আমার কথা, সেপ্টেম্বর’১৯

cropped-sahachari-pic-1

গত সপ্তাহে আমাদের পিট্‌সবার্গ বেদান্ত আশ্রমের ১০ বছর পূর্ণ হল। সেই উপলক্ষ্যে মহারাজ শ্রী সর্বদেবানন্দজী মহারাজ (রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন অধ্যক্ষ, উত্তর আমেরিকা) এসেছিলেন হলিউড আশ্রম থেকে। তিনদিন ব্যাপী এই উৎসবে এসেছিলেন অনেক ভক্ত যারা একসময়ে পিট্‌সবার্গবাসী ছিলেন, এখন অন্যত্র থাকেন। মহারাজের বক্তৃতা ছাড়াও ভক্তদের কথা শোনার সু্যোগ হল প্রতিটি সেশনে। কেউ কেউ বললেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব তাদের জীবণে, কেউ  বললেন ঠাকুর কিভাবে জীবণের সবচেয়ে কঠিন সময়ে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বেশ কিছু ভক্ত বললেন বেদান্ত সম্বন্ধে, বেদান্তের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে, বেদান্ত কিভাবে তাদের জীবণে প্রভাব ফেলেছে।রবিবারে ছোট বাচ্ছারা  তাদের বক্তব্য রাখল। খুব ভালো লাগল শুনতে।

স্বামী সর্বদেবানন্দজী বললেন সৎসঙ্গ এবং সাধুসঙ্গ কেন আমাদের জীবণে জরুরী। ওনার প্রতিটি কথা এক্কেবারে মনের গভীরে প্রবেশ করল। যেটি বিশেষভাবে মনে আছে“সাধুসঙ্গে শ্রবণকীর্তনম্‌”। যা শুনবে কীর্তনের মতো। শুনতে শুনতে মনের গভীরে প্রবেশ করবে। আরেকটি কথা “সৎসঙ্গে নিস্তব্ধ, নিস্তব্ধে নির্মোহ, নির্মোহে নিশ্চল তত্ত্বম”। এর মানে হল ভালো সঙ্গ ও ভালো কথা শুনবে, তারপর চুপচাপ শুনে ভাববে, ভাবলে ক্রমশঃ মোহ দূর হবে। এর থেকে পরম সারমর্ম অনুধাবণ করবে।

IMG_7757

ছবি ১ স্বামী সর্বদেবানন্দজী লেকচার

এবারে বেদান্তবাদ নিয়ে কিছু কথা বলবো। মূল বক্তব্য হল ব্রম্ভণ (Supreme power) সবার মধ্যে আছে। আমরা বড় হই ভগবানকে দেখে মূর্তিপূজার মাধ্যমে। কিন্তু যদি এই চিন্তাকে সরিয়ে ভগবানকে সবার মধ্যে দেখতে চেষ্টা করি, সেটা প্রথম প্রথম বেশ শক্ত হবে। বিশ্বাস করা শক্ত আর জীবণে পালন করা আরো শক্ত।যদি শুরু করা যায় এই ভাবনা দিয়ে, তাহলে সেই ভাবনা থেকে উদ্ভুত হয় সবার প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা যা সবরকম জাতিভেদ, সাম্প্রদায়িকতার ওপরে মানুষকে উঠতে সাহায্য করে। একরকমের  Universal Tolerance তৈরী হয়। এই হল বেদান্তবাদ। সারমর্ম হল ভগবান তোমার মধ্যেই আছেন, আছেন প্রতিটি প্রাণীর মধ্যে।“ব্রম্ভ সত্য জগত মিথ্যা” মানের হল ব্রম্ভণ বা আত্মা সত্য, বাকি সব মায়া বা ইলিউশন (illusion)।

বেদান্তবাদের প্রচারক ছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। তার বক্তব্য ছিল রাধা-কৃষ্ণ, জিসাস (Jesus), আল্লা, বুদ্ধ সবাই এক ও অদ্বিতীয় ব্রম্ভের প্রতীক। কাজেই যদি সবাই ভিন্ন ভিন্ন পথ দিয়ে তার কাছে যেতে পারে তাতে কোন ক্ষতি নেই।ঠাকুরের বার্তা স্বামী বিবেকানন্দ সারা বিশ্বে প্রচার করেছিলেন (বেদান্ত ফিলসফি)। যার প্রমাণ আমরা দেখি সারা বিশ্বে অজস্র বেদান্ত সেন্টারে এবং অগণিত ভক্তের মধ্যে।IMG_7761

ছবি ২ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব, পিট্‌সবার্গ আশ্রমে

আমি একজন বেদান্তিন। বেদান্ত মতে বিশ্বাস করি। তবে এই ধারণাকে মানতে ও বিশ্বাস করতে সময় লেগেছে। স্কুলে পড়তে পড়তেই রামকৃষ্ণমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ। বাড়ির সামনেই ছিল Institute of Culture (গোলপার্ক)।যেতাম মাঝে মাঝে। আমার মা ছিলেন ভীষণ ভক্ত।প্রায়ই যেতেন বাগবাজারে শ্রী শ্রী সারদামায়ের বাড়ি। মায়ের সঙ্গে সেই আমার যাওয়া শুরু। এইভাবেই কথামৃত, শতরূপে সারদা পড়াছি। মনে খুব প্রভাব ফেলেছিল। দীক্ষা হল কলেজে পড়াকালীন শ্রী গম্ভীরানন্দজীর  (তখনকার মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ) কাছে। তখন খুব পড়াশুনার চাপ। গুরুদেব বলেছিলেন “যেটা করছো, মন দিয়ে কর”। তাই খুব একটা গুরুসংগ  আর তাঁর কথা শোনার  সুযোগ আমার হয় নি। কিন্তু কোথাও একটা শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস ছিল। এরপর ব্যাঙ্গালোর চলে যাই কলকাতা ছেড়ে। ওখানেও যেতাম আশ্রমে যখনি সময় পেতাম। দেখতাম কিভাবে অগণিত কন্নড় ভক্ত অসীম ভক্তিভরে “খন্ডনভব বন্দনজগ” গাইছে। মনে একটা অবর্ণনীয় আনন্দ নিয়ে হষ্টেলে ফিরে আসতাম। জপ নিয়মিত করতাম। একপর এদেশে অনেকদিন পর পিট্‌সবার্গ শহরে আমার নতুনভাবে যোগাযোগ হল রামকৃষ্ণমিশনের সাথে। কিছু ভক্ত মিলে একটা বেদান্ত গ্রুপ করেছিলেন। তার থেকে তৈরী হল আশ্রম। ২০০৯ সালের ২০ই সেপ্টেম্বর মনরোভিলের ৪১৭ বিয়াটি রোডে একটি বাড়িতে স্বামী সবাহানন্দজীর উপস্থিতিতে। আমার আধ্যাত্মিক তথা স্পিরিচুয়াল জীবণের শুরু হল আবার।অনেক ভক্ত আসেন এখানে। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন সেন্টার থেকে মহারাজরা আসেন। Spiritual Retreat  হয় দু-তিন দিন ব্যাপী। সংসারী মানুষ আমি। পুরো সময় না কাটালেও দু থেকে তিনটে লেকচার শোনার চেষ্টা করি।পরের বেশ কিছু সপ্তাহ ভালোভাবে কাটাবার মনের রশদ সংগ্রহ করে নিয়ে আসি। যখন বেশকিছু সমমনস্ক মানুষ একজায়গায় মিলিত হন, সেটা যে কারণেই হোক না কেন, খুব ভালো লাগে।কিছু সময় ভালো কাটে, মনের পুষ্টি হয়। আশ্রম থেকেই আমার উপনিষদ ও অন্যান্য স্ক্রিপচার (Scripture) পড়া শুরু। আবার সংস্কৃত পড়ার শুরু। সেই স্কুলে পড়েছিলাম। যদিও আজকাল সবকিছুতেই ইংরেজী ট্রান্‌স্লেশন ত্থাকে, তবুও ভাষাটা জানা থাকলে ভালো। আমার সংস্কৃতে বেশী দখল নেই, তবে পড়তে পারি। সবকিছুর মানে বুঝতে অনেক সময়ে ইংলিস ট্রান্‌স্লেশনের প্রয়োজন হয়। অনেক স্ক্রিপ্‌চার পড়ে যখন গীতা পড়তে শুরু করলাম,  তখন মনে হল সবকিছু যেন গীতায় এসে মিশেছে। আমরা রোজকার জীবণে যদি গীতাকে গেঁথে ফেলতে পারি তাহলে আর কিছু পড়া বা বোঝার প্রয়োজন নেই। গীতায় “কর্মের” কথা বলা হয়েছে। সবামীজী বলেছেন “Every action, every idea, every thought can be called Karma”। প্রত্যেক কাজের মধ্যে দিয়েই কর্ম করা যায়, যদিও সেটা আপাতদৃষ্টিতে  ভালো কর্ম বলে নাও মনে হতে পারে। এই ধরণের কর্মের কথাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন গীতায়। স্বামীজী গীতার এই মতবাদকে সমর্থন করেছেন। সবামীজীর মতে একজন মানুষ ভগনানে বিশ্বাসী না হয়েও আধ্যাত্মিক বা স্পিরিচুয়াল হতে পারেন যদি তিনি কর্মে বিশ্বাস করেন এবং ভালো কর্ম করেন।

image 2

ছবি ৩ সর্বদেবানন্দজী কিছু ভক্তদের সাথে আলোচনায়

শেষ করছি  বৃহদারান্যাক উপনিষদ থেকে শান্তি মন্ত্র দিয়ে

অসতো মা সদ্‌গময়ো

তমসো মা জ্যোতির্গমইয়ো

মৃত্যুর মা অমৃতম্‌ গময়ো

ওম্‌ শান্তি শান্তি শান্তি।।

 

অজ্ঞতা থেকে সত্যের পথ দেখাও

অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখাও

মৃত্যু থেকে অমরত্বের পথ দেখাও

ওম্‌, শান্তি শান্তি শান্তি ।।

 

 

 

আমার কথা অগাষ্ট ২০১৯

cropped-sahachari-pic-1

এবার আমার অগাষ্ট মাসের পোষ্ট বের করতে একটু বেশী দেরী হয়ে গেল। তাই আগেই সরি বলে রাখছি। আমার এই মাসের বিষয় হল ডায়াবিটিস। এমনি একটি অসুখ যার প্রকোপ দিনদিন বেড়েই চলেছে। গোটা পৃথিবীতে প্রায় ৪২২ মিলিয়ন (৪২২০ লক্ষ) লোক এবং আমেরিকাতে প্রায় ৩০ মিলিয়ন (৩০০ লক্ষ) লোক এই রোগে আক্রান্ত। সবাই মোটামুটি জানেন রোগটি কেন হয়। তাও আমি ছোট করে এই বিষয়টি নিয়ে লিখছি।

ডায়াবিটিস দুরকমের হয়। টাইপ ওয়ান (Type 1)  ও টাইপ টু (Type 2)। টাইপ ওয়ান ডায়াবিটিস ইন্‌সুলিন হরমোনের অভাবে। এর আরেক নাম জুভেনাইল ডায়াবিটিস (Juvanile Diabetes), কারণ বাচ্ছারা ও বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েরা এতে আক্রান্ত হয় বেশী। তবে হতে পারে যে কোনো বয়সে।  শরীরের প্রতিরোধকারি কোষগুলি (Immune cells) প্যান্‌ক্রিয়াসের ইন্‌সুলিন-সৃষ্টিকারী কোষগুলিকে ধ্বংস করে দেয়। কাজেই শরীরে কোনো ইন্‌সুলিন তৈরী হয় না। এই কোষগুলি রক্তে শর্করা বা গ্লুকোস (Glucose) সেন্স করে ইন্‌সুলিন তৈরী করে। ইন্‌সুলিন হরমোন শরীরের কোষগুলিতে গ্লুকোস ঢুকতে সাহায্য করে। ইন্‌সুলিন না থাকায় গ্লুকোস দেহের কোষে ঢুকতে পারেনা। রক্তে গ্লুকোসের পরিমান বাড়তে থাকে।রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোস ক্রমশঃ শরীরের অন্যান্য অর্গান গুলিকে অকেজো করে দেয়। আস্তে আস্তে চোখের দৃষ্টি, কিডনী, নার্ভ এবং হার্ট কমজোরি হতে শুরু করে এবং অবশেষে কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

টাইপ টু ডায়াবিটিসের প্রাবল্য বেশী। এর আরেক নাম নন-ইন্‌সুলিন-ডিপেন্ডেট ডায়াবিটিস (Non-Insulin- Dependent Diabetes)। সাধারণতঃ পরিণত-বয়স্ক মানুষদের মধ্যে বেশী দেখা যায় (৩৫ বছর বয়সের পরে)।এই রোগে আক্রান্ত মানুষ ইন্‌সুলিন তৈরী করেন কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।অনেক সময় শরীরে ইন্‌সুলিন থাকলেও শরীরের কোষগুলি গ্লুকোস নিতে পারে না- ইন্‌সুলিন রেসিস্টেন্স (Insulin Resistance)। শরীরের ওজন বেশী হয়ে গেলে বা বসে থাকা কাজ হলে, চলাফেরা বেশী না করলে এই রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশী। তবে ডায়েট ও এক্সারসাইস করলে অনেক সময় কমে যায়। এতে কাজ না করলে ওষুধ খেতে হয়। আজকাল অনেক ভালো ওষুধ বেড়িয়েছে এই বিষয়টি নিয়ে অনেক গবেষনার জন্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইন্‌সুলিন ইন্‌জেক্সান নিতে হয়।

আমার এই মাসের সহচরী হলেন ডায়েটিশিয়ান ও সার্টিফায়েড ডায়াবিটিক এডুকেটার (Dietitian and Certified Diabetes Educator) শর্মিলা চ্যাটার্জী। ডায়াবিটিক পেশেন্টদের খাবার ম্যানেজমেন্ট ভীষণভাবে দরকার।এদের রক্তে যাতে শর্করার (সুগার) পরিমাণ না বাড়ে তার জন্য সমানে নজর রাখতে হয়। এখানেই শর্মিলাকে প্রয়োজন। শর্মিলা এই পেশেন্টদের সাথে আলোচনা করেন কিভাবে তারা তাদের ডায়েট কন্ট্রোল করবেন।

খাবারের চার্ট ঠিক করে দেওয়া এক্ষেত্রে ভীষণ জরুরী। এবারের সহচরী ১০  -এ শর্মিলার কথা বলেছি। এবার একটি বইয়ের কথা বলছি। এই বইটিতে অনেক ডায়েটিশিয়ান ও ডায়াবিটিক এডুকেটার একসঙ্গে কাজ করেছেন। বইটির নাম “Indian Foods: AAPI’s Guide to Nutrition, Health and Diabates। শর্মিলা এখানে ভারতীয় মিষ্টি নিয়ে একটি অধ্যায় (চ্যাপ্টার) লিখেছেন।  ভারতীয়দের মধ্যে ডায়াবিটিসের প্রকোপ খুব বেশী। আমাদের খাবার হ্যাবিট, জীবণধারা (lifestyle) ও জেনেটিক্‌স (Genetics) এর কারণ। কাজেই আমার মনে হল এই বইটি যারা নিয়মিত ভারতীয় খাবারে অভ্যস্ত এবং ডায়াবিটিসে ভুগছেন, তাদের খুব উপকারে লাগবে।

Sharmila 3Sharmila book 2

সহচরী ১০/ শর্মিলা চ্যাটার্জী

Sahachari 4

 

 

 

Sharmila 1 ছবি ১ঃ শর্মিলা চ্যাটার্জী

আমার এইমাসের সহচরী হলেন শর্মিলা চ্যাটার্জী। পেশায় ডায়েটিশিয়ান, এবং সার্টিফায়েড ডায়াবিটিক এডুকেটার (Certified Diabetic Educator)। ডায়াবিটিক পেশেন্টদের নিয়ে কাজ করেন। প্রায় ১৯ বছর এই পেশায় আছেন। এবারে তার প্রবাসে এই জীবিকায় প্রতিষ্ঠিত হবার কথা বলব।

শর্মিলার জন্ম জামসেদপুরে। বাবার চাকরীর সুত্রে ম্যাড্রাসে ক্লাস সিক্স ওবধি পড়ে নাগপুরে পাড়ি। ওখানে স্কুলের পড়াশুনা শেষ করে ১৯৮৭ সালে ভর্তি হলেন লেডি অমিতাবাই দাগা কলেজে।বিষয় নিউট্রিশনাল সায়েন্স। বি এস সি পাশ করেন ১৯৯০ সালে। ইতিমধ্যে বাবা বদলী অম্বরনাথ (বম্বের কাছে ছোট শহর)। শর্মিলা মার সঙ্গে ও কিছুদিন কলেজের হস্টেলে থেকে নাগপুরে পড়াশুনা শেষ করলেন।এরপর বম্বে থেকে পরবর্তী পড়াশুনার কথা ভাবলেন। বাবা-মায়ের কাছে অম্বরনাথে থেকে বম্বেতে ডায়েটিটিক্স-এ একবছরের পোষ্ট-গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্স শুরু করলেন। শুরু হল অম্বরনাথ থেকে বম্বে ভিটি (ভিক্টোরিয়া টার্মিনার্স)স্টেশন যাতায়াত করে পড়াশুনা। রোজ দুঘন্টার পথে তার সঙ্গী থাকত তার প্রিয় ক্রাউসের নিউট্রিশনের টেক্সবই (Krawse’s Food, nutrition and diet therapy)। ইতিমধ্যে হঠাৎ বাবা মারা যান। কোর্সের শেষে মাকে নিয়ে নাগপুরে ফিরে এলেন। একটি মন্টেসরি স্কুলে চাকরী নিলেন। নাগপুর ইউনিভার্সিটিতে মাষ্টার্স শুরু করলেন নিউট্রিশনাল সায়েন্স নিয়ে। সকালে বেরিয়ে পড়তেন স্কুলে পড়াতে, ১১টায় স্কুলের শেষে ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস। সন্ধেবেলা ডায়েবেটোলজিষ্ট ডাঃ সরোদ পেন্ড্‌সের চেম্বারে বসতেন তিন ঘন্টা। এক্কেবারে রাতে নিজের কাইনেটিক হন্ডা চালিয়ে বাড়ি ফিরতেন। যথাসময়ে মাষ্টার্স শেষ করলেন। ডাঃ পেন্ড্‌সের উৎসাহে চন্ডীগড়ে এক কনফারেন্সে নিজের পেপার প্রেসেন্ট করেন, বিষয় “Diabetes in Pregnancy: how to manage nutrition”।

১৯৯৫ এর জুলাই-এ বিয়ে হল অলোকরাজ চ্যাটার্জির সঙ্গে। অলোকরাজ তখন পোষ্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ করছেন ইউনিভার্সিটি অফ ভারমন্টে। প্রথম আলাপেই খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন শর্মিলাকে বিদেশে গিয়ে পড়াশুনার জন্য। শুরু হল ভারমন্টে তাদের বিবাহিত জীবন। ইউনিভার্সিটিতে মাষ্টার্সে ভর্তি হতে গিয়ে জানলেন ওরা প্রতিবছর পাঁচটা স্কলারশিপ দেয় কিন্তু সেইসময় কোনো স্কলারশিপ নেই।তাই মেডিক্যাল নিউট্রিশন থেরাপির কোর্স অডিট করতে শুরু করলেন।আবার তার সেই প্রিয় পাঠ্যবই ক্রাউসের টেক্সবই পড়া শুরু হল। খুব ভালোভাবে কোর্স শেষ করলেন। সেইবছর ডিসেম্বর মাসে টরন্টো গেছিলেন। ফিরে এসে শুনলেন ডিপার্টমেন্টে স্কলারশিপ আছে।তবে মাষ্টার্স করা সহজ নয়। এটি একটি ডাইড্যাক্টিক প্রোগ্রাম। তাকে কোর্সের পড়াশুনার সাথে রিসার্চ করে থিসিস্‌ পেপার জমা দিতে হবে। আবার পড়াশুনা শুরু হল, নতুন দেশে, নতুন উদ্দমে। থিসিসের বিষয় হল “Behavior weightloss”। ১২ সপ্তাহের weightloss study চলল এবং একজন সাইকোলজিস্ট নিযুক্ত করতে হল সাবজেক্টদের মানসিক স্বাস্থ্য দেখার জন্য। রিসার্চে ভালো রেসাল্ট পেলেন। ভালোভাবে মাষ্টার্স শেষ করলেন ১৯৯৭ সালের সামারে। এরপর ডায়েটিসিয়ান হয়ে চাকরী করার জন্য কম্পিটিটিভ ইনটার্নশিপের জন্য কাগজপত্র জমা দিলেন। ৭ জায়গায় ম্যাচিং হল।কিন্তু ইতিমধ্যে স্বামী চলে গেছেন চাকরী নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোতে। কাজেই অন্য জায়গায় পেলেও সান দিয়েগো তার চয়েস ঠিক হয়ে আছে। অবশেষে সান দিয়েগোর একটি প্রোগ্রামের সঙ্গে ম্যাচিং হল। এরমধ্যেই থিসিসের জন্য রিসার্চ চলছে।রিসার্চ করে রেসাল্ট পেলে তবেই থিসিস লিখতে পারবেন। ১৯৯৮ সালের জানুয়ারী মাসে সান দিয়েগোতে ইনটার্নশিপ শুরু হল।একবছরের ইনটার্নশিপ। সেইবছরেই মে মাসে ভারমন্টে এসে থিসিস ডিফেন্ড করলেন।সেমিনারে রেজাল্ট দেখে রিভিউ কমিটির চেয়ারম্যান খুব খুশি। তাকে ডায়েটিশিয়ানের কাজ ছেড়ে তখুনি পি এইচ ডি করার জন্য ডাকেন তার ডিপার্টমেন্টে। শর্মিলা খুব অভিভূত হয়েছিলেন।ফিরে এলেন সান দিয়েগোয়। ইনটার্নশিপ শেষ হল ডিসেম্বর মাসে। পরের মাসেই একটি চাকরীর সু্যোগ এল “In Patient Dietitian”। চাকরী পেয়ে গেলেন। কিন্তু ডায়েটিশিয়ান হয়ে প্র্যাকটিস করতে গেলে তাকে রেজিস্টার্ড ডায়াটিশিয়ানের (Registered Dietitian, RD) পরীক্ষা দিতে হবে। তখন তিনি প্রেগন্যান্ট। বাচ্ছার হবার দিন ১৯ শে এপ্রিল, পরীক্ষা ছিল ১৭ই এপ্রিল। ভেবেছেন ভালোই তো! পরীক্ষা দিয়েই বাচ্ছা হবে। কিন্তু তাদের প্রথম সন্তান অঙ্কুশ এসে গেল আগেই, ১১ই এপ্রিলে। তার ঠিক ছয়দিন বাদেই পরীক্ষা দিতে গেলেন ও পাশও করলেন। এভাবে একই সঙ্গে তার মাতৃত্ব ও কেরিয়ার শুরু হল।এই ডায়েটিশিয়ানের চাকরী তার ভালোই লাগে। বরাবরই লোকজনের সঙ্গে মিশতে, কথা বলতে ভালোবাসেন। এই প্রফেশনে পেশেন্টদের সঙ্গে ভালোই কথাবার্তা বলতে হয়।

Sharmila 2

ছবি ২ঃ বংগসন্মেলনের হেলথ ফেয়ারে

২০০৫ সালে নামের সাথে আরেকটি ডিগ্রি যুক্ত হল, Certified Diabetes Educator (CDE)। এই এডুকেটারদের দেখাতে হয় যে তারা ১০০০ ঘন্টা ডায়াবিটিক পেশেন্ট দেখেছেন ৫ বছরে।এই প্রফেশনালরা ডায়াবিটিক লোকেদের কেয়ার ও সেল্‌ফ ম্যানেজমেন্ট এডুকেশন দিতে পারেন।উদাহরণ হিসেবে বলি যারা ইনসুলিন পাম্প ব্যাবহার করেন তাদের ট্রেনিং দেওয়া যাতে  ইনসুলিনের পরিমান বাড়াতে বা কমাতে পারেন; ক্রমাগতঃ গ্লুকোস মনিটারিং (Continuous Glucose Monitoring) করার ট্রেনিং দেওয়া; যারা ওষুধ দিয়ে ক্ষিদে কমানোর চেষ্টা করছেন, তাদের ট্রেনিং দেওয়া যা কিভাবে মেডিকেশন নিতে হবে ইত্যাদি। ভালোই চলতে লাগল কাজকর্ম। ২০১৩ স্বামীর চাকরীসুত্রে টরন্টোয় চলে যা্ন শর্মিলা। ক্যানাডায় গিয়ে আর চাকরী করেন নি। নিজের একটি ওয়েব-সাইট (Web site) খুলে কন্‌সাল্‌টেন্‌সি করতেন।ক্যানাডায় তার CDE-র লাইসেন্স ট্রান্সফার করা সম্ভব হয় নি।

২০১৭-তে বড়ছেলে ইউ এস এ (USA) তে কলেজে ভর্তি হল। তারাও সপরিবারে এলেন শিকাগোতে। শর্মিলা আবার তার প্রিয় প্রফেশনে ফিরে এলেন। যোগ দিলেন আউটপেশেন্ট ডায়াবিটিক এডুকেটর হিসেবে  শিকাগোর নর্থ শোর ইউনিভার্সিটি হেল্‌থ সিস্টেমে (North Shore University Health System)। এখানে এন্ডোক্রিনোলজি (Endocrinology) অফিসে কাজ। তিনি একটি বড় গ্রুপের সঙ্গে কাজ করেন। প্রায় ১৫-১৬ জন এন্ডোক্রিনোলজিস্ট (Endocrinologist), সঙ্গে বেশ কয়েকজন নার্স, এবং তার মতো আরো দু-তিন জন সার্টিফায়েড ডায়াবিটিক এডুকেটর। সারাদিনে তাদের গ্রুপ প্রায় ৫০-৫২ জন পেশেন্ট দেখে। প্রত্যেক মাসে তাদের প্রায় ৩০০০-৪০০০ পেশেন্ট দেখতে হয়।

চাকরী ছাড়াও শর্মিলা ADA (American Diabetic Association) এবং AADE (American Association of Diabetic Educator) – মেম্বার দীর্ঘদিন ধরে। বহু কনফারেন্সে পেপার প্রেসেন্ট করেছেন। একটি বই-লিখেছেন (Indian Foods: AAPI’s Guide to Nutrition, Health and Diabetes) এছাড়াও তিনি SAHELI (South Asian Heart and Lifestyle Initiative) -র সঙ্গে যুক্ত। সাউথ এশিয়ানদের, বিশেষ করে ভারতীয়দের মধ্যে ডায়াবিটিস এবং হার্টের অসুখ বেশী দেখা যায়।

Sharmila 3

বরাবরি তিনি মানসিক ভাবে শক্ত-পোক্ত। সেই অল্প বয়সে বাবা  মারা যাবার পর থেকেই স্ট্রাগল শুরু হয়েছে। দেখেছেন মাথার উপর বাবা না থাকায় জীবণে নানা বাধা-বিপত্তি আসতে। তিনি চেষ্টা করেছেন মাকে আগলে রাখতে। বরাবর-ই তিনি খুব করিতকর্মা এবং সাহসী। শর্মিলার কথায় “Go Getter”। ব্যাক্তিগত জীবনে খুব Outdoor activities করতে ভালোবাসেন। বেড়াতে ভালো লাগে। বড় ছেলে অঙ্কুশ কলেজে, ছোট ছেলে আয়ুষ হাই স্কুলে এবং স্বামী অলোকরাজকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। ইচ্ছে আছে রিটায়ার্ড হয়ে দেশে গিয়ে ফ্রি ক্লিনিকে কাজ করবেন।

 

ছবি ৩ঃ এই বইতে লিখেছেন শর্মিলা

শর্মিলার সঙ্গে কথা বলে এই প্রফেশনটির সম্বন্ধে জানলাম। কত ভাবে মানুষের সেবা করা যায় তার একটা ধারনা হল। ডাক্তার-নার্সদের পাশাপাশি এই প্রফেশনের লোকেরাও প্রতিদিন  মানুষের সেবা করে চলেছেন যারা ডায়াবিটিসে আক্রান্ত।শর্মিলার নিজের কথায় “One day at a time. Live for today, don’t think about tomorrow”।

আমার কথা জুলাই ২০১৯

 

cropped-sahachari-pic-1সাহিত্য সভা/ ৩৯তম উত্তর আমেরিকা বঙ্গ সন্মেলন, বল্টিমোর, মেরীল্যান্ড, ৫-৭ই জুলাই, ২০১৯

২০১৯ এর  নর্থ আমেরিকা বঙ্গ সন্মেলন হয়ে গেল বাল্টিমোর কনভেন্‌শন সেন্টারে গত ৫-৭ই জুলাই। অন্যান্যবারের মতো এবারো সাহিত্য সন্মেলন হয়েছিল দুদিন ধরে চারটি সেশনে- শনি ও রবিবার। দেশের ও প্রবাসের বেশ কিছু সাহিত্যিক ও কবিরা এসেছিলেন। শ্রোতার আসরে ছিলেন অনেক সাহিত্য-প্রেমী মানুষ।আলোচনা, বইপাঠ, প্রশ্নোত্তর ও মন্তব্যে বেশ জমে উঠেছিল দুদিনের এই সাহিত্য সভা।

সেশন ১ “ভুবন জোড়া আসনখানি, বাংলা ও বাঙ্গালী”, ৬ই জুলাই

Session 1

 

উপস্থিত ছিলেন শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, মন্দাক্রান্তা বসু, নবকুমার বসু, বীথি চট্টোপাধ্যায় ও কুশনাভ চৌধুরী। এই সেমিনারটির সঞ্চালক ছিলেন ডাঃ যশোমান ব্যানার্জী। সবাই একটু একটু করে তাদের বক্তব্য রাখলেন। শ্রীজাত আর স্বপ্নময় দুজনেই বাঙ্গালী মনিষীদের সম্বন্ধে বললেন।মেঘনাথ সাহা, প্রশান্ত মহলানবিশ, সুভাষ চক্রবর্তী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়- এদের সকলের সম্বন্ধে আলোচনা করলেন। স্বপ্নময় শেষ করলেন বলে যে বাঙ্গালী সারা বিশ্বে আছে, শুধু বাংলা খাবার সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া যায় নি। খেজুর গুড়ের কথা সারা বিশ্ব জানে না।

Session 1 image

কুশনাভ চৌধুরী এবারের বংগসন্মেলনে নতুন মুখ।পেশায় সাংবাদিক কুশনাভ সম্প্রতি (২০১৮) “The Epic city: world on the streets of Calcutta” নামে একটি বই লিখেছেন। কুশনাভর জন্ম এদেশে। বার বছর বয়সে দেশে ফিরে যান। তারপর এসেছেন কয়েকবার এবং ডক্টরেট করেছেন এদেশে, বর্তমানে স্টেট্‌সম্যান পত্রিকায় চাকরী করেন। বইপড়ুয়া এই মানুষটিকে প্রভাবিত করেছেন স্পানিষ লেখক  হোরহে লুইস বোরজেস (Jorge Luis Borges) ও  লেখক  সৈয়দ মুজতবা আলী।“দেশে বিদেশে”-র কথা বিশেষ ভাবে বললেন। মুজতবা আলীর লেখার মধ্যে একটি আড্ডা বা মজলিশের পরিবেশ এসে যায়- যেটির কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করলেন। একই সুত্রে উল্লেখ  করলেন বোরজেস এর লেখার মধ্যেও এইরকম একটা আড্ডার পরিবেশ থাকতো।

সেশন ২ “সত্ত্বার সন্ধানে”, ৬ই জুলাই। উপস্থিত ছিলেন স্বপ্নময় চক্রবর্তী, শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় ও নবকুমার বসু।এখানে প্রত্যেকেই এই বিষয়ে তাদের বক্তব্য রাখলেন। স্বপ্নময় চক্রবর্তী তার “হলদে গোলাপ” এর বিষয় নিয়ে বললেন। ২০১৫ সালে আনন্দ পুরস্কার পাওয়া এই উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল ট্রান্সজেন্ডার (Transgender)  নিয়ে। “আমি কে? আমি বিভিন্ন মানুষের কাছে বিভিন্ন, যে যেভাবে চেনে” -এই উক্তিটি বেশ মনে ধরলো।তিনি বললেন নানা রকমের মানুষের কথা বলে উল্লেখ করলেন সেই মানুষদের কথা যারা শরীরে পুরুষ ও মনে মেয়ে।এই প্রসঙ্গে তার প্রায় ১০-১২  বছরের রিসার্চের ফল এই উপন্যাসটি।তিনি বরাবরি সাহিত্য ও বিজ্ঞানের মধ্যে একটা যোগাযোগ করতে চেয়েছেন। “হলদে গোলাপ” এই দুয়ের যোগসুত্র স্থাপনের একটা এক্সপেরিমেন্ট।

Session 2 image 1

শ্রীজাত সম্বন্ধে আলাদা করে বলার অবকাশ রাখে না। তার লেখা “উড়ন্ত সব জোকার” ২০০৪ সালে কৃত্তিবাস পুরস্কার পায়। তিনি দুই সত্ত্বার টানাপোড়েন নিয়ে লেখা “তারা ভরা আকাশের নীচে” উপন্যাস থেকে কিছু অংশ পড়লেন। বিজ্ঞাপন সংস্থার কর্ণধার নায়ক আর তার অন্য সত্ত্বা (যে চিত্রকার হতে চায়) এই দুইয়ের সংঘাত প্রকাশিত হয়েছে শ্রীজাত র কলমের আঁচড়ে। ক্রমশঃ গল্পের নায়ক হ্যালুসিনেট করতে শুরু করে এবং এই সময়ে সে ভিন্‌সেন্ট ভ্যান গঁগ কে তার সামনে দেখে এবং তার সঙ্গে কথা বলে।বেশ ভালো লাগলো-এই উপন্যাসের অংশটি শুনে।

সাহিত্যিক নবকুমার বসু ঔপন্যাসিক সমরেশ বসুর পুত্র।ইউনাইটেড কিংডম (UK)- বাসী ও পেশায় ডাক্তার। ওনার লেখা “চিরসখা” তিন বছর ধরে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছে।তিনি তার লেখা উপন্যাস “তোমার আঁধার তোমার আলো” রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথের সত্ত্বার টানাপোড়েন তুলে ধরেছেন। প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি এই তিন সাহিত্যিকের তিনটি বই মুক্তধারাতে পাওয়া যাবে।

সেশন ৩ “নারী ও শক্তি”, ৭ই জুলাই। উপস্থিত ছিলেন মন্দাক্রান্তা বসু, শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়, বীথি চট্টোপাধ্যায় ও আনিস আহমেদ। এখানে এদের সম্বন্ধে একটু বলি।

মন্দাক্রান্তা বসু ব্রিটিস কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এমেরিটাস প্রফেসর। ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া গবেষণা বিভাগের ডিরেক্টর। নাচেও পারদর্শী। “Classical Indian Dancing”,  “Movement and Mimesis: the idea of  Dance in Sanskritic Tradition” , এবং “নর্তননির্নয়” তার লেখা বই।এছাড়াও তার অনেক রচনা প্রকাশিত হয়েছে।

এবারে আসি বীথি চট্টোপাধ্যায়ের কথায়। কলকাতার অন্যতম কবিদের মধ্যে একজন।প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে দেশ  পত্রিকায়। ক্রমে ছোট গল্প ও উপন্যাস লেখেন। “প্রিয়বন্ধু”, “কলকাতা”, “দাঁড়াও পথিকবর” বীথির উল্লেখযোগ্য কবিতা।

আনিস আহমেদ কবি। গত পঁচিশ বছর ধরে প্রথমে বিবিসি ওয়াল্ড (লন্ডন)ও পরে ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। বেশ কয়েকটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে “শব্দ ও নৈঃশব্দের সুর” “আলোকিত পালকের জলবিন্দু” ইত্যাদি।

এদের চারজন এবং সমবেত শ্রোতামহলীকে নিয়ে দ্বিতীয় দিনের সাহিত্যসভা বেশ জমে উঠেছিল।

সেশন ৪ “প্রবাসে বাঙ্গালীর সাহিত্য চিন্তা” ৭ই জুলাই। উপস্থিত ছিলেন কৌশিক সেন,  কুশনাভ চৌধুরী, অমৃতা মুখার্জী, রুদ্রশংকর, আনিস আহমেদ, তাপস রায় ও বীথি চট্টোপাধ্যায়।

এখানে কয়েকজনের সম্বন্ধে একটু বলে রাখি। প্রথমে রুদ্রশংকরকে দিয়ে শুরু করি। সমকালীন কবি। এপার ও ওপার বাংলার মানুষ তার লেখা পড়ে থাকেন।তার লেখা কবিতার সাতটি কবিতার বই ভারত ও বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৬-এ ভাষানগর পুরস্কার এবং ২০১৯ এ “টার্মিনাস বই পার্বন” পুরস্কার পান।

“ঘর খোঁজা সন্ধ্যারা” কবিতা বই-এর লেখক তাপস কুমার রায় প্রবাসী কবি এবং আর্টিষ্ট। দেশ, কৃত্তিবাস ও দুকুল পত্রিকায় তার লেখা কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

পেশায় ডাক্তার  প্রবাসী কৌশিক সেনের নেশা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা। মৌলিক নাটক লিখেছেন ও অভিনয় করেন।দেশ, আনন্দবাজার, সানন্দা, পরবাস ইত্যাদিতে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

প্রবাসী অমৃতা মুখ্যার্জী পেশায় ডাক্তার এবং লেখিকা। এই পর্যন্ত তার ৬ টি গল্প ও কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে এবং জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

Session 4 image 1

এবারে আসি এই সাহিত্যসভার আলোচ্য বিষয় নিয়ে। বেশ জমে উঠেছিল সভাটি।প্রবাসীদের কাছে বড় প্রশ্ন যে “পরের প্রজন্ম কি বাংলা সাহিত্য চর্চা করবে প্রথম প্রজন্মের মতো? তারা কি ভাববে বাংলা ভাষা নিয়ে?” কুশনাভ-এ মতে “পরের প্রজন্ম বাংলা ভুলে যাবে কারণ ভাষার প্রতি আকর্ষণ আমরা তৈরী করিনি”।

এই প্রসঙ্গে কথা উঠল কিভাবে আকর্ষিত করব? ভালো মাধ্যমের সাহায্যে যদি আমরা সাহিত্যিক ও কবিদের ওদের কাছে পৌছে দিতে পারি।ফিল্ম বা সিনেমা সবাই দেখে। ভালো ফিল্ম তৈরী করতে পারলে নিশ্চয়ই দেখতে এবং জানতে আগ্রহী হবে।

ট্রান্সশ্লেসনের কথা উঠল। তবে একটা লেখার সম্পূর্ণ ট্রান্সশ্লেসন হয়তো করা সম্ভব নয়। ভাষাটা না জানলে একটি রচনা সম্পূর্ণভাবে অনুভব করা হয়তো যায় না। ট্রান্স-ক্রিয়েশন- একটা নতুন ফর্ম তৈরী হয়েছে। এই বিষয়ে আলোচনা হল।

তবে যদি বাংলা আর ইংরেজী দুটোতেই লেখা যায়? প্রচেষ্টা হয়েছে। দুকুল ম্যাগাজিন তার প্রমাণ। কিন্তু আবার সেই চেষ্টা ব্যার্থ হয়েছে সময়োপচিত সাপোর্টের অভাবে।  প্রবাসীদের এখন সময় এসেছে ভাববার এই বিষয়টি নিয়ে।

Session 4 image 5

শেষদিনের এই সাহিত্যসভার রেশ নিয়ে লেখাটি লিখে ফেললাম। আশাকরি আরো বাংলা সাহিত্যপ্রেমী মানুষ আসবেন তাদের নতুন ভাবনা নিয়ে। নতুন চিন্তা-ভাবনার সময় এসেছে।

সহচরী ৯ রোজমেরী মিতু রিবেইরো

Sahachari 4Mitu 5

 

 

জুলাই মাসের সহচরী হলেন মেরীল্যান্ডবাসী রোজমেরী মিতু রিবেইরো। বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতিক ডেলিগেট হয়ে বিদেশে নৃত্য পরিবেশন করেছেন একাধিকবার। ফোক্‌ড্যান্স করেন, এদেশে এসেও নাচ বন্ধ হয়নি। নিজের একটি নাচের স্কুল আছে, এবং ডেলি ও পাব (গিলিস্‌) একাই চালান। নাচ তার ভালোবাসা, Early Childhood Education নিয়ে  পি এইচ ডি করছেন। এহেন একটি সাহসী মেয়ের গল্প এবার আপনাদের কাছে বলব, তবে শুরু করতে হবে রোজমেরীর ছোটবেলা থেকে।

রোজমেরীর জন্ম পুরোনো ঢাকা লক্ষীবাজার অঞ্চলে।দুই ভাই, দুই বোন-সবচেয়ে ছোট মিতু।বাবা ছিলেন সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের অ্যাসিন্টেট ভাইস্‌ প্রিন্সিপ্যাল।এই স্কুলে তার দাদারা পড়াশুনা করেছে। মিতু আর তার দিদি পড়েছেন সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার হাই স্কুলে। ছোটোবেলা থেকেই নাচ তার ভালো লাগে। চার বছর বয়স থেকেই নাচের শুরু। ১৯৭৭ সালে ৭ বছর বয়সে জাগো আর্ট সেন্টারে তার নাচের প্রশিক্ষণ শুরু হল। তারপর আর থামেন নি। ১২ বছর ধরে শিখেছেন লোকনৃত্য (প্রধান), ভারতনাট্যম, কত্থক, মণিপুরী নাচ।লোকনৃত্যের গুরু গওহর জামিল। গুরু ১৯৮১ সালে পথ-দূর্ঘটনায় মারা যান। ভারতনাট্যম শিখেছেন বিলায়েত হোসেন খানের কাছে আর কত্থকের গুরু শ্রী নিকুঞ্জবিহারী পাল।

Mitu 2

মিতুর নাচের অনপ্রেরণা হলেন তার মা। মায়ের একান্ত ইচ্ছা আর উদ্যমে মিতুর নাচের জীবণে প্রবেশ সেই ছোট্টবেলা থেকে। দিদি গান গাইতেন, ছায়ানটের ছাত্রী, বড়দাদা গিটার বাজাতেন আর ছোটভাই তবলায়। পুরো পরিবারটি সুর, লয়, তাল, নাচ ও গানে মেতে উঠতেন।

এখানে শিশুশিল্পী হিসেবে মিতুর কিছু পুরস্কার প্রাপ্তির কথা বলি।১৯৭৭ সালে ঢাকা বেতারকেন্দ্রের ২৫ বছর জুবিলীতে শিশু-শিল্পীদের লাইভ নৃত্যনাট্য পরিবেশিত হয়। এখানে মিতু বিশেষ পুরস্কার পান শিশুশিল্পী হিসেবে।এছাড়াও বেতারে “কলকাকলীর আসর” নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন শিশুশিল্পী হিসেবে। এরপর ১৯৮১ তে জাতীয় নাট্য প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী, ১৯৮৬ সালে কত্থকে বাংলাদেশ জাতীয় শিশু পুরস্কার পান। এই প্রতিযোগিতা পাঁচটি পর্যায়ে হয়েছিল- জেলা, উপজেলা, আঞ্চলিক, বিভাগ ও জাতীয়।

এদিকে পড়াশুনা চলেছে জোরকদমে। ম্যাট্রিক পাশ করে উইমেন্স্‌ ফেডারেশন কলেজে কমার্সে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি এ পাশ করে মাস্টার্স করেন আকাউন্টিং এর ওপর। ইতিমধ্যে তিনি সরকারী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ টিভির এনলিষ্টেড আর্টিষ্ট। নিয়মিত প্রোগ্রামের জন্য ডাক পান। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাপানে ওকায়ামা ইন্টারন্যাশন্যাল ফেষ্টিভ্যালে ১৫ দিন লোকনৃত্য পরিবেশন করে্ন। ১৯৯৩তে সাউথ কোরিয়া যান সরকারের পক্ষ থেকে  ফেস্টিভ্যাল এক্সপো ৯৩। ১৯৯০-১৯৯৪ সার্ক কনফারেন্স ও সার্ফ গেম্‌স সরকারী নৃত্যশিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন।

এদেশে এলেন ১৯৯৫ এর শুরুতে, বিয়ে হল। নাচ চলতে লাগল। যখন যেখানে সু্যোগ পান, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন, অন্যদের নাচ শেখান আর মনে আনন্দ পান। ১৯৯৮  সালে বড়ছেলে হল। ইতিমধ্যে ২০০০ সালে এম বি এ করলেন ডাউলিং কলেজ (Dowling College)।২০০২ তে ছোটছেলে এল। ইতিমধ্যে Early Childhood Education  এ degree নিয়ে Little Sunshine Learning Center  খুলে ফেললেন বাড়িতেই। বেশ কিছুদিন চলল। ইতিমধ্যে ২০০৭ সালে Education  এ Ph.D র কাজ করতে শুরু করেন Walden University। সে কাজ এখনও শেষ হয়নি। ২০১৩ এ আবার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে  Johns Hopkins University তে Program Quality Control Specialist হিসেবে ২ বছর কাজ করেন। ২ বছর Childcare Center এর Director হয়ে কাজ করেছেন। ব্যাক্তিগত জীবনে ২০১০ সালে মাকে হারান। মা ছিলেন তার সবকিছুর প্রেরণার মূলে। Ph.D শুরু করা মার উৎসাহে। ২০১৮ তে বাবাও চলে গেলেন।

মিতুর নাচের স্কুলের নাম সৃষ্টি। এই নাচের স্কুলটির মূখ্য উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশের লোক-নৃত্য এবং সংস্কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সংরক্ষণ করা। এছাড়াও তাদের বিভিন্ন নাচ সম্বন্ধে প্রশিক্ষণ দেওয়া। ২০১০ থেকে নাচের প্রোগ্রাম করেছে সৃষ্টি স্কুল। ২০১৬ তে “Peace through dance” প্রোগ্রামটি বেশ সুনাম অর্জন করেছিল।

Mitu 6

এবার আসি রোজমেরীর জীবনের বর্তমান পর্বে। ইচ্ছা হল নিজের বিজনেস করবেন। এ ব্যাপারে অনেক ভেবেচিন্তে ২০১৮ র নভেম্বর মাসে Gilly’s deli and pub এর বিজনেস take over করলেন। এই পাবটির অনেক পুরোনো customer/patron আছেন যারা নিয়মিত আসেন এবং এই ডেলি ও পাবটিকে ভালোবাসেন। এর আরেকটি কারণ হল রোজমেরী বিজনেসটি কেনার পর খুব একটা অদল-বদল করেন নি। ম্যানেজার এবং পুরোনো কর্মীরা সবাই কাজে বহাল আছেন। কাজেই যারা আগে আসতেন মালিকানা বদলের আগে, তাদের কাছে পাবটি আছে আগের মতোই, এমনকি মেনুও। আমার Gilly’s এ গিয়ে Cheers  টিভি সিরিয়ালটির কথা মনে পড়ে গেল। একদম সেইরকম আন্তরিক পরিবেশ আর আছে একটা কিছু যা Gilly’s এর নিজস্ব। গত ছয় মাসের মধ্যে Blackflag  এর সঙ্গে collaboration এ বেরিয়েছে “Celebrew” এটা Gilly’s -এর নতুন ব্র্যান্ড। 6.8 HPA  টেষ্টলেভেল,  যা সবাই খুব পছন্দ করে। এই প্রথম নিজের ব্র্যান্ডের কিছু বার করে খুব আনন্দ পেয়েছেন রোজমেরী এর আগে কখনো Gilly’s এর নিজস্ব কিছু বেরোয়নি। কাজেই এর মধ্যে Creativity -র একটা আনন্দ তো আছেই। এখানে মূলতঃ Craft Beer  (tap beer) ,Can  beer, Wine, Vegetarian wine  পাওয়া যায়। এদের ডেলির স্যান্ডুইচ নিজস্ব।খুব নাম আছে।

Mitu 3

এইপ্রসঙ্গে একটু বিয়ার সম্বন্ধে বলে রাখি। বিয়ার তৈরী করাকে বলে ব্রিউয়িং। মল্ট কে প্রথমে ছোট ছোট টুকরোতে ভেঙ্গে, তার সঙ্গে এন্‌জাইম মিশিয়ে কিছুদিন রাখা হয়। তারপর ইষ্ট (Yeast) দিয়ে ফারমেন্টেশন ভ্যাট (Fermentation Vat) -এ রাখা হয়। এর সঙ্গে মেশানো হয় হপ্‌স (Hops)  নামে একধরণের লতানো গাছ (vine)। হপ্‌স-এর অ্যান্টি- ব্যাকটিরিয়াল গুণ ব্যাকটিরিয়া জন্মাতে দেয় না ভ্যাটের মধ্যে। আর আছে হপ্‌স -এর বিশেষ কেমিক্যাল যা বিয়ারের স্বল্প তেঁতো স্বাদের কারণ। নিউ বেলজিয়াম ব্রিউয়িং কম্পানির বিয়ার তৈরীর এক নতুন উপকরণ হল হেম্প (Hemp)। উদাহরণ হিসেবে যদি বলি Hemperor HPA is 7% HPA , তাহলে মানে হল এটা এক ধরণের পেল এল (Pale Ale) ব্রিউ করা হয় হপ্‌স (এক ধরণের গাছ, যেটি দিয়ে ওয়াইন ও বিয়ার ব্রিউ করা হয়) ও হেম্প দিয়ে। এবারে বলি “পেল এল” এর কথা।এটি এক ধরণের বিয়ার তৈরী হয় “পেল মল্ট” থেকে যাতে মল্ট ও হপ্‌স সমান অনুপাতে থাকে।যেমন, IPA, India Pale Ale, এক ধরণের হপ্‌স সমৃদ্ধ বিয়ার “পেল এল” জাতীয় বিয়ারের মধ্যে পড়ে। আরো আছে, Double IPAs, Imperial IPAs, অ্যালকোহল ৭.৫%।

Mitu 1aগিলিস্‌ পাবে HPA, IPA জাতীয় প্রচুর বিয়ারের স্টক আছে যার জন্য বিয়ারপ্রেমীরা নিয়মিত আসেন তাদের এই প্রিয় পাবে বিয়ার পান করতে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডার স্বাদ নিতে। এছাড়াও মিতু তার পাবের কর্মীদের নিয়ে শুরু করেছেন Celebrew Outdoor Celebration। যা বিক্রী হয়, তার ১০% যায় অন্ধদের সাহায্যে জন্য। আরেকটি Outdoor Activity হল Oktoberfest , একটি ফেষ্টিভ্যালের মতো। এটি তার পাবের পুরোণো Patron দের অনুরোধে নতুন শুরু হয়েছে- বিয়ার আর মিউজিসিয়ানদের নিয়ে Outdoor fun। এছাড়াও গিলিস্‌-এর নিজস্ব ওয়েবসাইট, ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রাম (Website, Facebook, Instagram)আছে। এখানে কিছু বিয়ারপ্রেমী মানুষ আসেন যারা প্রত্যেকে ডক্টরেট করেছেন বিয়ার ব্রিউয়িং এর ওপর। এরা এখানকার স্থানীয় খবরের কাগজে তারা নিয়মিত লেখেন মেরীল্যান্ড ও বাইরের ব্রিউয়ারী সম্বন্ধে। প্রত্যেক মাসের দ্বিতীয় সোমবার তারা মিলিত হন তাদের এই প্রিয় পাবে কিছুক্ষন সময় কাটাতে। গিলিস্‌ এর নিজস্ব ওয়াইন ক্লাস হয়(Wine class) প্রত্যেক quarter-এ। মিতু জানালেন একটি দম্পতির কথা। তাদের প্রথম আলাপ এই পাবে, পরে বিয়ে করেছে এবং এখনো আসে এই পাবে। মিতুর কথায় গিলিস্‌ একটি ঘরোয়া, ফ্রেন্ডলি ডেলি ও পাব যেখানে কর্মীরা খুব সমঝদার এবং রেগুলার প্যাট্রনদের তাদের নামে চেনে।

এতক্ষণ বলছিলাম মিতুর কথা। এবার শেষ করার আগে তার ছেলেদের কথা একটু বলি। ছেলেরা বড় হয়ে গেছে। বড়ছেলে কলেজে আর ছোটছেলে সামনের বছর হাইস্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েট করবে। দুইছেলেই আমেরিকান ফুটবল, বাস্কেটবল খেলে। বড়জন তাইকোওনডু তে 3rd degree blackbelt, ছোটজন 2nd degree blackbelt। মিতুর পরিবারের সবাই (দুই দাদা ও দিদি) মেরীল্যান্ডবাসী। বাবা ও মা মৃত্যুর আগে ওবধি মেরীল্যান্ডেই বাস করেছেন।

মিতুর সম্বন্ধে আগেই শুনেছিলাম। কথা বলে আরো অনুপ্রাণিত হলাম।মিতুর কথায় নাচ তার প্যাশন, এডুকেশন নিয়ে পি এইচ ডি করছেন, এরি পাশাপাশি বিজনেস ‘গিলিস্‌” চলছে। আমার এই সহচরীর জন্য আমার একান্ত শুভেচ্ছা রইল।

সহচরী ৮, রীতা কর্মকার

Sahachari 4

সহচরী ৮ রীতা কর্মকার

আন্তর্জাতিক মিউসিক দিবস ছিল গত শনিবার। এটা জুন মাস। এই মাসের সহচরী হলেন ক্যালগরিবাসী রীতা কর্মকার। রীতার খবর আমি পাই আমার বন্ধু কাকলির কাছে।  এম বি এ রীতার নিজের একটি কন্‌সাল্টিং ফার্ম আছে।এছাড়াও প্রসিদ্ধ গানের শিল্পী, সুরকার, গানের স্কুল আছে এবং মিউসিক ইনস্ট্রাক্টার (Instructor)। রীতা স্ত্রী এবং মা। এক্কেবারে দশভুজা। নাঃ এভাবে না, রীতার সম্বন্ধে বিস্তারিত জানলে তবেই আপনারা বুঝতে পারবেন কেন আমি রীতাকে দশভুজা বললাম।

রীতার জন্ম ঢাকায়। বাবা ছিলেন গভর্ন্মেন্ট চাকরীতে। অনেকবার চাকরীসুত্রে বদলী হয়েছেন।ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে গানের পরিবেশ ছিল। ওস্তাদজী আর তবলাবাদকের সঙ্গে গানের চর্চা চলত। তারপর মা একদিন জোর করে ভর্তি করে দিলেন প্রসিদ্ধ গানের স্কুল “ছায়ানট”-এ। রীতা তখন কার্টুন দেখতে ভালোবাসেন। বেশ রেগেমেগেই গেলেন গান শিখতে। কিন্তু সেই তার গানের জগতে প্রবেশ। ছায়ানটে শিখেছেন ৭ বছর। ট্রেনিং শেষ করে প্রসিদ্ধ সাংস্কৃতিক যোদ্ধা ও বিশ্বভারতীর পি এইচ ডি সঞ্জিদা খাতুনের হাত থেকে উত্তরীয় ও রবীন্দ্রসঙ্গীতে সার্টিফিকেট নিয়ে রীতার যাত্রা শুরু হল গানের জগতে গায়িকা হিসেবে।

গানের পাশে পাশে পড়াশুনা কিন্তু থেমে থাকেনি। ভারতেশ্বরী রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে ক্লাস এইট থেকে ক্লাস টুয়েল্ভ ওবধি পড়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে বিজনেস আডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে পড়াশুনা করেন। স্কুল থেকেই সংগঠন করে প্রোগ্রাম করেছেন। ইউনিভার্সিটির স্যোসালে ডিপার্টমেন্টের ছোট অর্গানাইজেসনের হয়ে প্রোগ্রাম করেছেন। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে বি কম (Honors) ও এম কম পাশ করলেন। ২০০০ সালে প্রথম ক্যানাডায় আসেন। এখানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালগরিতে  ১৪ বছর ইঞ্জিনীয়ারিং কেরিয়ার সার্ভিসেস-এ চাকরী করেন। এখান থেকে এম বি এ করে নিজের কন্সাল্টিং ফার্ম খোলেন।

রীতা ক্যালগরির মাউন্ট রয়াল ইউনিভার্সিটির ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল মিউসিকের ইনস্ট্রাক্টার। এছাড়াও ইঊনিভার্সিটি অফ ক্যালগরির ডিপার্টমেন্ট অফ  ক্ল্যাসিক আন্ড রিলিজিয়নের ইনভাইতেড স্পিকার হিসেবে মিউসিক এভোলিউসানের (Evolution) ওপর লেক্‌চার দেন প্রতিবছর। বিষয়টা হল কিভাবে সুরে্র উদ্ভব হল সামবেদের স্ত্রোত্রপাঠের সুর আর ছন্দ থেকে বর্তমান মিউসিকে।

২০০০ সালে ক্যালগরিতে প্রথম গানের জগতে প্রবেশ SILPA(School of Indian Language and Performing Arts) সংস্থাতে ভলান্টিয়ার টিচার হিসেবে। এখানে ভারতীয় ভাষা, গান, নাচ শেখানোর হয়। রীতা এখানে গানের শিক্ষিকা হিসেবে প্রথমে গানের ক্যারিকুলাম তৈরী করলেন একটা কাঠামো দেবার জন্য।পরবর্তীকালে পারফরমিং আর্টস্‌ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন।

বিদেশে এসেও যে সঙ্গীত হারিয়ে যায় না, তার প্রধান প্রমান রীতা।এখানে বিভিন্ন প্রোগ্রামে গান গাইতে শুরু করলেন।  ১০০ জনকে  নিয়ে “শতকন্ঠে বাংলাদেশ” গানের প্রোগ্রাম পরিচালনা করেন। বঙ্গভঙ্গ থেকে আধুনিক গানের ওপর।এছাড়াও রাগমালা মিউসিক সোসাইটির আমন্ত্রণে আসা পন্ডিত অজয় চক্রবর্তী এবং পন্ডিত যসরাজের সংগে তানপুরায় সংগত করেছেন। ইতিমধ্যে মহারাষ্ট্রের ক্ল্যাসিক্যাল গানের শিল্পী ডাঃ থাট্টে ভাটের কাছে ৫ বছর চালিম নিয়েছেন রীতা। এছাড়াও ছায়ানটের ট্রেনিং তো আছেই।বাড়িতে মিউসিক স্টুডিও করে সবাই কে নিয়ে গান শেখাতে শুরু করলেন।ছাত্র-ছাত্রীরা বাঙালি ও অবাঙ্গালি। বেশির ভাগই দ্বিতীয় প্রজন্ম। আর আছেন কিছু ক্যানাডিয়ান  মিউসিয়ান যারা ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যালের সঙ্গে জ্যাজ্‌ বা ওয়েষ্টার্ন মিউসিকের ফিউসন করতে চান।

ক্যালগরির আর্ট কমন্স্‌ একটি সরকারী সংগঠন যেটি বিভিন্ন ধরনের মিউসিকের একটা প্ল্যাটফর্ম। রীতা এখানে নিয়মিত পারফর্ম করেন। রীতা ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালগরিতে ওয়েষ্টার্ন ক্ল্যাসিক্যালের ওপর কোর্স নিয়েছেন স্টুডেন্ট হিসাবে,  ইষ্টার্ন ও ওয়েষ্টার্ন মিউসিকের তারতম্য ও সংযোগ করতে পারেন। তার এই ইউনিক গুনের জন্য তিনি দুইদিকের মিউসিকপ্রেমীদের কাছে বিশেষ ভালোবাসা ও সন্মান পান।

এবার আমি সুরকার রীতার কথায় আসব। এটাও তার অনেক পরিচয়ের মধ্যে একটা।প্রথম শুরু হয় বাংলাদেশ আসোসিয়েশনের বড় কবি শ্রী মহাদেব সাহার লেখা কবিতা নিয়ে।রিটায়ার্ড হয়ে ছেলের কাছে চলে আসেন এই কবি।অনেক গান লিখেছেন। রীতা তার সঙ্গে তার লেখা কবিতার ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে সুর দিয়েছেন। তৈরী হয়েছে ১০০ র ওপর গান রীতার সুরে।

একবার এক পাকিস্তানী কবি ক্যানাডায় এসেছেন। এদিকে দেশে মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, কিন্তু বাবা তার মেয়ের বিয়েতে যেতে পারছেন না। এই উপলক্ষ্যে একটি শায়রী লিখেছেন, একান্ত ইচ্ছা বিয়েতে মেয়েকে উপহার দেন। রীতা তার কাছে গিয়ে উর্দু শায়রীর কথা বুঝে তাতে সুর দিয়ে, সেই গান নিজে গেয়ে রেকর্ড করে দিয়েছেন। বাবা তার লেখা, রীতার সুর ও গানের সেই শায়রী মেয়েকে যথাসময়ে পাঠান বিয়ের উপহার হিসেবে।

এছাড়াও চলে তার কোলাবরেশনের কাজ।লোকাল মিউসিয়ানদের সঙ্গে মিউসিকের ওপর আলোচনা ও চর্চা চলে। পিয়ানোর নোটস্‌ নিয়ে বিস্তারিত রিসার্চ করে ইষ্টার্ন মিয়সিকের সঙ্গে ওয়েষ্টার্ন মিউসিক মেশান রীতা, যাতে সেই সুরে গান গাওয়া যায়।

মিউসিকে তার অবদানের জন্য ক্যালগরির হিন্দু মন্দিরে গুরুপূর্নিমায় অনেক সিনিয়ার লেভেলের গুরুর সঙ্গে মিউসিক গুরু হিসেবে সন্মানিত হয়েছেন রীতা। মিউসিক কম্পিটিসনে মিউসিক জাজ্‌ হিসেবে নিয়মিত যোগদান করেন।কম্পিটিসনের শেষে বিস্তারিত আলোচনা করেন র‍্যাঙ্কিং এর ওপরে।কিভাবে র‍্যাঙ্কিং করা হল, কেন করা হল ইত্যাদি।রীতার এই আলোচনা সবাই খুব পছন্দ করেন।

রীতার পছন্দের প্রোগ্রাম-যেখানে পারফর্ম করে তার ভালো লেগেছে- আর্ট কমন্স্‌ এর “লাভ নোটস্‌” যাতে মিউসিকের দ্বারা সবাইকে সংগঠিত করা যায়। “ওয়াল্ড মিউসিক” জ্যাজ্‌ মিউসিকের সঙ্গে তারাণা ব্লেন্ড করে স্টেজে পার্ফম করেছেন যেখানে রীতা একমাত্র ইষ্টার্ন মিউসিয়ান, বাকি সবাই ওয়েষ্টার্ন মিউসিয়ান।

এছাড়াও রীতা গত চার বছর ধরে বাংলাদেশ-ক্যানাডা আসোসিয়েশন অফ ক্যালগরি র সাংস্কৃতিক সেক্রেটারী। মিউসিকের জগত ছাড়াও রীতার পারিবারিক জীবন আছে। স্বামী রঞ্জন নন্দী, পেশায় চাটার্ড আকাউটেন্ডেট এবং তার নিজের একটি ফার্ম আছে। মেয়ে রিকুল (১৪) ও ছেলে রাতুল (৭)। তারা দুজনেই স্কুলের কয়ারে গান করে, তবে ইন্টারেষ্ট স্পোর্টস্‌ এ।

এখন পর্যন্ত আমাদের পরিচয় হল সঙ্গীত শিল্পী, সুরকার, ইনস্ট্রাক্টার, সঙ্গীত গুরু, সঙ্গীত জাজ, বিজনেস কন্সালটেন্ট, স্ত্রী ও মা রীতার তার সাথে। এখন দেখলেন তো কেন আমি বলেছিলাম দশভুজা রীতা।

ইচ্ছা আর উদ্যম থাকলে একজন মানুষ জীবনে অনেক কিছু করতে পারে। তার প্রমাণ রীতা।আমার রীতার প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল।

আমার কথা, জুন ২০১৯

cropped-sahachari-pic-1

আমার কথা জুন, ২০১৯

জুন মাস চলে এল, আজকে ১৫ই জুন। এই মাসের সহচরীর পোষ্টএর জোর প্রচেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে কলকাতা-তথা পশ্চিমবঙ্গে জুনিয়ার ডাক্তারদের জোর আন্দোলন চলছে। প্রচন্ড কাজের চাপ কমানোর জন্য। মনে পড়ে অনেক বছর আগে (আমি তখন ইউনিভার্সিটি তে পড়ি) এরকম আন্দোলন হয়েছিল। এদেরকে ছাড়া হাস্পাতাল চলবে না, আর এদের কে দিয়েই বেশিরভাগ পেশেন্ট দেখার কাজ করানো হয়। তাই এদের কথা কিছুটা তো মানতেই হবে। এরা এদেশের রেসিডেন্ট ডাক্তার দের মতো। কিন্তু ন্যুনতম সন্মান টুকু যদি না দেওয়া হয়, তাহলে খুব দুঃখের কথা। শুনছি এরা জনতার কাছে, পেশেন্টদের পরিবারের কাছে মার খাচ্ছেন! কার কতটা দোষ জানিনা আর এত দূরে বসে নিক্তিতে মাপা সম্ভব নয়। তবু মনে হয় সরকারের উচিত এদের কথা শুনে সমস্যার সমাধান করা।

গতসপ্তাহে ছিল আন্তর্জাতিক সঙ্গীত দিবস। সেই উপলক্ষ্যে আমার এই মাসের সহচরী হলেন রীতা কর্মকার। ক্যানাডাবাসী রীতা একজন সঙ্গীত শিল্পী, মিউসিক নিয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়ান, গানে সুর দিয়েছেন, মিউসিক নিয়ে রিসার্চ করেন ইষ্টার্ন ও ওয়েষ্টার্ন মিউসিকের ফিউসন করার জন্য ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু নাঃ আর বলছি না! বাকিটা সহচরীতে পড়তে হবে।

পরের মাসে, জুলাই এর প্রথমে বঙ্গ সন্মেলন হচ্ছে বাল্টিমোরে। ইচ্ছা আছে এই নিয়ে কিছু লেখার আমার ব্লগে। আবার ফিরে আসব আপনাদের কাছে পরের মাসে।