেয়ে উত্তর দিল “I am the person who protested it”। বলেই আবার লিখতে শুরু করলে। পরীক্ষা হয়ে গেল। খাতা জমা দিয়ে ক্লাসের বাইরে বেরিয়েছে এমন সময়ে গার্ড তাকে ডেকে বললেন “নাম লিখতে ভুলে গেছ, মনে হচ্ছে তোমারি খাতা হবে”। মেয়েটি এত সব ঘটনার মধ্যে পরীক্ষার খাতায় নিজের নাম লিখতে ভুলে গেছে। গার্ড ভদ্রলোকটি এবার বললেন “বেটি তুম্‌ যো আজ কি- বহুত আগে যাওগে”। আসলে স্কুল ইন্সপেক্টর বাবা তার মেয়েকে পরীক্ষার উত্তর বলে দিচ্ছিল। এরকমই দুর্নীতি।

সেদিনের সেই কিশোরী মেয়েটির হলেন নিদ্রিতা মিত্র সিনহা, পেশায় ইঞ্জিনীয়ার, নেশা গান। দীর্ঘদিনের পিট্‌সবার্গ বাসিনী, সদা হাস্যময়ী, মিষ্টি-স্বভাবের এই দিদিটি আমার এবারের সহচরী।

Nidrita image 1                                   ছবি ২) বাবা-মায়ের সঙ্গে তিন বোন

নিদ্রিতার জন্ম হাজারীবাগে, বড় হয়েছেন গিরিডিতে। বাবার পরিবার ছিল পাটনায়। ঠাকুর্দা ছিলেন পাটনা সায়েন্স কলেজের ফিজিক্সের প্রফেসর। বাবা পাটনা থেকে মাষ্টার্স করে গিরিডি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন ফিজিক্স ডিপার্ট্মেন্টের অধ্যক্ষ (Head of the Department) হয়ে। নিদ্রিতার মা ছিলেন কৃষ্ণনগরের মেয়ে। খুব ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে দাদা-দিদিদের কাছে মানুষ। বিয়ের পর স্বামীর কর্মসুত্রে প্রথমে হাজারীবাগ ও পরে গিরিডিতে আসেন। নিদ্রিতারা তিন বোন, তিনি মধ্যম সন্তান। ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছে পড়াশুনা করেছেন। মা ছিলেন দৃঢ় মানসিকতার মানুষ এবং মেয়েদের মানুষ করার ব্যাপারে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবার সহযোগিতা ছিল।বাংলা সাহিত্যের ভক্ত মায়ের উৎসাহে বাড়িতে দেশ ও শুকতারা পত্রিকা আসত। এছাড়াও মা কবিতা আবৃতি, গান-বাজনা খুব ভালোবাসতেন। মা নানাভাবে তিন মেয়েদের বাংলা সংস্কৃতিতে উদ্বুদ্ধ করতেন। ছোটবেলায় তারা হিন্দুস্থানী ক্ল্যাসিক্যাল সঙ্গীত শুরু করলেন। এরসাথে ছিল মায়ের সঙ্গে বাংলার চর্চা। মা তাদের জন্মদিনে বাংলা বই উপহার দিতেন। মায়ের কাছে আবৃতি শিখে কবিতা আবৃতি করেছেন বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়। রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিক্ষা শুরু মায়ের কাছে। ক্ল্যাসিক্যালে প্রথম গুরুজী ছিলেন শ্রী কিষনলালজী, পরবর্তীকালে শ্রী রাম অবতার পন্ডিত ও শ্রী বীরেন্দর সিং এর কাছে শেখেন।

এবার নিদ্রিতার পড়াশুনা নিয়ে কিছু বলি।গিরিডি স্কুলে পড়েছেন নিদ্রিতা। স্কুলে বাংলা মিডিয়াম ও হিন্দী মিডিয়াম ছিল। তিনি পড়েছেন বাংলা মিডিয়ামে। স্কুলে প্রতিটি ক্লাস পাশ করেছেন প্রথম হয়ে, কোনোদিন দ্বিতীয় হন নি। বিহার বোর্ডের ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়ে। খবরের কাগজে বেরোলো তার নাম। তখন তিনি মামাবাড়ি বেড়াতে এসেছেন। বাড়ি থেকে টেলিগ্রাম পেয়ে গিরিডি ফিরলেন। এরপর পাটনা গিয়ে দুটি গোল্ড মেডেল নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। পাটনা রেডিওস্টেশনে তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে ইন্টারভিউ নিল। তখন গিরিডিতে নিদ্রিতা কিশোরী সেলিব্রিটি।

এরপর পাড়ি রাঁচির সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে- এখানে ১১-১২ ক্লাস পড়বেন।কোনোদিন বাড়ির বাইরে থাকেন নি। কলেজের সামনের উরসুলিন কনভেন্ট-এ কোনো জায়গা নেই। অগত্যা একটু দূরে হোলি ক্রস কনভেন্ট-এ গিয়ে উঠলেন ষোড়শী নিদ্রিতা। এখানে অনেক আদিবাসী সাঁওতালি মেয়েদের বন্ধুত্ব হল। কয়েকদিন বাদে জায়গা পেয়ে উরসুলিন কনভেন্টে চলে যান। হোষ্টেলে তার ঘরে দুজন বাঙালি রুমমেট পেলেন। পড়াশুনা চলতে লাগলো। ১২ ক্লাসের শেষে মা-বাবার ইচ্ছায় পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরিক্ষা দিলেন কলকাতা গিয়ে। এদিকে আই-এস-সির (১২ ক্লাসের পরীক্ষা) রেসাল্ট বেরোলে দেখা গেল এই মেধাবী মেয়েটি গোটা ইউনিভার্সিটিতে তিনি ষষ্ঠ স্থান পেয়েছেন। ইতিমধ্যে জয়েন্ট এন্ট্রান্সের রেজাল্ট বেরোলো, তার নাম উঠল লিস্টে।কলকাতা গিয়ে ইন্টারভিউ দিয়ে এলেন। এবার যাত্রা শিবপুরের বি ই কলেজের (B.E College) ইলেক্ট্রনিক্স আন্ড টেলিকমুনিকেসন্স (Electronics and Telecommunications) ডিপার্টমেন্টে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শুরু হল। তাদের ডিপার্টমেন্টে ২৮জন ছেলে, দুটি মেয়ে। গোটা ব্যাচে মাত্র ১০ জন মেয়ে।

দ্বিতীয় বছরে আবার গান শিখতে শুরু করলেন স্বপ্না ঘোষালের কাছে। তিনি তার সহপাঠী ঝুমের সঙ্গে যেতেন স্বপ্নাদির বাড়ি। ঝুমের বাবা ছিলেন বি ই কলেজের অধ্যাপক। ক্যাম্পাসে ঝুমের বাড়িতে নিদ্রিতা তার গিরিডিতে ছেড়ে আসা বাড়িএ স্বাদ পেয়েছেন।

এখানেও নিদ্রিতা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। তার নেতৃত্বে মেয়েদের হোষ্টেলে জলের সমস্যার সমাধান হয়েছিল। অবশ্য এর জন্য একদিন গোটা কলেজে ক্লাস বন্ধ ছিল। অবশেষে PWD থেকে ইঞ্জিনীয়ার এনে আলাদা জলের লাইন এনে জলের প্রবলেম দুর হয়েছিল।

এসবের সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রচুর অনুষ্ঠান করেছেন পড়াশুনার সঙ্গে সঙ্গে। কলেজের ফেষ্ট -এ আবৃত্তি করে প্রাইজ পেয়েছেন। অনেক গান গেয়েছেন কলেজের অনুষ্ঠানে। মেয়েদের জিমের লিডার ছিলেন দুবছর।

আস্তে আস্তে চারটে বছর কেটে গেল। তিনি হায়েদ্রাবাদে (HAL)চাকরী পেলেন। তার আগেই ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিউট অফ সায়েন্সে মাষ্টার্স-এ ইন্টারভিউর ডাক পেলেন। ঠিক হল মায়ের সাথে হায়েদ্রাবাদে যাবেন চাকরীতে যোগ দিতে, পথে ব্যাঙ্গালোরে থেমে ইন্টারভিউ দেবেন। ভালোই ইন্টারভিউ হল। মার সঙ্গে হায়েদ্রাবাদ গেলেন। পৌছে খবর পেলেন যে তিনি সিলেক্টেড হয়েছেন মাষ্টার্স প্রোগ্রামে।এই কোর্সটিতে রিসার্চ করতে হবে দুবছরের জন্য পড়ার সাথে সাথে। একাই চলে গেলেন  ব্যাঙ্গালোরে। ই সি ই (E.C.E) ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপকের (প্রফেসর এন এন বিশ্বাস) সঙ্গে দেখা করলেন, কাজ সম্বন্ধে জানলেন। কথা বলে সিদ্ধান্ত নিলেন এখানেই আসবেন। হায়েদ্রাবাদে গিয়ে কাজে ইস্তফা দিয়ে ব্যাঙ্গালোরে ফিরে এলেন।

Image 7

ছবি ৩) গান ও তালের যুগলবন্দী

ব্যাঙ্গালোরে জীবনের আরেক অধ্যায় শুরু হল। এখানে ই সি ই ডিপার্টমেন্ট-এ রিসার্চ শুরু হল। এখানেই নিদ্রিতা মিত্রের সঙ্গে আলাপ তার পরবর্তী জীবনসঙ্গী আশীষ সিনহার। আশীষ মেটালার্জী (Metallergy)তে মাষ্টার্স করতে এসেছেন খুব ভালো GATE -এ রেজাল্ট করে। তাদের একটা মিউজিক গোষ্ঠী আছে, ছাত্র-ছাত্রীরা একসঙ্গে গান-বাজনা করেন। একজন বন্ধু আলাপ করিয়ে দিল আশীষের সঙ্গে। আশীষ তবলা বাজান। মাঝে মাঝেই আশীষ তার গানের সঙ্গে তবলা সঙ্গত করেন। এখানে থাকাকালীন নিদ্রিতা অনেক প্রোগ্রাম করেছেন। পয়লা বৈশাখ, সরস্বতীপূজা ইত্যাদির বেশ ভালো ভালো প্রোগ্রাম। বেশ জনপ্রিয় হয়েছেন। দ্বিতীয় বছরের শেষে আশীষ বিয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি বিয়েতে রাজী হলেন। এরপর কোর্সের শেষে আই টি আই তে চাকরী পেলেন। মাষ্টার্স-এ গোল্ড লেডেলিষ্ট আশীষ ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটিতে (Ohio State University, OSU) পি এইচ ডি প্রোগ্রামে ডাক পেলেন। ১৯৮৬ সালে বিয়ে করে একসঙ্গে দুজনে এলেন কলম্বাসে।নিদ্রিতা এখানে কিছুদিন কাটিয়ে  আবার দেশে ফিরলেন। আই টি সি (ITC)তে  চাকরীতে যোগ দিলেন। এই চাকরীর সুত্রে এদেশে বাল্টিমোরে এলেন। শুরু হল বাল্টিমোর ও কলম্বাসের মধ্যে দুজনের যাতায়াত। ১৯৯০ সালে আশীষ পি এইচ ডি শেষ করে পিট্‌সবার্গে চাকরী নিলেন। নিদ্রিতাও চলে এলেন এখানে। নতুন চাকরীতে যোগ দিলেন।এখানে তাদের প্রথম সন্তান ঋক হল ১৯৯৩ সালে। ১৯৯৫ থেকে ALCOA তে চাকরী করছেন। ১৯৯৯ তে দ্বিতীয় সন্তান ঋভু হল। পিট্‌সবার্গে আসার পর থেকে এখানেই আছেন স্বামী-স্ত্রী। দুই ছেলেই বড় হয়ে গেছে। বড় ঋক বাবার মত তবলা বাজায়। কারনেগী মেলন (Carnegie-Mellon University) থেকে কম্পুটার সায়েন্সে  ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে এখন সান ফ্রান্সিসকোয় চাকরী করে এবং তবলার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে। ছোটজন ঋভু আন্ডার-গ্র্যাজুয়েট করছে কেস ওয়েষ্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে (Case Western Reserve University) নিউট্রিশনাল বায়োকেমিষ্ট্রিতে। ঋভু মায়ের মত গান গায়। গান ওর জন্মগত ও প্রকৃতিগত। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গানটাও চালিয়ে যাচ্ছে এই ট্যালেন্টেড ছেলেটি।। এর মধ্যেই নিউ ইয়র্ক ও পিটস্‌বার্গে অনেক একক প্রোগ্রাম করে ফেলেছে এই ছেলেটি।

Nidrita image 3 ছবি ৪) সপরিবারে, স্বামী আশীষের সাথে নিদ্রিতা, সঙ্গে ছেলেরা- ঋভু, ঋক

নিদ্রিতার সঙ্গে কথা বলে মনে হল যে তার মার যে স্বপ্ন ছিল মেয়েদের নিয়ে, সেটি পূরণ হয়েছে। নিদ্রিতার মতোই তার ছোট বোন আর ই কলেজ (R.E College) থেকে মেটালার্জীতে  ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স থেকে মাষ্টার্স করেছেন। বাবা তাদের ছেড়ে গেছেন ২০১৪ সালে এবং তার পথ অনুসরণ করে মা চলে গেছেন ২০১৮তে।

আমার এই সহচরীর সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে দেখছি লেখা ক্রমশঃ বড় হয়ে যাচ্ছে, তবুও লেখা শেষ হচ্ছে না। তাই ঠিক করলাম এবারে এখানে শেষ। আরেকটা ভাগে থাকবে নিদ্রিতার সঙ্গীত জীবনের কথা। ব্যাক্তিগতভাবে চিনি নিদ্রিতাদিকে অনেকদিন থেকে। তবুও মনে হয় তার ছোটবেলার ও কলেজ জীবনের কথা জানিলে অনেকে অনুপ্রাণিত হবেন।

পরের পার্টে থাকবে নিদ্রিতার সঙ্গীত জীবনের কথা………………

সহচরী ১৩/স্বপ্না রায়

সহচরী ১৩/ স্বপ্না রায়

image 6

আমার এই মাসের সহচরী হলেন দীর্ঘদিনের বোষ্টনবাসিনী, স্ত্রী, মা, পেশায় বায়োকেমিষ্ট, চাকরী করেন একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি তে এবং ছোট-বড় সবাইকে নিয়ে একটি স্বরলিপি নামে একটি স্কুল চালান। আসুন, স্বপ্না রায়ের সম্বন্ধে আমরা এবার একটু বিশদভাবে জানব। প্রথবে জানব তার ছোটবেলার কথা।

স্বপ্নাদি বড় হয়েছেন হাওড়ায়।বাবাদের যৌথ পরিবার। বাবারা অনেক ভাই, বোন। এদের মধ্যে তিনি প্রথন সন্তান বাড়িতে। বাবা ডাঃ নির্মল সরকার রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের  কর্মচারী, মা ইরা সরকার। ছোট থেকেই আদরে মানুষ। পড়াশুনার সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তি, নাটক, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে প্রচুর উৎসাহ পেয়েছেন। চার বছর বয়সে বাবার কোলে চেপে অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করেছেন। অনেক প্রতিযোগিতায় আবৃত্তি করে প্রাইজ পেয়েছেন (১০০র  বেশী)। রেডিওতে শিশুমহলে যোগ দিয়েছেন। এমনিভাবেই বাবার সঙ্গে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের সামনে বসে তাকে কবিতা শুনিয়েছেন, তার স্ত্রীকে গান শুনিয়েছেন। বাড়িতে বড়দের উৎসাহে শিশুশিল্পীচক্র নামে ছোটদের একটি সংঘ গঠিত হয়। সেই দলের হয়ে জামসেদপুরে গিয়ে “কাবুলীওয়ালা” নাটকে (মিনির চরিত্রে) অভিনয় করেন বসন্ত চৌধুরীর (কাবুলিওয়ালার চরিত্রে)সঙ্গে। তখন তিনি ছোট্ট, মনে আছে বসন্ত চৌধুরীর স্ত্রী তাকে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছিলেন। এইভাবে খুব অল্পবয়সেই তিনি স্বপনবুড়ো, সবুজসাথী, মন্মথ রায়,  কাজী সব্যসাচী, সবিতাব্রত, আশাপূর্ণা দেবীর এবং জাদুকর এ সি সরকারের (পি সি সরকারের ছোটভাই) স্নেহভাজন হয়েছেন।

হাওড়া গার্লস্‌ স্কুলে পড়াশুনা শেষ করে বেথুনে ভর্তি হন  ফিজিক্স-এ অনার্স (Physics Honors) নিয়ে। ক্লাস শুরু হল। এরমধ্যে বাড়ির কাছেই হাওড়া গার্লস্‌ কলেজে নতুন কেমিস্ট্রি অনার্স শুরু হল। স্বপ্নার দাদু হাওড়া মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান আর জেঠু হাওড়া কোর্টের উকিল। তাদের একান্ত ইচ্ছা স্বপ্না তাদের চোখের সামনে পড়াশুনা করবেন, দূরে না গিয়ে। অগত্যা ভর্তি হলেন হাওড়া গার্লস্‌ কলেজে, যেতেন জেঠুর সঙ্গে পুরোণো অষ্টিন গাড়িতে চেপে। পরীক্ষার সময়ে দাদু ডাবের জল দিয়ে আসতেন আদরের নাতনীর জন্য। নতুন করে কারোর সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করার কোনো সু্যোগ হয় নি। এভাবেই কলেজের গন্ডী শেষ করে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে ভর্তি হলেন মাষ্টার্স -এর জন্য। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি স্বপ্নার বাবাও এই ডিপার্টমেন্টেই কাজ করতেন।  কলেজে এসে প্রচুর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছেন।নাটক, আবৃতি, গান। এখানেই তার পরিচয় রাহুল রায়ের সাথে। একবার সরস্বতী পুজোর অনুষ্ঠান শেষে বন্ধুরা  তাকে পৌছে দিচ্ছে সুকিয়া স্ট্রীটে তার জেঠুর বাড়িতে, রিক্‌সায় বসে স্বপ্না, পরণে সাদা লালপাড় বেনারসী, হাতে তানপুরা, পায়ের কাছে হারমোনিয়াম। রিকসার পেছনে একদঙ্গল ছেলে! একজন বলে উঠল “সরস্বতী মাঈ কি জয়!”। বলাই বাহুল্য এই ছেলেটিই পরবর্তীকালে তার ভালোবাসার মানুষ, রাহুল রায়। রাহুলও তখন পিওর কেমিস্ট্রি নিয়ে মাষ্টার্স করছেন, ভালো স্কেচ করেন আর বেহালা বাজান। দুজনের ভালোই মিলল।

এরপর এম এস সি শেষ করে পি এইচ ডি করতে ভর্তি হলেন। তিনি ছিলেন অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রির প্রথম মেয়ে যিনি পি এইচ ডি করছেন। বিষয় ছিল “High Altitude Glycogen Metabolism”। গাইড অসময়ে মারা যেতে আর শেষ করা হয় নি। রাহুল ততদিলে চলে এসেছেন এদেশে ওয়াশিংটন স্টেট-এ (University of Washington) পি এইচ ডি করতে। বাড়ি থেকে বিয়ের কথা উঠতে স্বপ্না বাড়িতে জানাতে, কোনো বাধাই উঠল না। সবার সাপোর্টে বিয়ে হয়ে গেল ১৯৭৮ সালে। তারপরেই চলে এলেন এদেশে।

বিদেশে  (পুলম্যান, ওয়াশিংটন) এসে প্রথমে ভাবলেন ফাইন আর্টস্‌ এর ওপর পড়াশুনা করবেন।স্কাল্পটিং এর ওপর ইন্টারেষ্ট ছিল। আবার ইউনিভার্সিটি ওফ ওয়াশিংটন -এ আরেকটা মাষ্টার্স করলেন নিউট্রিশন বায়োকেমিস্ট্রি ওপরে ডাঃ পিউবিল এর গাইডে। ততদিনে স্বামী রাহুল এম আই টি তে (MIT) পোষ্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ পেয়েছেন। স্বামীর সঙ্গে চলে এলেন বোষ্টনে। কিছুদিন একটি ল্যাবরেটরীতে কাজ করে এম আই টি তে কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে বায়োকেমিস্ট হয়ে ঢুকলেন ১৯৮১ সালে। জাপানী বস ডাঃ মাসামুনের জাপানী-ইংলিস একমাত্র স্বপ্না বুঝতে পারতেন। দেড় বছর এখানে কাজ করে হারভার্ড মেডিক্যাল স্কুলে কিছুদিন কাজ করেন। তারপর টাফটস্‌ মেডিক্যাল স্কুলে চাকরী করেন স্বামী-স্ত্রী দুজনেই। এরপর স্বপ্না যোগদান করেন Ipsen Pharmaceuticals Inc.।বোষ্টনেই আছেন অনেক বছর। তাদের দুই ছেলে। দুজনেই মিউজিক-এর সঙ্গে জড়িত এবং চাকরী করে।

Image 3ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে স্বপ্না

স্বপ্না্র সঙ্গীতশিক্ষা ও তার সৃষ্ট স্বরলিপি স্কুলঃ এবার স্বপ্নার অন্যদিক নিয়ে বলব। ছোটবেলা গানের শিক্ষয়িত্রী ছিলেন শ্রীমতি বাসন্তী ঘোষাল। তারই উৎসাহে একটি গানের প্রতিযোগীতায় প্রথম পুরস্কার পান। সেখানে পরীক্ষক ছিলেন প্রবাদপ্রতিম শ্রীমতী সুচিত্রা মিত্র। তাঁরই উৎসাহে স্বপ্না নর্থ ক্যালকাটার “রবি তীর্থে” ভর্তি হন। সেখানে তার শিক্ষিকা ছিলেন শ্রীমতি সুমিত্রা চ্যাটার্জী (ঘোষ) ও স্পেশাল ক্লাসে শ্রীমতি সুচিত্রা মিত্র। পরবর্তী কালে তিনি এদেশে স্বপ্নার কাছে এসেছেন এবং আমরণ স্বপ্নার সঙ্গে তার স্নেহের বন্ধন অটুট ছিল।তাঁর অনুমতি ও আশীর্বাদ নিয়েই স্বপ্নার এই স্বরলিপি গানের স্কুলের সূত্রপাত।

প্রথমে এদেশে এসে বাড়ির অভাব খুব অনুভব করেছেন। বাড়িতে ছিল বারো মাসে তেরো পার্বন। অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। প্রথমে পুলম্যানে নিজেদের বাড়িতে প্রথম গানের স্কুল খুললেন। কয়েকজন অবাঙ্গালি ছাত্রছাত্রী। বোষ্টনে এসে দেখলেন বাচ্ছাদের বাংলা শেখাবার স্কুল আছে। আরো দেখলেন বাচ্ছারা যখন বাংলা বলে সবসময় উচ্চারণ ঠিক হয় না। কিন্তু গান গাইবার বা আবৃত্তি করবার সময় উচ্চারণ খুব জরুরী। বাচ্ছাদের দিয়ে গান, আবৃতি, নাটক করাবার কথা ভাবলেন। বাচ্ছাদের মা-বাবারা খুব উৎসাহ দিলেন। প্রথমে বাড়িতেই খুব সাধারণ ভাবেই শুরু হল স্বরলিপির (Swaralipi Rabindrasangeet Academy) – শণিবার দুপুরে ২০০৫ সালে। তারপর আস্তে আস্তে ১০-১২ জন বাচ্ছা নিয়ে অনুষ্ঠান করলেন। দীর্ঘ ১৫ বছরে প্রায় ১৫০ জন ছাত্রছাত্রী শিখেছে তার কাছে গান, কবিতা আবৃতি, নাটক। ছাত্রছাত্রীদের বয়েস ৫-৮০ বছর! এখানে বাঙালি ছাড়াও অন্যান্য ভারতীয় ছাত্রছাত্রী আছে।এদেশীয় ছাত্রও রয়েছে। বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী “সমাবর্তন”করে বেরিয়ে গেছে। তবে একেকটা সেমিস্টারে ২০ র বেশী স্টুডেন্ট নেন না। একজন ৮০ বছর বয়স্কা ছাত্রী আছে, ৪০ মাইল গাড়ি চালিয়ে আসেন গান শিখতে। বাচ্ছারাও তার কাছে স্কুলে আসতে ভালোবাসে। তাদের এখানে অনেক ব্রেক আছে “চিকেন নাগেটস্‌ ব্রেক”, “ক্র্যাকার ব্রেক”, “স্টিকার ব্রেক”, “ললিপপ ব্রেক” ইত্যাদি ইত্যাদি। এছাড়াও স্বপ্না প্রত্যেক বাচ্ছার জন্মদিন পালন করেন। বাচ্ছারা তার স্কুলে আসতে ভালোবাসে। স্বরলিপির ছাত্রছাত্রীর এম এস শুভলক্ষ্মীর অনুষ্ঠানে পুরস্কার পেয়েছে। অসংখ্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছে।এখন প্রতিবছর স্বরলিপির বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী তাদের বাড়িতে রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎযাপন করে, এমনকি হল ভাড়া করেও এই বিশেষ দিনটি পালন করে।

Image 5হারভার্ড স্কোয়ারে প্রভাতফেরী

হারভার্ড স্কোয়ারে বাৎসরিক প্যারেডঃ এই প্যারেড শুরু হয় কবিগুরুর সার্ধ শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে।প্রথমবার প্রভাতফেরী হয়েছিল মে সাসে। তখনো বেশ ঠান্ডা থাকে। এখন জুন মাসে করা হয়। স্বপ্না ও রাহুল ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে  ঢাক, ঢোল, বেহালা গিটার, একতারা খঞ্জনী নিয়ে, রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে, নাচতে নাচতে সবাই মিলে প্রভাতফেরী করেন । পথচলতী যাত্রীরা কেউ কেউ অংশগ্রহণ করেন। এর জন্য আলাদা করে পারমিশন নিতে হয় শহরের কতৃপক্ষের কাছে। তাদের এই অসামান্য প্রভাতফেরীর খবর বেরিয়েছিল আজকাল পত্রিকায়।

image 1বহাতে গড়া সরস্বতী প্রতিমা

সরস্বতী ঠাকুর গড়াঃ বরাবরই স্বামীস্ত্রী আর্টের অনুরাগী এবং ভালোবাসেন নানারকম জিনিস তৈরী করতে। তখন তারা বোষ্টনে প্রথম এসেছেন। রাহুলের মাসি থাকেন নর্থ ক্যারোলিনায়। মাসির আবদার তাদের যেতেই হবে সরস্বতী পুজোয়।দুজনে মিলে ঠাকুর গড়তে গেলেন। তৈরী করে দিলেন অসামান্য থার্মোকলের সরস্বতী প্রতিমা সমস্ত ডেকরেশন সহকারে। এখানে বলে রাখি প্রতিমা তৈরী করা খুব সহজ কথা নয়। অনেক ধৈর্য লাগে। লাগে  অনেক মেটিরিয়াল এবং অভিনব চিন্তাভাবনা।  আজকাল এইসব জিনিস এদেশ থেকেও চলে যাচ্ছে। লোকে ভাবে কুমারটুলির প্রতিমা আনালেই হবে। কিন্তু এক সময় ছিল যখন প্রবাসী বাঙ্গালিরা ঠাকুর নিজেরাই গড়ে নিত। তবে এসবের জন্য এই রকম গুণি মানুষের প্রয়োজন ছিল। এছাড়াও তারা দুজনে মিলে অসংখ্য পুজোর আর্ট ডেকরেশন করেছেন। বাড়িতে সরস্বতী পুজো হয় প্রতিবছর সব ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। প্রতিমা তাদের নিজেদের বানানো।ছাত্রছাত্রীরা দুবার করে অঞ্জলী দেয়, একবার সবার সঙ্গে পুষ্পাঞ্জলি, আর একবার মা সরস্বতীর সামনে একেকগানের অঞ্জলী।

Image 4প্রিয় দিদির সাথে স্বপ্না ও রাহুল

নবনীতা দেবসেনের সঙ্গেঃ শেষ করবো স্বপ্নার সঙ্গে নবনীতা দেব সেনের বিশেষ সম্পর্কের কথা বলে। তাদের যোগাযোগ অনেক বছর আগে, যখন রাহুল এম আই টি তে ছিলেন, তারা থাকতেন কেম্ব্রিজে একটি এপার্টমেন্টে।ব্রান্‌ডাইস্‌ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ছেলে পড়তে আসে। সে স্বপ্না ও রাহুলকে নিজের দিদি ও দাদার মতো খুব ভালোবাসতো। তারই বন্ধুর মা এদেশে হারভার্ডে সেমিনার দিতে এলেন।  এই মা হলেন প্রয়াত সাহিত্যিক নবনীতা দেব সেন। তারপর থেকেই দিদির সঙ্গে যোগাযোগ। তাদের অটোগ্রাফ বইতে নবনীতাদির লেখা উঠল।দিদির সঙ্গে সম্পর্ক অন্যরকম হয়ে উঠল।দিদি তাকে ভীষণ ভালোবাসতেন।যতবারই দেশে গেছেন দেখা করেছেন। দিদিকে একটা কম্বল দিয়েছিলেন।দিদি বলেছিলেন, “দ্যাখ্‌, তোর দেওয়া কম্বল রাতে গায়ে দিই, তোর দেওয়া নাইটি পরে রাতে শুই, তোর দেওয়া ক্রিম মাখি, দ্যাখ্‌, তোকে কত ভালোবাসি।”। একবার গেছেন, দিদি তাকে দুটো শাড়ির মধ্যে একটা ডার্ক মেরুণ শাড়ি নিয়ে পরে এসে দেখাতে বললেন। স্বপ্না কে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। দিদি তাকে খুব লিখতে বলতেন, অনুপ্রেরণা দিতেন। রাহুলকে বলেছিলেন স্বপ্নার সব লেখা ওনাকে পাঠাতে, উনি নিজে বইটির মুখবন্ধ লিখবেন।আরো বলেছিলেন যে স্বপ্নাকে না জানিয়ে বইটা পাব্‌লিশ করে দিতে! স্বপ্না্র হাতেখড়ি ওনারই কাছে! উনি ছিলেন স্বপ্নার দ্রোণাচার্য যাকে দূর থেকেও একলব্যের মতো সে অনুকরণ করতো। দিদিই চলে গেলেন। স্বপ্নার কাছে দিদির চলে যাওয়া একটা ভীষণ শূণ্যতা তৈরী করেছে, যা পূরণ হবার নয়।

Image 2ব

আমার কথা/ ডিসেম্বর ২০১৯

Sahachari Pic 1

আমার কথা, ডিসেম্বর ২০১৯

২০১৯ শেষ হয়ে এল। আমার সহচরী ব্লগের আরেক বছর হয়ে গেল। এর মধ্যে বেশ কিছু সহচরী এসে গেছে আমার পাশে। তাদের সম্বন্ধে জেনেছি আর জানিয়েছি সবাইকে। খুব ভালো লেগেছে তাদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে।

ডিসেম্বর মানেই পৌষ মাস, ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব, ন্যাপ্‌থালিনের গন্ধযুক্ত শীতের সোয়েটার, জ্যাকেট বাইরে আসা, দেশের পিঠে-পুলি আর নতুন গুড়ের সন্দেশ, জয়নগরের মোয়া। কিছু বর্তমান আর কিছু স্মৃতি। পিট্‌সবার্গে নভেম্বরেই বরফ পড়ে গেছে। বেশ ঠান্ডা। এসবের মধ্যেই প্রত্যেক বছরের মতো বড়দিন হয়ে গেল ২৪ শে, ২৫ শে ডিসেম্বর। আমাদের বাড়িতে এবার দুটি ক্রিস্‌মাস ট্রী বাক্সবন্দী দশা থেকে বেড়িয়েছে। নানারকম অলংকারে সেজেছে আর আলোয় ঝলমল করেছে। মেয়ে যখন ছোট ছিল তখন প্রত্যেক বছরি এমনি সাজতো।তবে গত কয়েকবছর  মেয়ে কলেজ চলে যাবার পর বড় গাছটা আর বেরোয়নি অনেক ঝামেলা বলে। এবার প্রায় জোর করেই মনের ইচ্ছাশক্তিকে একত্র করে গ্যারেজের তাক থেকে নিয়ে এসে সাজালাম গাছটাকে। বাড়িটা যেন ঝলমল করে উঠল। তবে  বড়দিন কাটিয়েছি বোনের কাছে। সবাইমিলে আনন্দ ভাগ করে নেবার একটা আলাদা মজা আছে।

এবার ৩১শে ডিসেম্বরের প্রতিক্ষা। নতুন বছরকে স্বাগত জানাবার পালা। বিদায় ২০১৯, স্বাগত ২০২০। নতুন বছরে আবার আপনাদের কাছে আসব নতুন আমার কথা আর অন্য আরেক সহচরীকে নিয়ে।

আগত ২০২০ র জন্য আমার শুভেচ্ছা রইল।

 

সহচরী ১২/ নীলাঞ্জনা দে

 

Sahachari 4Dey, Nailanjanaআমার এই মাসের সহচরী নীলাঞ্জনা দে-কে নিয়ে এলাম তার কথা বলার জন্য। আমার অন্যান্য সহচরীদের মতো ওহাইয়ো স্টেটের টলিডো শহরের বাসিন্দা নীলাঞ্জনাও নিজ গুণে গুণী। নীলাঞ্জনা একজন নার্স প্র্যাক্টিসনার্‌ (Nurse Practitionor) R.N., M.S.N, পেশেন্ট দেখেন। এদেশে এসে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন। আসুন তার সঙ্গে পরিচয় করি।

নীলাঞ্জনার জন্ম আসানসোলে।বাবা-মা তাদের মেয়ে নিয়ে পাড়ি দিলেন মুসাবনি তে। জায়গাটি ঘাটশিলা অঞ্চলে। বাবা মুসাবনির কপার মাইন্স্‌-এর মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যোগদান করলেন। এখানেই কৈশোর কাটিয়ে (১১ গ্রেড ওবধি পড়ে) আবার পাড়ি মধ্যপ্রদেশের মালাঞ্জখান্দ। নীলাঞ্জনা এখানে ১২ গ্রেড পাশ করলেন। এরপর যাত্রা নাগপুরে ১৯৯২ তে। নাগপুর ইউনিভার্সিটিতে আর্কিটেক্‌চার ইঞ্জিনিয়ারিং -এ ভর্তি হলেন। শুরু হল পড়াশুনা। এইসময়ে তার স্থানীয় গার্জিয়ান ছিলেন শ্রী প্রবাল দে। এখানে প্রবালের সম্বন্ধে একটু বলি। ইনি কম্পুটার ইঞ্জিনিয়ার।একসময়ে কর্মসুত্রে নীলাঞ্জনার বাবার সঙ্গে পরিচয়, সেই থেকে পারিবারিক বন্ধু। সেইসময়ে নাগপুরে চাকরী করছেন। নাগপুরে নীলাঞ্জনা আর প্রবাল পরস্পরকে ভালোবেসে বিয়ে করেন ১৯৯৩ তে। এরপর স্বামীর সঙ্গে গড়ে তোলেন নিজেদের ছোট্ট সংসার।

১৯৯৫ সালে ঘর আলো করে তাদের প্রথম সন্তান খুশবু এল। নাগপুরে আরো ছয়মাস কাটিয়ে স্বামীর কর্মসুত্রে চলে গেলেন মধ্যপ্রদেশের বর্ধাতে। বছরতিনেক এখানে কাটিয়ে আবার পাড়ি রাজস্থানের চিত্তোরগড়ে। পরবর্তী গন্তব্যস্থল হল মধ্যপ্রদেশের সাত্‌না। ১৯৯৯ তে এই পরিবারে নতুন সদস্য এল, তাদের ছেলে তনুজ। খুসবু তখন লোয়ার কেজিতে পড়ে। এরপরই প্রবাল চাকরীসুত্রে ইউ এস এ তে পাড়ি দিলেন। কর্মস্থল ওমাহা (নেব্রাস্কা স্টেট)। ছোট তনুজকে মায়ের কাছে রেখে নীলাঞ্জনা পাড়ি দিলেন সুদূর আমেরিকার ওমাহাতে, সঙ্গে মেয়ে খুশবু। মেয়ে এদেশে স্কুলে ভর্তি হল। শুরু হল তাদের জীবণ নতুন দেশে।মাসতিনেক কাটিয়ে স্বামীর কর্মসুত্রে এলেন মিশিগানের গ্র্যান্ড র‍্যাপিড্‌স শহরে। এখানে তার মায়ের সঙ্গে ছোট্ট তনুজ এল তাদের কাছে।আবার পরিবারটি একত্র হল। সবাই মিলে ছেলের এক বছরের জন্মদিন পালন করলেন খুব আনন্দের সঙ্গে।

এর বছরখানেকের মধ্যে নীলাঞ্জনা আবার পড়াশুনা শুরু করলেন। স্থানীয় কমিউনিটি কলেজে কম্পুটার সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হলেন। তিনি তখন H1B ভিসায় আছেন। এতে ফিনান্সিয়াল এড (Financial Aid)পাওয়া যায় না। তবুও কলেজ তার জন্য স্কলারশিপের ব্যাবস্থা করল। কিছুদিন পড়লেন, কিছু কোর্স নেবার পর তার আর ভালো লাগল না। ছোটবেলা থেকেই তার ফিজিসিয়ান (ডাক্তার) হবার সখ ছিল। কিন্তু সেই সাধ মেটানো হয় নি। এদেশের হেল্‌থকেয়ার ফিল্ডে যাবার সখ হল। কিন্তু আগেই দেশে বেশকিছু পড়াশুনা করে এসেছেন, ভালোই ছাত্রী ছিলেন তবে নার্সিং পড়তে গেলে প্রি-রিকুইজিট কিছু কোর্স নিতে হয়। অনেক সময়ে স্কুলের কোর্স নেওয়া থাকলে বেশ কিছু কোর্স আর নিতে হয় না। তবে প্রমাণ হিসেবে স্কুলের গ্রেড এবং ট্রান্সস্ক্রিপ্ট লাগে। যারাই এদেশে এসে পড়াশুনা বা শিক্ষকতা করতে শুরু করেন তারা ভালোই জানবেন এই ব্যাপারটি নিয়ে। দেশ থেকে ট্রান্সস্ক্রিপ্ট আনার অনেক ঝামেলা।নীলাঞ্জনা থেমে থাকার পাত্রী নন। স্কুল লেভেলের পরীক্ষা ACT থেকে শুরু করলেন। কমিউনিটি কলেজে আবার ভর্তি হলেন আন্তর্জাতিক (International)স্টুডেন্ট হিসেবে। ২০০৩ সালে নার্সিং মেজর (Nursing Major declared) হিসেবে এই সংক্রান্ত সব প্রি-রিকুইজিট কোর্স শেষ করলেন। ২০০৪ সালে   গ্র্যান্ড র‍্যাপিডের গ্রান্ড ভ্যালী স্টেট ইউনিভার্সিটিতে (Grand Valley State University) নার্সিং-এ ভর্তি হলেন। ছেলে তখনো বেশ ছোট। তাই নিয়েই সংসার সামলে পড়াশুনা করতেন। গরমকালে মা আসতেন দেশ থেকে। তখন বেশী কোর্স নিতেন। এই ভাবেই স্বামীর ও মায়ের সাপোর্টে ২০০৬ সালের অগাষ্টে নার্সিং পাশ করলেন।

২০০৬ সালে স্বামীর কর্মসুত্রে ওহাইয়োর টলিডো শহরে এলেন। এখানে নার্সিং এর সার্টিফিকেশন পরীক্ষা (Certification exam) দিয়ে টলিডো হাস্‌পাতালে (Toledo Hospital) এর আই সি ইউ (ICU)বিভাগে কাজ নিলেন। এখানে বলে রাখি নার্সিং মানে কিন্তু প্রকৃত অর্থে পেশেন্ট-এর পরিচর্যা। পেশেন্ট এর সবরকম দেখাশুনা করা তার পাশে থেকে। আর আই সি ইউ র পেশেন্টদের সবারি বেশ ক্রিটিক্যাল অবস্থা থাকে, বেশিরভাগি শয্যাশায়ী।তাদের সবকিছুই করে দিতে হয়।কাজেই এই সব পেশেন্টদের পরিচর্যা করা বেশ কঠিন কাজ।বেশ ভালোই চলছিল কাজ। দুবছরের মাথায় একদিন পেশেন্ট তুলতে গিয়ে গলায় আঘাত লাগে নীলাঞ্জনার। তারপর তিনি বেশ কিছুদিন কাজ করতে পারেন নি। Disability -তে ছিলেন প্রায় এক বছর। নার্স হিসেবে কাজ করার সময় তার দুজন সহকর্মী ছিল নার্স প্র্যাক্টিশনার (Nurse Practitioner)। তাদের কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হন।এরা পেশেন্ট দেখতে পারেন, প্রেস্ক্রিপশন লিখতে পারেন। তবে এই প্রফেশনে ঢুকতে গেলে মাষ্টার্স করতে হয়। যেই ভাবা সেই কাজ! ২০০৯ সালে তিনি মাষ্টার্স করতে গেলেন (Masters in Nurse Practitioner), তার স্পেশালাইজেশন হল ফ্যামিলী মেডিসিন। ২০১১-এ পাশ করে টলিডো ক্লিনিক-এ যোগ দেন নার্স প্র্যাকটিশনার হিসেবে প্রাইমারী কেয়ারে (Primary Care)।প্রমোশন হল ২০১৬ তে আরজেন্ট কেয়ারে (Urgent Care)। আপাততঃ এখানেই কাজ করছেন। বেশ ভালো লাগছে।

নীলাঞ্জনার এই কাজটি বেশ ভালো লাগে। নার্স প্র্যাকটিশনার হিসেবে তিনি স্বাধীনভাবে ভাবনা চিন্তা করতে পারেন, অন্যান্য সহকর্মীর সাথে একত্র হয়ে কাজ করতে পারেন (Collaborate), পেশেন্ট দেখতে পারেন। প্রতি সেমেস্টারে ট্রেনী নার্স প্র্যাক্টিশনাররা ক্লিনিক্যাল করে (যারা পড়ছে)। তাদের ট্রেন করতে ভালো লাগে।এর থেকে তার টিচিং এর অভিজ্ঞতা হয়। বেশ কিছু স্টেটে নার্স প্র্যাকটিশনার স্বাধীনভাবে প্র্যাকটিস করতে পারে। কিন্তু ওহাইয়ো স্টেটে সেটি সম্ভব নয়। এখানে প্র্যাকটিস করতে গেলে আরেকজন ফিজিসিয়ানকে সঙ্গে রাখতে হবে। তবুও তার এই কাজটি বেশ ভালো লাগে। এটি প্রায় প্র্যাকটিশ করার মতোই যেখানে তাকে কারুর আদেশ পালন করতে হচ্ছে না।তিনি নিজেই ডিশিসন নিতে পারেন কোনো পেশেন্ট-এর ব্যাপারে। তবে কাজটি করতে গেলে একটু অন্য ধরনের মানসিকতার দরকার।

দুটি ব্যাপারে এবার একটু বলবো। আমাদের দেশে নার্স প্রফেশনকে ভালো চোখে দেখা হয় না। নার্স দের অনেকটাই হেয় করা হয়। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি জীবিকাকে অনেক সন্মানের চোখে দেখা হয়। আমি যখন দেশে ছিলাম এটাই দেখে এসেছি। এখন এই চিন্তাধারার পরিবর্তন হয়েছে কিনা জানিনা। তবে আমাদের জেনে রাখা ভালো যে হাস্পাতাল চলে ডাক্তার এবং নার্সদের যৌথ প্রয়াসে।যে কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ডাক্তার, পেশেন্টদের সাথে নার্সদের এক টিম থাকে। কাজেই আমাদের নার্সদের হেয় করার প্রবৃত্তি কে পরিবর্তন করা দরকার। নীলাঞ্জনার বাবা প্রথমে তার এই নার্সিং জীবিকাকে ভালোভাবে মেনে নিতে পারেন নি। একবার এদেশে এসে তার খুব শরীর খারাপ হয় এবং কার্ডিয়াক আই সি ইউ তে ভর্তি হতে হয়। কিছুদিন থাকাকালীন তার আই সি ইউ নার্স দের সেবা ও কাজ দেখে তিনি তার মত পরিবর্তন করেন এবং মেয়ে এই কাজ করছে দেখে তার খুব ভালো লাগে। এখনো এদেশের অনেক প্রবাসী বাঙ্গালিরাও খুব একটা এই প্রফেশন নিয়ে জানেন না। অনেকেই জানেন না নার্স প্র্যাকটিশনাররা প্র্যাকটিশ করেন, পেশেন্ট দেখেন, তারা শুধুমাত্র নার্স নন। আমাদের প্রবাসী বাঙ্গালিদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গীকে একটু পরিবর্তন করার সময় এসেছে।আর যে দেশে আছি সে দেশের মতো নিজের চিন্তা ভাবনাকে একটু পরিবর্তন করতে অসুবিধা কোথায়?

নীলাঞ্জনার মেয়ে খুশবু মায়ের মতো হেলথ সংক্রান্ত প্রফেশনে আছে। হেল্‌থ আডমিনিস্ট্রেশনে লস এঞ্জেল্‌সে কাজ করেছে।ছেলে তনুজ এখন মায়ামি কলেজে জুনিয়ার (Major in Public Administration। স্বামী প্রবাল কম্পুটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে ইন্ডিয়ানাপোলিসে পোষ্টেড। এছাড়াও পরিবারে আছে দুটি কুকুর, সুজি (ল্যাব্রাডর) আর টোবি (জ্যাক রাসেল টেরিয়ার)।

নীলাঞ্জনার মতে এই প্রফেশন টি খুব rewarding। যে কোনো স্পেশালিটি তে কাজ করা যায়। পেশেন্ট দেখে, তাদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের চিকিৎসা করে আনন্দ পাওয়া যায়। তবে এই প্রফেশনটির মতো নিজেকে গড়ে তোলা খুব সহজ নয়। অনেক স্যাক্রিফাইস করতে হবে, আর পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা চাই।

নীলাঞ্জনার সঙ্গে কথা বলে, তার কাজ সম্বন্ধে জেনে ভালো লাগল। আশা করবো অর মতো অনেক বাঙালি মেয়েরা এই প্রফেশনে এগিয়ে আসবেন। আমার শুভকামনা রইল নীলাঞ্জনার জন্য।

খুচখাচ রান্না/ পাঁপড়ের ডালনা

 

 

 

 

Sahachari 2পাঁপড়ের ডালনা

শ্রীরূপা মিত্র

উপকরণ

লিজ্জতের পাঁঞ্জাবী পাঁপড় (গোল মরিচ দেওয়া)[এটা ধরণের পাঁপড় ছাড়া অন্য পাঁপড়ে এই তরকারীর স্বাদ আসে না]

তেল, ২ টেবিল চামচ

জিরে, ১ চা চামচ

হলুদ ১/২ চা চামচ

কাশ্মীরি শুকনো লঙ্কা ১/২ চা চামচ

নুন পরিমানমতো

ছোট আলু (Yukon gold) (অর্ধেক করে কাটা)

 

পদ্ধতী

প্রথমে কড়াইতে  তেলে জিরে ফোড়ন দিতে হবে।

আলুর টুকরোগুলি তেলে ছেড়ে দিয়ে, হলুদ, শুকনো লঙ্কা, নুন দিয়ে ভাজতে হবে।

আলু ভাজা ভাজা হয়ে গেলে, একটু জল দিয়ে ঢাকা দিতে হবে।

আলু সেদ্ধ হয়ে গেলে, লিজ্জত পাঁপড় ভেঙে ভেঙে দিয়ে ঢাকা দিয়ে দিতে হবে।

স্টোভ বন্ধ করে দিতে হবে।

এই সময়ে একটু সতর্ক থাকতে হবে যেন পাঁপড় গলে না যায় এবং পাঁপড় দেওয়ার পর তরকারী যেন না ফোটে।

 

আমার কথা, নভেম্বর ২০১৯

Sahachari Pic 1আমার ব্লগের একবছর বয়স হল।গতবছর অক্টোবর মাসে শুরু করেছিলাম। গত এক বছরে প্রত্যেক মাসে একজন করে সহচরীকে নিয়ে এসেছি, তাদের কথা বলব বলে। এদের প্রত্যেকের কাছ থেকে অনেক কিছু জেনেছি, শিখেছি, আর এরা সবাই আমার খুব কাছের মানুষ হয়ে গেছেন। এছাড়াও প্রায় প্রত্যেক পর্বে রান্নার রেসিপি পোষ্ট করেছি। বেশিরভাগি নতুন রান্না। যারা রান্নার রেসিপি দিয়েছেন, সেই সহচরীদের আবার অসংখ্য ধন্যবাদ। আশাকরি আগামী বছরেও আরো নতুন সহচরীদের আপনাদের কাছে নিয়ে আসতে পারব।

নভেম্বর মাস মানেই ঠান্ডা পড়ার পালা। গাছপালা গুলি খুব তাড়াতাড়ি রকমারি পাতা সব ঝরিয়ে ফেলে শীতের জন্য তৈরী। নেড়া গাছগুলিকে দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়। এবার শরত (এদেশে আমরা বলি ফল্‌)একটু যেন আগেই চলে গেল।এর মধ্যেই একপ্রস্থ বরফপাত হয়ে গেছে হাল্কা করে। এবার সময় থ্যাঙ্কস্‌গিভিং হলিডের (Thanksgiving Holiday)। তার মানেই ঘরে ঘরে প্রস্তুতি চলছে বাজার করার ফিস্টের জন্য। টার্কি কেনাকাটা চলছে। টেবিলভর্তি খাবার নিয়ে আত্মীয় পরিজন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে খেতে বসা প্রথা। ভালোই লাগে।

সবাইকে Happy Thanksgiving Holiday -এ আগাম শুভেচ্ছা জানালাম।

সহচরী ১১/ মন্দাক্রান্তা বসু

সহচরী ১১/ মন্দাক্রান্তা বসু

Image

এবার আমার সহচরী হলেন একজন সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত, প্রফেসর এমেরিটাস ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলম্বিয়া, সেন্টার অফ ইন্ডিয়া এন্ড সাউথ এসিয়ান রিসার্চ -এর প্রাক্তন ডিরেক্টর, এবং অক্সফোর্ড সেন্টার অফ হিন্দু স্টাডিস্‌ এর সিনিয়র ফেলো। এটাই সব নয়। তিনি একজন স্ত্রী, মা এবং ঠাকুমা। এই ভ্যাঙ্কুভারবাসিনী অসীম গুণবতী, বিদুষী মহিলার নাম শ্রীমতী মন্দাক্রান্তা বসু।

মন্দাক্রান্তার জন্ম বিহারের ভাগলপুরে। কলকাতায় আসেন চার বছর বয়সে। বাবা ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপক। মার স্কুল ছিল। তারা পাঁচবোন। অল্পবয়সে বড়দিদি ও মেজদিদি মারা যান। ছোট্ট মন্দাক্রান্তা প্রথমে বেথুনে পড়াশুনা শুরু করেন এবং স্কুল শেষ করেন ভবানীপুরের বেলতলা গার্লসে।।আরম্ভ হল কলেজ জীবন। প্রথমে আই এ পাশ করলেন লেডী ব্রাবোর্ণ কলেজ থেকে, বি এ প্রেসিডেন্সী কলেজে (ও সংস্কৃত কলেজে) এবং সবশেষে কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে সংস্কৃতে এম এ স্মৃতি ও মীমাংসা নিয়ে। এরপর চাকরী জীবন শুরু হল। বিয়েও হয়েছে ততদিনে।

স্বামী-স্ত্রী দুজনেই পড়াতে শুরু করলেন। স্বামী পড়াতেন ইংলিশ প্রেসিডেন্সী কলেজে আর তিনি পড়াতেন সংস্কৃত সিটি কলেজ নর্থে।ইতিমধ্যে অক্সফোর্ডে আরো পড়াশুনা করার সু্যোগ এল এবং তিনি স্বামীর সঙ্গে পাড়ি দিলেন ইংল্যান্ডে।এরপর সুপারভাইসারের উৎসাহে নাট্যশাস্ত্র পড়তে শুরু করলেন। যত শাস্ত্র আছে এই বিষয়ে পড়ে ফেললেন। এরপর পড়াশুনা শেষ হলে দুজনেই দেশে ফিরে যান। স্বামী বর্ধমান ইউনিভার্সিটিতে শুরু করেন অধ্যাপনা। মন্দাক্রান্তা তখন ইউ জি সি-র ফেলোশিপ নিয়ে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে ভারতের ধ্রপদী নৃত্য ও নাট্য বিষয়ে রিসার্চ করতে শুরু করেন।উদয়পুরে কিছুদিন ছিলেন কর্মসুত্রে। বছরদশেক দেশে কাটিয়ে ১৯৭৪ সালে ভ্যাঙ্কুভারে ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় ডক্টরেট শুরু করেন তার স্বামী। মন্দাক্রান্তাও কম্‌প্যারেটিভ লিটারেচারে মাষ্টার্স করলেন। চার বছর বাদে পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরে গেলেও আবার দেশের মায়া কাটিয়ে একেবারে ভ্যাঙ্কুভারে সেটেল্‌ করেন এই পরিবারটি।

এরপর ৪৫ বছর ক্যানাডার ভ্যাঙ্কুভারে। দুজনেই অধ্যাপনা করেছেন। তাদের এক মেয়ে, এক ছেলে। মেয়ে যখন কলেজে আর ছেলে স্কুলে, মন্দাক্রান্তা পাড়ি দিলেন অক্সফোর্ডে ডক্টরেট করতে। দৈনিক ১৮ ঘন্টা কাজ করে ডক্টরেট শেষ করেন ১৯৮৯ একবছরে। কি অসামান্য অধ্যাবসায় আর দৃঢ়তা! এইসময়ে তার স্বামী ছেলের দেখাশুনা করেছেন।

মন্দাক্রান্তার দীর্ঘ অধ্যাপনার জীবন তিনি রিসার্চ করে অনেক বই  লিখেছেন।  Gender and religion in Hinduism, Buddhism, Dance Text ইত্যাদি বহু বিষয়ে। তবে তার প্রধান কাজ হল সংস্কৃত জগতে দ্বিতীয় থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী নাচ, নাটক ও সঙ্গীতের অভিযোজন ও বিবর্তন নিয়ে। অনেক ক্ষেত্রেই মালমসলা যোগাড় করা কষ্টসাধ্য। রিসার্চের জন্য অনেক সময়ে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়েছে। কিন্তু তাতে থেমে থাকেন নি মন্দাক্রান্তা।হারিয়ে যাওয়া পুঁথি যোগাড় করতে বিভিন্ন শহরের (বেনারস, জন্মু, জয়পুর, কেরালা, চেন্নাই) বিভিন্ন লাইব্রেরী ঘুরেছেন, পুনর্গঠন (reconstruct)করেছেন, প্রকাশ করেছেন। নারী ও ধর্মের ওপর অনেক কাজ করেছেন।রামায়ণের বিভিন্ন রূপ আছে, একেকটি রামায়্ণ একেক রকম।এই সব নিয়ে তার রামায়ণের ওপর সম্পাদিত বই রামায়ণ রিভিসিটেড (Ramayan revisited)। এছাড়াও রামায়ণের ওপর পটচিত্র (Scroll)নিয়ে বই লিখেছেন ২০১৭ সালে। বর্তমানে ষোড়শ শতাব্দীতে মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর লেখা রামায়ণ, সীতার জবানীতে, এই বইটি অনুবাদ করছেন মেয়ের সঙ্গে।

Book 1 imageBook 2

অধ্যাপনা ও বই লেখা জন্য তিনি সরকারী ও বিভিন্ন সংস্থা থেকে রিসার্চ গ্রান্ট (যেমন, Social Sciences and Research Council of Canada) পেয়েছেন।এখনো প্রতিবছর দুমাস থাকেন অক্সফোর্ডে গবেষণা ও বক্তৃতার জন্য, এপ্রিল থেকে জুন। এরই ভিত্তিতে বর্তমানে দুটি বই লিখছেন।

এবারে মন্দাক্রান্তার আরেকটি অনবদ্য গুণের কথা বলব। ছোটবেলায় মণিপুরী ও কথাকলি শিখেছেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ীতে শ্রীমতী ঠাকুর ও মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের কাছে নাচ শিখেছেন দশ বছর। কাজেই তিনি যে খুবই ভালো নাচেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যখন ভ্যাঙ্কুভারে প্রথম আসেন, ওখানে নৃত্যশিক্ষার্থীদের নাচ শেখার কোনো সুযোগ ছিল না। উনি এক ভারতনাট্যম শিল্পীকে দিয়ে নাচ শেখার সুযোগ করে দেন অনেকের।

Book 4

এখনো দুর্গা পূজোয় প্রতিদিন পুজোমন্ডপে চন্ডীপাঠ করেন। কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। তাদের সাত বন্ধুর একটা দল আছে।তাদের সঙ্গে দেখা করেন প্রতিবছর যখন কলকাতায় যান। জানুয়ারী -ফেব্রুয়ারী দুমাস দেশে কাটান, তারপর গ্রীষ্মকালে অক্সফোর্ডে চলে যান স্বামী-স্ত্রী।মেয়ে ইউনিভার্সিটি অফ ভ্যাঙ্কুভারে ইংলিশে অধ্যাপনা করে।কাছেই থাকে।ছেলে থাকে ভারমন্টে, জিওগ্রাফিতে অধ্যাপনা করে। বছরে দুবার যান ওদের কাছে, নাতনীর সঙ্গে সময় কাটান।

মন্দাক্রান্তাদিকে দেখার ও তার কথা শোনার সু্যোগ হয়েছিল এইবছর বংগসন্মেলনে বাল্টিমোরে। সাহিত্য সেমিনারে এসেছিলেন নিমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে। খুব অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। ভীষণ মার্জিত, ধীর-স্থির, স্বল্প-বাক এই মানুষটিকে দেখলে বোঝা যায় না যে তিনি এত গুণের অধিকারিনী। আরো রিসার্চ করুন, আরো বই লিখুন, সুস্থ থাকুন এবং আমার মতো অনেক প্রবাসী বাঙ্গালী মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করুন এই কামনা করি।