আমার কথা

 

cropped-sahachari-pic-1

 

 

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে  আমার  ব্লগ পোষ্ট করলাম। সবাই কে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা জানাই। বিশেষ কিছু নতুন করে বলার নেই। আমার সহচরী ৫ স্বাতী সিন্‌হার লেখা একটি কবিতা সবার জন্য পোষ্ট করলাম।

নারী দিবস

স্বাতী সিন্‌হা

একটি আট বছরের মেয়ে ফেরেনি আর
স্কুলের পরে বাড়ির পাশে বল খেলতে গিয়ে,
দোমড়ানো মোচড়ানো লাঞ্ছিত শরীর পড়েছিলো গর্তে
গলার ভেতরে ঠুসে দেয়া ছিল একটি আস্ত প্যান্ট
এমন ধারা প্রতিদিন চলে আজ এই মর্তে –

আজ নাকি নারী দিবস?

প্রথম মহিলা এয়ার ফোর্স পাইলট, এক মার্কিনী সেনেটর
তাঁকে ও হতে হলো এক উঁচু অফিসার এর লালসার শিকার।
চেষ্টা করে ও নিগৃহীত মেয়েটি পায়নি কোনো প্রতিকার
চারিদিকে এই লজ্জা, দুন্দুভী শুধু ধিক্কার
প্রথম বা তৃতীয়, সারা বিশ্বে একই বিকার

আজ নাকি নারী দিবস?

Advertisements

সহচরী ৫ স্বাতী সিন্‌হা

 

Sahachari 4

আমার এই মাসের সহচরী হলেন স্বাতী সিন্‌হা। একদিকে IT Program Manager and Project Manager অন্যদিকে Real Estate Agent,  কবিতা তার ‘জন্মকবচ’। কবিতা পড়েন,আবৃত্তি করেন, একটু আধটু লেখেন। তার সাথে আছে নাটক ও শ্রুতিনাটক লেখেন বাংলায়। বাকিটা ক্রমশঃ প্রকাশ্য।

স্বাতীর জন্ম কলকাতার যাদবপুরে, পৈতৃক বাড়ীতে। বাড়ীর লাগোয়া বাগান-আমগাছ, পেয়ারাগাছ ইত্যাদির স্মৃতি মনে ভিড় করে আসে।দুই বোন, বাবা, মা, কাকা, ঠাকুমা – এই নিয়ে যৌথপরিবার। বাবা কাজ  করেন মেডিক্যাল সেল্‌স-এ, মা শিক্ষিকা। স্বাতী পড়তেন বালিগঞ্জ শিক্ষাসদনে। এই স্কুলেই আবার মা Assistant School Principal!মা’র সঙ্গে তিনি স্কুলে যেতেন পড়াশুনা করতে। স্কুলের অন্যান্য মেয়েদের থেকে স্বাতীর অভিজ্ঞতা একটু আলাদা কারণ তিনি যে স্কুলে পড়েন, মা সেই স্কুলের টিচার। স্কুলে যারা টিচার, তারাই মা’র সহকর্মী হিসেবে হয়ে যান মাসি -এই অভিজ্ঞতাটা স্কুলের অন্যান্য মেয়েদের থেকে একটু আলাদা। মা কিন্তু কখনো স্কুলে তার টিচার হননি।

স্কুলে ছিল কড়া ডিসিপ্লিন। পোষাক-পরিচ্ছদ, চুল-বাঁধা (বিশেষ পদ্ধতিতে), নখে নেল্ পালিশ না লাগানো ইত্যাদী।সবাই ইউনিফর্ম পড়ত, কাজেই কে বড়লোক আর কে গরিব তার হিসেব কেউ রাখত না। মনে পড়ে অবাঙ্গালী বড়লোক সহপাঠিদের মধ্যে কখনো অহংকার দেখেন নি। স্কুলের সেই পরিবেশ আর ডিসিপ্লিনের একটা বড় প্রভাব পড়েছে তার জীবনে।

এছাড়াও স্বাতীর ছোটবেলার স্মৃতি জুড়ে আছেন পুষ্পময়ী বোস- স্কুলের Principal ও মার সহকর্মী এবং তার কাছে বড়মাসি। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইংলিস ও সংস্কৃত-এ এম এ। তখনকার দিনে অবিবাহিত মহিলা (নিজের মায়ের দায়িত্ব নেবার জন্য), ঋজু চেহারা, অসাধারণ ব্যাক্তিত্যময়ী। বড়মাসি দুটি বাচ্ছা adopt করে তাদের পড়িয়েছেন, মানুষ করেছেন। বড়মাসি তাকে শিখিয়েছেন “জীবনে কখনো কোনকিছু আপাতদৃষ্টিতে মেনে নেবে না- চ্যালেঞ্জ করবে”।

মাসির বাড়ী ইংরেজি পড়তে যেতেন। তখন ক্লাস সিক্স বা সেভেন হবে। একটা Wordsworth কবিতা বর্ণনা করতে হবে, কিন্তু কিছুতেই প্রকৃতির ভাবনা আসছে না। মাসী খাতা-পেন্সিল হাতে পাঠিয়ে দিলেন লেকে। বলে দিলেন গাছপালা যা দেখবে, মনের ভাব লিখে লিখে নিয়ে আসতে। সত্যি তো, প্রকৃতি দেখলে, অনুভব করলে তবেই তো লেখা আসবে!

স্বাতীর যখন ১৬ বছর বয়স, বাবা হঠাৎ মারা গেলেন। ৮ টার সময় মা বাবাকে নিয়ে গেলেন হাসপাতালে আর ফিরে এলেন একা। বাড়ীতে ৭২ বছরের ঠাম্মা পুত্রশোকে কাতর। কিছু বোঝার আগেই মানুষটা চলে গেলেন। সেইসময় মাসী ছিলেন পাশে। স্বাতীর মনে পড়ে মা বলেছিলেন “আমি তো এখনও বিবাহিত, স্বামী চলে গেছেন, কিন্তু হাতের লোহা কেন খুলব”? বড়মাসি এই সময় মার পাশে ছিলেন, হাতের লোহা খুলতে দেন নি। কিশোরী স্বাতী কে এই ঘটনা খুব স্পর্শ করেছিল।

স্কুলের গন্ডী পেরিয়ে গোখেল কলেজে ভর্তি হলেন, Geography Honors। বি এস সি পাশ করে Geography তে এম এস সি করলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। তারপর বিদেশ পাড়ি। এদেশে University of Akron এ মাষ্টার্স করেন। দেশে এম এস সি র রেজাল্ট বেরোতে দেরী হওয়ায় Environmental Planning এর ওপর পড়তে হল যদিও তিনি Geography তে মাস্টার্স করেছেন, Cartography specialization। Ohio State এ Full Scholarship পেলেন পি এইচ ডি করার।  স্বামী এইসময়ে পি এইচ ডি করছেন State University of New York Albany তে। ইচ্ছা ছিল একই সাথে দুজনে পি এইচ ডি করবেন। কিন্তু তার স্বামী তাকে ছাড়লেন না। এই নিয়ে তার মনে খেদ রয়ে গেছে। তিনি নিজের চেষ্টায় এদেশে এসেছিলেন পি এইচ ডি করবেন বলে, চান্স পেয়েও করা হল না। আর যার জন্য করতে পারলেন না, সেই স্বামীও পাঁচ বছর পর শেষ করলেন না।

স্বাতী মা হলেন।একটি মেয়ে নিয়ে তাদের সংসার। নিজের প্রিয় বিষয় Cartography নিয়ে কাজ করেন।GIS (Geographic Information System)তখন উঠছে। প্রথমে Geographical data নিয়ে কাজ করতেন। আস্তে আস্তে Geography চলে গেল। শুধুই Data নিয়ে কাজ। তখন IT র যুগ শুরু হয়েছে। পুরোপুরি IT-র লোক হয়ে গেলেন। তাদের দ্বিতীয় মেয়ে এসেছে জীবনে।

১৯৯৩ সালে ওয়েশিংটন ডিসি তে এলেন। আবার নতুন শহরে জীবন শুরু হল। একদিকে দুইমেয়ে, সংসার, অন্যদিকে কম্পুটার সায়েন্স -র কোর্স নিতে শুরু করলেন। এদিকে স্বাতী তার কর্মক্ষেত্রে ক্রমশঃ উন্নতি করেছেন। গত ১৫ বছরে তিনি প্রথমে Systems Engineer, ক্রমে Project Manager এবং বর্তমানে Program  Manager in both  Operations & Development। ২০০০ সালে শেয়ার মার্কেট Crash করল। অনেক টাকা ক্ষতি হল তাদের। ভাবলেন কি করে সামলাবেন, সামনে দুই মেয়ের ভবিষ্যত! মেয়েরা ছোট। কোর্স নিয়ে Realtor হিসেবে কাজ করতে শুরু করলেন weekend এ। অফিসের কাজের পাশাপাশি Real Estate এর কাজ ও চলে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন আস্তে আস্তে।এই কাজটা তার ভালো লাগে। নিজের মতো কাজ নিতে পারেন। সেল্‌স নিজের ইচ্ছামতো বাড়ানো বা কমানো যায়। খুব সহজ কাজ নয়। নিজের বিজনেস নিজে গড়ে তুলতে হয়। প্রত্যেক দুই বছরে নতুন কোর্স নিতে হয়।গত দুই দশকে Real Estate Business আরো Computer based হয়েছে। এছাড়াও এই ফিল্ডে নানারকম লোকের সাথে কাজ  ও Communicate করা খুব জরুরী। স্বাতী নিজে লোকের সঙ্গে কাজ করতে ভালোবাসেন ও ভালোই নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন  তার এই দুটি গুণ বিজনেসে কাজে লেগেছে।এই কাজটি  স্বাতীর জীবনে একটি Positive Experience। মানুষের জীবনে তাদের নতুন বাড়ী কেনা বা বাড়ী বিক্রীর আনন্দের সামিল হতে পারেন। এই কাজে কিছুটা Hand holding আর Caring মনোভাব লাগে ক্লায়েন্টদের প্রতি। তাদের সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। কি করে একসঙ্গে দুটো কাজ করেন? সপ্তাহের সোম থেকে শুক্র অফিসের কাজ করেন। বাড়ী ফিরে Real estate এর কাজ। ই-মেলের উত্তর দেওয়া, ফোন করা ইত্যাদী। বাড়ী দেখানোটা শনি- রবিবার করেন। সামারে যখন দিন বড় থাকে, অফিসের পর ক্লায়েন্টদের বাড়ী দেখান। আপাততঃ এই নিয়েই তিনি খুশী। অফিস থেকে রিটায়ারমেন্টের পর হয়তঃ সময় বাড়াতে পারেন।

এবার স্বাতীর অন্য একটি গুণের কথা বলি। ছোটোবেলা থেকে হিন্দী First Language আর বাংলা  Third Language নিয়ে পড়লেও বাংলা শেখেন খবরের কাগজের বড় বড় হরফে লেখা পড়ে। হাইস্কুলে গিয়ে বাংলা First Language নিয়ে পড়লেন। ভাষাটা ভালো লাগল।। খুব একটা অসুবিধা হয়নি। বাড়ীতে চর্চা ছিল। ছোটবেলা বাংলায় রচনা লিখেছেন কম্পিটিশনে, কবিতা আবৃত্তি করেছেন।

সাহিত্য রুচি ছিল ছোটবেলা থেকেই। হিন্দীতে স্কুলে ভালোই ছিলেন। পরেও কোর্স নিয়েছেন স্কুলের সঙ্গে সঙ্গে। এলাহাবাদ থেকে “সাহিত্যরত্ন” (মাষ্টার্স) কোর্স নিয়ে শেষ করেন। বাড়ীতে হিন্দী সাহিত্যিকদের বই পড়েন। মুন্সী প্রেমচাঁদ, মহাদেবী ভার্মা, সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী নিরালা-এদের লেখা পড়তে ভালোবাসেন। হিন্দী ট্রান্সস্লেশনের কাজ করেছেন দেশে।

কবিতা ভালোবাসেন। কবিতা লেখা, আবৃত্তি, অভিনয়, বাচ্ছা-বড়দের নিয়ে অনুষ্ঠান করেছেন এদেশে এসে। মেয়েরা যখন মিডল স্কুল বা হাই স্কুলে, তখন কালচ্যারাল কাজকর্ম থেকে দূরে সরে গিয়েছেন তাদেরকে সময় দেবার জন্য। এখন মেয়েরা কলেজ শেষ করে একজন পি এইচ ডি আর অন্যজন চাকরী করছে। হাতে সময় এসেছে। আবার ফিরে এসেছেন তার ভালোলাগার জায়গাটিতে। সম্প্রতি তার লেখা একটি বাংলা শ্রুতিনাটক অভিনয় করে প্রাইজ পেয়েছে ডিসি তে একটি কম্পিটিশনে। জীবনে এই ছোট ছোট পাওয়া গুলি তাকে আনন্দ দেয়। কবিতা তার প্রথম প্রেম ও সারাজীবনের সঙ্গী।

এতকিছুর পরেও স্বাতী ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেন “Food for Friends” সংগঠনে। এই সংস্থার কাজ হল যারা অসুস্থ, বয়স্ক, নিজেরা রান্না করতে পারেন না, তাদের জন্য রান্না করা ফুড প্যাকেট বিতরণ করা। স্বাতী ফুড প্যাকেট বিতরণ করেন যখন সময় পান। Homeless shelter এ কাজ করেছেন। বছরে একবার এই মানুষদের সার্ভে করা হয়। কোনো অঞ্চলে গিয়ে homeless মানুষদের সঙ্গে কথা বলে তাদের নাম নিয়ে রেকর্ড রাখা।এই রকমের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা।

এই ব্যাপারে স্বাতী মায়ের কাছে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। মা Indian Women’s Federation-এ কাজ করতেন ভলান্টিয়ার হিসেবে। এই সংগঠনটির কাজ হল less fortunate মহিলাদের পড়ানো যাদের কোনকারণে পড়াশুনা হয় নি। মা যখন মারা যান, তখন এই সংস্থা থেকে অনেকে এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তার মার কথা বলেছেন। সেই শোকের সময় একটু সান্তনা পেয়েছেন মার কথা শুনে। গাড়ী করে মার দেহ ফেডারেশনের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এক চা-ওয়ালা এসে তাকে বলেছেন “মাঈজী বড় ভালো ছিল”। মা অনেক আওয়ার্ড পেয়েছিলেন কিন্তু কোনদিন বলেন নি। তার প্রিয় বড়মাসিও চলে গেছেন। মা আর বড়মাসির প্রদর্শিত পথে চলছেন স্বাতী।

এই প্রসঙ্গে স্বাতীর বক্তব্য “It’s not always about me- আমি, আমার এর পেছনেই আমরা ছুটি।এর উর্ধে উঠতে হবে”। সত্যি তো- একটু সাহায্যের হাত যদি আমরা মানুষের জন্য বাড়াতে পারি ভালোই তো হয়। মন নির্মল আনন্দে ভরে ওঠে।

আমার এই সহচরী নিজের শক্তিতে, প্রত্যয়ে ভরপুর। নিজগুনে গুণী। আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল স্বাতীর জন্য।

 

সহচরী ৪/ দূর্বা মুখোপাধ্যায়

Sahachari 4

durba
নিজের আঁকা ছবির এক্সিবিশনে দূর্বাদি

আমার সহচরী ৪ হলেন দূর্বা মুখোপাধ্যায়। ক্লীভল্যান্ড নিবাসী কোমল মনের এই মেয়েটি পেশায় সায়েন্টিস্ট, শিক্ষিকা, নেশা ছবি আঁকা। জীবনে অনেক দূর্গম বাঁধা অতিক্রম করেছেন ও করছেন। ওর সাথে কথা বললে মনে হয় জীবনের ছোট ছোট দুঃখ, মান-অভিমান, পাওয়া-না-পাওয়া কিছুই নয়। আমাদের আরো বড় বড় বাঁধাকে অতিক্রম করার শক্তি মনে রাখা উচিত। দূর্বাদিই তার প্রকৃত প্রমান। কিন্তু না… বড় দূর্বার কথা বলার আগে চলুন আমরা ছোট দূর্বার সঙ্গে পরিচয় করি।

ছোট্ট দূর্বার ছেলেবেলা কেটেছে বেলগাছিয়াতে, নিজেদের বাড়ীতে। বাবা ছিলেন ডাক্তার। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করে University College of Medicine এর General Medicine এর প্রফেসর। মা বায়োকেমিস্ট্রির Ph.D, Botanical Survey of India র Plant Chemist। দূর্বার জীবনে দিদিমা, ঠাকুমার প্রাধান্য ও যথেষ্ট। প্রবাসী দিদিমা তাকে খুব প্রভাবিত  ও অনুপ্রাণিত করতেন। ছবি আঁকতেন, তাঁর শিলং-এর বাড়ীতে, খুব ভালো সেলাই করতেন, শিলং রেডিওতে গান গাইতেন নিয়মিত, আবার সংসারও সামলাতেন। ঠিক “সহচরী”র আদর্শ।দূর্বারা দুই বোন (ছোট বোন তখনো হয় নি) কলকাতার বাড়ীতে ছোটবেলা কাটিয়েছেন ঠাকুমার তত্ত্বাবধানে।মনে পড়ে তারা বোনেরা স্কুল ছুটির দিন মার অফিসের বিশ্বাসী বেয়ারা ছেদীলালের সঙ্গে কলকাতা মিউসিয়াম ঘুরে আইস্ক্রিম খেয়ে মার অফিসে ফিরে আসতেন। একবার এইরকম বাবার কলেজে গেছেন দুই বোন। বাবার বন্ধুর ফার্মাকোলজী ল্যাবরেটরী তে ঘুরতে গিয়ে একটা বাঁদর তার জামা খিঁমচে ধরেছিল। দূর্বা তো ভয়েই কাতর। অবশেষে বাবা এসে তাকে উদ্ধার করেন।আরেকবার তারা দুই বোন দেখেছিলেন বাড়ীর ছাদ থেকে লুকিয়ে স্টেনগান হাতে নক্সাল ছেলেদের যেতে। ঠাকুমা অবশেষে ডেকে ডেকে তাদের নিচে নামিয়ে আনেন।

বড় হয়ে দূর্বা ফিজিয়োলজী নিয়ে পড়াশুনা করে Ph.D করেন বায়োকেমিস্ট্রি তে বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে C.S.I.R ফেলোসিপ নিয়ে।বোস ইনস্টিউট-এ কিছুদিন কাজ করে পাড়ি দেন জার্মানীতে পোষ্ট- ডক্টরাল রিসার্চের জন্য। দেড় বছরের মাথায় চলে আসেন আমেরিকার ক্লীভল্যান্ড শহরে ক্লীভল্যান্ড ক্লিনিকে রিসার্চের জন্য।বছরদশেক কাজ করার পর শিক্ষকতা করতে শুরু করেন। ক্লীভল্যান্ডে Lerner Medical college এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কিছুদিন।তারপর ড্যালাসে পার্কার ইউনিভার্সিটিতে যোগদান করেন এসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে ২০১৪ সালে।

নতুন শহরে নতুন জীবন শুরু হল।ক্লীভল্যান্ডের বন্ধুদের ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা নিয়ে দূর্বা নতুন উদ্দমে তার চাকরী শুরু করলেন।কিন্তু কপালে অন্য কিছু লেখা থাকলে তা খন্ডাবে কে? ড্যালাসে যাবার পর থেকেই তার পিঠে ব্যাথা শুরু হল। দেখা গেল lungs এ ছোট tumor। Treatment শুরু ২০১৪ থেকেই। ২০১৬ তে ধরা পড়ল Lung cancer, advanced stage। খুব কষ্ট গেছে তখন। প্রতিদিন ২-৩ লিটার জল জমত chest এ।তাই নিয়েই রোজ কাজে গেছেন, পড়িয়েছেন।সময়টা জানুয়ারী মাস। কষ্ট বেড়ে যাওয়ায় তার প্রাক্তন স্বামী ও বন্ধু অমিত গিয়ে কাছে গিয়ে তাকে সাপোর্ট দেন। Chest -এ একটি পোর্ট বসানো হল যাতে জল ড্রেন করা যায়।এপ্রিল মাসে Chemotherapy শুরু হল। এই সময়ে ড্যালাসের Baylor hospital এর  আর্ট স্টুডিওর লোকজন মানসিক ভাবে খুব সাহায্য করেছেন। এই স্টুডিওর কাজ হল ক্যান্সার পেসেন্টদের

Art therapy করে মনের জোর বাড়ানো।মাঝে মাঝেই বন্ধুরা ছুটে গেছেন তার কাছে।সাহচর্য দিয়ে, রান্না করে তাকে সাহায্য করেছেন।মীরা, মাধুরী, অপর্নাদি, সুপর্না-র কথা দূর্বা বিশেষভাবে মনে করেন যারা এই দূরুহ সময়ে তার হাত ধরেছিলেন।বাড়ীতে দূর্বা নিজেই তার chest  fluid ড্রেন করতেন।একাই ড্রাইভ করে কেমো নিতে যেতেন।এই সময়ে আর্ট স্টুডিও না থাকলে কেমোথেরাপী দূর্বা হয়ত শেষ করতে পারতেন না। অনেক ছবি আঁকেন এই সময়ে যা তাকে কিছুটা মানসিক স্থিতি দিয়েছিল সেই সময়ে। ২০১৭ র সেপ্টেম্বর মাসে আর্ট স্টুডিও র একটি exhibition এ দূর্বার হাথে আঁকা একটি ছবি প্রায় ২০০ ডলারে বিক্রি হয়। এছাড়াও exhibition এ পেসেন্টদের আঁকা ছবি বিক্রি করে ২০০০ ডলার লাভ হয় যা ব্যাবহৃত হয় আঁকার সরঞ্জাম কেনার জন্য।এটা অনেক কষ্টের মধ্যেও দূর্বাকে সেইসময়ে অনেক আনন্দ দিয়েছিল। এর কিছুদিন পরেই হস্পিটালের Oncology report এ তার সম্বন্ধে একটা লেখা বেরোয়।

 

এরমধ্যে এল দ্বিতীয় বিপদ!পায়ে ধরা পড়ল আরেক ধরনের cancer। না- lung cancer এর সঙ্গে এর কোন যোগাযোগ নেই।পায়ের প্রবলেম ছিল আগে থেকেই। কিন্তু ডাক্তাররা কিছুতেই ক্যান্সার মানতে রাজী নয়।হিউস্টনে M.D . Anderson এ গিয়ে বায়োপ্সী করে ধরা পড়ল Squamous cell cancer।ড্যালাসে এসে সার্জারী হল।Skin Graft হল পায়ে। ইতিমধ্যে চাকরী চলে গেল। না অসুস্থতার কারণ ওরা দেখায় নি! যেদিন অফিস খালি করে বাড়ী এলেন, তার পরের দিন পায়ে অপারেশন।ফিরে এসে সাতদিন পড়ে রইলেন। এক প্রতিবেশী মহিলা এসে খবর নিয়ে যেতেন। সাতদিন বাদে ব্যান্ডেজ খোলা হল। আস্তে আস্তে সেরে উঠলেন।

খুব দুর্যোগের মধ্যে ২০১৮ র জানুয়ারী মাসে ক্লীভল্যান্ডে নিজের বাড়ীতে ফিরে এলেন।চাকরী নেই, তার ওপর অসুস্থতা।দেশে গেলেন। প্রায় তিনমাস ছিলেন দেশে। মা, বোনেদের সঙ্গে কাটিয়ে, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে মনটা ভাল হল।এর মধ্যে আর্ট স্টুডিও থেকে চিঠিতে জানলেন Swim Across America তার আঁকা ছবি নির্বাচিত হয়েছে। ৭৫০ ডলার পাওয়া গেছে ছবি বিক্রি করে যেটা Cancer research এ কাজে লাগবে। খবরটা শুনে মনে খুব আনন্দ পেলেন।

এবারে ভাবতে লাগলেন কি করবেন? কিভাবে চালাবেন? মনে হল ছবির exhibition করলে তো অনেক খরচা! তারপর মনে হল নিজের বাড়ীর backyard এ ছবির exhibition করলে কেমন হয়? যেই ভাবা, সেই কাজ।কার্ডবোর্ডের বাক্স আর shower curtain দিয়ে সাজিয়ে নিজের হাতে আঁকা ছবি display করে exhibition করলেন ২০১৮ র সামারে।অনেকেই এসেছিলেন তার আঁকা দেখতে, প্রশংসা করেছেন।আঁকা তাকে অনেক আনন্দ দেয়।যখনি শারীরিক ও মানসিকভাবে দূরবস্থার মধ্যে পড়েন, ছবি আঁকেন।দেশে বন্ধুর NGO তে গিয়ে বাচ্ছা আর বয়স্ক মানুষদের কাছে বলেছেন কিভাবে ছবি আঁকার মধ্যে দিয়ে অনাবিল আনন্দ পাওয়া যায়।

কেমো নেবার পর বেশ কিছুদিন ভালোই ছিলেন। প্রত্যেক তিন মাস অন্তর তার CT Scan হয়। এবছর জানুয়ারীতে ধরা পড়ল টিউমার বেড়ে গেছে!আবার কেমো নিতে হবে। কিন্তু তার আগে দেশে গিয়ে মা-বোনদের দেখে আসার ইচ্ছা আছে কিছুদিনের জন্য।

অসুস্থ না হলে দূর্বা জানতেও পারতেন না যে এত মানুষ তাকে ভালোবাসে। তাদের ভালোবাসায় দূর্বা আপ্লুত।নানা ভাবে মানুষ তাকে সাপোর্ট দিয়েছেন- কেউ কাছে গিয়ে, কেউ ফোনে, কেউ পাঠিয়েছেন ঠাকুরের আশীর্বাদী ফুল, চকোলেটের বাক্স। স্টুডেন্টরা তার সেড়ে ওঠায় এক বড় ভুমিকা নিয়েছে। তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। এখনও তাদের কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে ফেসবুকের মাধ্যমে।

দূর্বাদির সঙ্গে কথা বলে আমার মনে একটা পসিটিভ এনার্জি এল।একটা মানুষ কঠিন অসুখ নিয়ে ভাবছে এই বছর সামারে আর্ট এক্সিবিশন করবে।মনে অনেক confidence পেলাম তার ইচ্ছাশক্তি দেখে।জানলাম কিভাবে তার জীবনের G.P.S তাকে এক মোড় থেকে সম্পূর্ন অজানা আরেক মোড়ে নিয়ে গেছে! পখচলার রাস্তা কখনো মধুর, কখনো বন্ধুর, কখনো বা চোরাবালি তে ভরা! তবুও ক্লান্তি নেই দূর্বার। আমার এই সহচরীর জন্য আমার আন্তরিক ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা রইল।

সহচরী ৩/ শ্রীরূপা মিত্র

Sahachari 4

২০১৯ এর প্রথম এবং আমার সহচরী ৩ হলেন ৫০ বছরের আমেরিকা-প্রবাসী এবং আদ্যন্ত কলকাতার মেয়ে শ্রীরূপা মিত্র। বাঙ্গালি দের কাছে শ্রীরূপা, আমেরিকান বন্ধুদের কাছে শ্রী আর আমার শ্রীদি।

ঠাকুরদা রায়সাহেব জিতেন্দ্রনাথ রক্ষিত গাজীপুর ওপিয়াম ফ্যাক্টরি শুরু করেন। পেশায় ও নেশায় কেমিষ্ট মানুষটি যুক্ত ছিলেন ক্যালকাটা কেমিক্যাল্‌স সঙ্গে।এই পরিবারটি বর্ধমানের অকালপোষের জমিদার পরিবার। এখনও এদের পারিবারিক দূর্গাপূজা হয়। মার দিকে দাদামশাই সতীশচন্দ্র মিত্র ছিলেন প্রথম ভারতীয় রেজিষ্ট্রার।ভীষণভাবে প্রিয় মামাবাড়ীটি আর্মহার্ষ্ট স্ট্রিটে। এখনও কলকাতায় গেলে শ্রীরূপা এখানে বেশ কিছুদিন সময় কাটান।

বাবাকে শ্রীরূপার মনে পড়ে খুব সুন্দর ও আকর্ষনীয় মানুষ হিসেবে। ইঞ্জিনীয়ার ছিলেন। শিকার করতেন, শিকারের মাংস রান্না করে খাওয়াতে ভালোবাসতেন, বেদে দিয়ে সাপ ধরাতেন। বাবা ছিলেন Spontaneous, adventurous। কলকাতায় মানিকতলায় পৈতৃক বাড়ীতে বেশ দিন কাটছিল এই পরিবারটির। অকস্মাৎ্‌ বিপর্যয় ঘটল।মাত্র ৪৫ বছর বয়সে করোনারী অ্যাটাক হয়ে বাবা মারা যান।শ্রীরূপা তখন সাড়ে ষোল, ভাই আট, মা অসহায়। এই সময় দাদুকে পাশে পেয়েছেন। মামাবাড়ীর ভরসা না পেলে পরিবারটি হয়ত ভেসে যেত। সেই কৈশোর থেকেই তিনি মা আর ভাইয়ের ভরসা। লরেটো থেকে সিনিয়ার কেম্ব্রিজ পাশ করে কাগজে অ্যাড দেখে মেয়েদের ইংলিশ পড়িয়েছেন কিছুদিন।

যাদবপুর বিশববিদ্যালয়ে Electronics and Telecommunications engineering পড়তে শুরু করেন স্কুল পাশের পর। তাদের ক্লাসে ছিল তিনজন মেয়ে। ৫ বছরের কোর্স।অরূপ মিত্রের সঙ্গে আলাপ যাদবপুরে পড়তে পড়তে। অরূপ ও ছিলেন Spontaneous adventurous। বোধহয় সেইখান থেকেই ভালোলাগা আর ক্রমে ক্রমে ভালোবাসায় পরিণত হয়। ১৯৬৯ সালে বিয়ের পর আমেরিকায় পাড়ি দিলেন দুজনে। পিট্‌সবার্গ শহরে বাসা বাঁধলেন। দুজনেরি ইচ্ছা মাষ্টার্স করবেন। ভর্তি হলেন ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু শ্রীর ভালো লাগলো না পড়তে। তিনি চাকরী দেখতে শুরু করেন। কিন্তু চাকরী পাননি বেশ কিছুদিন কারণ তিনি মহিলা ইঞ্জিনীয়ার। সময়টা ১৯৬৯। যারা জুলিয়া রবার্টস এর “মোনালিসা স্মাইল” দেখেছেন তারা জানবেন। যারা দেখেননি তাদের মনে করিয়ে দিই ১৯৫০-১৯৭০ অবধি মেয়েদের পড়ার বিষয় ছিল “হোম সায়েন্স”- এতে সেখানো হতো কিভাবে ভালো ঘরনী হওয়া যায়। সেই সময়ের একজন ইঞ্জিনীয়ার তায় মহিলা- নৈব নৈব চ! অনেক চেষ্টার পর L.K. Comstock এ Drafting এর কাজ পান। এদিকে এদেশে এলেও শ্রীর খুব একটা ভালো লাগছিল না। বাড়ির জন্য মনখারাপ আর চাকরীতে একটু disillusioned অনুভব করছিলেন। ইতিমধ্যে অরূপ এম বি এ শেষ করে চাকরীতে যোগ দিয়েছেন। দুটি মিষ্টি কুকুর নিয়ে তাদের সংসার।

শ্রী Duquesne Light এ Senior Planning Engineer এর চাকরী পেলেন।প্রায় ২৭ বছর চাকরী করেছেন এখানে।এখানে তিনি প্রথম ভালো কাজের পরিবেশ পান।ইতিমধ্যে ব্যাক্তিগত জীবনে পরিবর্তন এসেছে। অরূপের সঙ্গে তার ডিভোর্স হয়ে গেছে। শ্রী একাএকাই তার নিজের জীবন গড়ে তুলেছেন। অসম্ভব স্বাবলম্বী এই মানুষটিকে কখনই কিছু কাবু করতে পারেনি। শ্রীর মতে তিনি কখনো discriminated  হননি গায়ের রং এর জন্য, কিন্তু মহিলা ইঞ্জিনীয়ার হিসাবে কাজ করতে গিয়ে discriminated হয়েছেন। যখনি  কোনো কনফারেন্সে গেছেন ও অন্যান্য মহিলা ইঞ্জিনীয়ারদের সঙ্গে দেখা হয়েছে এবং তাদের কাছেও এই একই কথা শুনেছেন।

ইতিমধ্যে আমেরিকায় Economic crisis  এলো। সময়টা ২০০১ এর পর। অনেকের সাথে শ্রীও চাকরী হারালেন। এরপর অ্যালেনটাউনে কিছুদিন চাকরী করেন। এরপর আবার তার প্রিয় পিট্‌সবার্গে ফিরে আসেন এবং Mitsubishi তে যোগ দেন। পাঁচ বছর কাজ করার পর অবসর নেন। এতদিনে অনেকদিন কাজ করেছেন, পরিবারের প্রতি অনেক কর্তব্য করেছেন। এবার তার অবসর নেবার পালা। দেখতে দেখতে ১০ বছর হয়ে গেল শ্রী খুব আনন্দের সঙ্গে তার অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, প্রতিদিন জিম এ গিয়ে এক্সেসাইজ, দেশবিদেশ ভ্রমণ- এই নিয়েই দিব্যি সময় কেটে যাচ্ছে। অনেক দেশ ঘুরেছেন শ্রীরূপা। কখনো একা, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে।সবথেকে ভালো লেগেছে কেনিয়া। ছবির মতো সুন্দর বাড়ী তার। বাড়ীর দেখাশুনা, গাছের পরিচর্যা করে তার দিন কেটে যায়। কলকাতা যান বছরে একবার। দেশে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে ভালো লাগে।

শ্রীরূপা একা, কিন্তু একাকীত্বে ভোগেন না। সবকিছুই নিজে করেন, কারুর ওপর নির্ভর করেন না। নিজেকে অপূর্ণ মানুষ ভাবেন না। সেই ষোলবছর বয়স থেকেই তিনি মা আর ভাইয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং সারাজীবন ধরে পালন করেছেন। তার মতে জীবনে অনেক ঝড়ঝাপটা আসে, কিন্তু উঠে দাঁড়াতে হয়। তার মতে জীবনে অনেক ঝড়ঝাপটা আসে, কিন্তু উঠে দাঁড়াতে হয়।তিনি তার সব দায়িত্ব পালন করেছেন। বাবা মারা যাবার পর থেকে মা আর ভাই-এর দায়িত্ব নিয়েছেন। মা কয়েক বছর হল মারা গেছেন।

শ্রীর বক্তব্য প্রবাসী বাঙালি মেয়েদের প্রতি – আরো mainstreamed হওয়া উচিত।নিজেদের ethnicity ভালো কিন্তু তার বাইরেও একটা জগত আছে। অন্যান্য মানুষের সাথে মেশা উচিত। বাঙ্গালি মেয়েদের আরো এগিয়ে আসা উচিত। আরো আত্মবিশ্বাসী হওয়া উচিত। বাঙ্গালি মেয়েরা অনেকেই খুব শিক্ষিত কিন্তু নিজের ক্ষমতার ওপর অতটা বিশ্বাস নেই।

     শেষ করার আগে বলে রাখি আমার সঙ্গে শ্রীর আলাপ পিট্‌সবার্গ শহরে আসার আগেই। এখানে এসে বন্ধুত্ব হয়েছে। যদিও তিনি প্রায়ই বলে থাকেন তিনি আমার মায়ের বয়সি, তবুও আমি তাকে একজন বন্ধু বলেই ভাবি। বন্ধুত্ব অনেক রকমের হয়। ঠিক এক বাক্স চকোলেটের মতো- বাইরে থেকে দেখতে হয়ত একই, কিন্তু খেলে একে্কটা একেক রকম। শ্রী সঙ্গে অনেক বিষয়ে আলোচনা করা যায়। বেশী ভালো লাগে তার গল্প শুনতে। শ্রীর সাহস আর প্রাণশক্তি আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমার এই সহচরী নিজের গুনে অপরূপা।

খুচখাচ রান্না ৪/ ভর্তা

১) মাইক্রোওয়েভ-এ বেগুন ভর্তা                  Sahachari 2

সুস্মিতা ঘোষ

উপকরণঃ

একটা মাঝারি বেগুন

১/২ মাঝারি পেঁয়াজ

কাঁচা লংকা ২-৩ টে

সর্ষের তেল

নুন

পদ্ধতিঃ

  • বেগুনটাকে ধুয়ে মুছে নেবে প্রথমে। একটা পাইরেক্স-এর চৌকো পাত্রে রাখবে।
  • পাত্রে থাকা অবস্থায় বোঁটা টা আস্ত রেখে বেগুনটাকে চার ভাগ করে চিরে নেবে।
  • এবারে দু টেবিল চামচ সর্ষের তেল আর পরিমান মতো নুন দিয়ে বেগুনের ভেতরটা ভাল করে মাখিয়ে নেবে।
  • এবারে মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে ১০ মিনিট রান্না করবে।
  • ১০ মিনিট পর বের করে দেখবে নরম হলো কিনা।
  • না হলে ঢেকে ৫ মিনিট রান্না করবে। নরম না হলে আবার মাইক্রোওয়েভে ২ মিনিট ২ মিনিট করে গরম  করবে।
  • বেগুন পুরো নরম হয়ে গেলে, একটা চাকু দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে নেবে। খোসা ফেলে দিতে পারো। আমি রেখে দিই।
  • তারপর পেঁয়াজ, কাঁচা লংকা দিয়ে মেখে নেবে।
  • পরিবেশনের আগে একটু ধনে পাতা কুঁচি ছড়িয়ে দেবে।
  • এটা খেতে খুব ভালো হয়।

 

২) বাঁধাকপি সেদ্ধ বা ভর্তা              Sahachari 2

সুস্মিতা ঘোষ

উপকরণঃ

একটা ছোট বাঁধাকপি

কাঁচা লংকা ২-৩ টে

সর্ষের তেল পরিমান মতো

নুন

ধনেপাতা

পদ্ধতিঃ

  • বাঁধাকপি ধুয়ে ছোট করে কেটে নেবে প্রথমে।
  • প্রেসার কুকারে বাঁধাকপি রেখে ১/২ কাপ জল দিয়ে মাঝারি আঁচে উনুনে বসাবে।
  • কুকারে দুটো হুইসেল হলে বন্ধ করে ঠান্ডা হতে দেবে।
  • একটু ঠান্ডা হলে বাঁধাকপি বের করে একটা পাত্রে রাখবে।
  • এবারে নুন, সর্ষের তেল, কাঁচা লংকা, আর ধনেপাতার কুচি দিয়ে বেশ চটকে মাখবে।
  • গরমভাতে একটু ঘিয়ের সাথে খেতে দারুণ লাগে।

আমার কথা

সহচরী/যশোমান ব্যানার্জী

ভিন্ন দেশের ভিন্ন নিয়ম

কিংবা রান্না বান্না

হাতের কাজের হরেক পুঁতিcropped-sahachari-pic-1

সাজিয়েছি চুনি পান্না

হাজার হাজার গল্প কথা

মনকে আছে ভরে

আয় না সহচরী

সে সব দি তোকে ভাগ করে

********************************************

২০১৯ এর শুরুতে সবাইকে জানাই নতুন বছরের শুভেচ্ছা। আগামী বছর সবার ভালো কাটুক, সবাই সুস্থ থাকুন, আনন্দে, শান্তিতে থাকুন -এই কামনা করি। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি ঘরছাড়া মানুষ, শিশু ও পশুরা যেন এই ঠান্ডায় কষ্ট না পায়। জানি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাড়িতে বসে আমার এই প্রার্থনা খুবই অবান্তর। তবুও আমি বিশ্বাস করি আমার মতো অনেকে যদি এই একই প্রার্থনা করেন, তাহলে তার কিছুটা ফল অন্ততঃ ফলবে। সারাদিনে কয়েক মিনিট আমরা সবাই মিলে দুঃস্থ মানুষের জন্য একটু তো ভাবতেই পারি, তাই না? আমার এক কলিগ এবার কোনো গিফ্‌ট নেয় নি ক্রিশমাসে। স্বামীস্ত্রী টাকাটা ইয়েমেনের রিফিউজি বাচ্ছাদের দান করেছে। কি সুন্দর ভাবনা! পরের বছর আমি ঠিক করেছি কোনো ভাল কাজের জন্য দান করব, নিজের জন্য কিছু না কিনে।

 

সহচরী ২/ সুমিত্রা ভট্টাচার্য্য

Sahachari 4

সহচরী ২ সুমিত্রা ভট্টাচার্য্য

এবার আমার সহচরী পর্ব পোষ্ট করতে একটু দেরী হল। কাজের চাপে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমার সহচরী ২ হলেন সুমিত্রাদি- সুমিত্রা ভট্টাচার্য্য। দীর্ঘদিন পরিচয়। আমার ক্লীভল্যান্ড-জীবনের শুরু থেকে। শান্ত-শিষ্ট, স্নেহময়ী এই মানুষটিকে দেখলে বোঝা যায় না যে ভিতরে একজন শক্ত, দৃঢ়চেতা মানুষ আছেন।আরো গুন আছে, ক্রমশঃ প্রকাশ্য।

সুমিত্রার জন্ম কালিঘাটের পটুয়াপাড়া লেন -এর মামাবাড়িতে।কাছেই নিজেদের বাড়ি।সেখানে বড় হয়েছেন দাদু-ঠাকুমা, মা-বাবা ও পিসির স্নেহছায়ায়, দুই দাদা আর ছোটবোনের সংগে।আদি বাড়ি ছিল ঢাকায়। তারপর কলকাতা চলে আসে এই পরিবারটি।

বাবা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী ঢাকায়।পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে ঢাকা থেকে কলকাতা আসার সময় জাহাজে ধরা পড়ে যান। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে প্রায় বছর আষ্টেক কারাবন্দী ছিলেন।জেলে বন্দী থাকাকালীন বি এ পাশ করেন। মুক্তি পেয়ে ব্যাঙ্কে চাকরী পান। মা ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী। খুব ভালো গান গাইতেন। খুব অল্প বয়স থেকেই অনেক গানের প্রোগ্রাম করেছেন। ১৭ বছর বয়সে বিয়ে হবার পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ল। খুব ভালো সেলাই করতেন। মায়ের তৈরী করা জামা পড়ে বড় হয়েছেন চার ভাইবোন।

এরকম বাবা-মায়ের সন্তান যে বড় হয়ে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হবেন সেটা বলা বাহুল্য।পড়াশুনা দেবেন্দ্র বিদ্যাপীঠে। স্কুলের গন্ডী পেরিয়ে মুরলীধর গার্লস কলেজে ভর্তি হলেন বাংলায় বি এ পড়তে। পরীক্ষার সময় এল ঝড়- বাবা চলে গেলেন অসময়ে, মাত্র ৫০ বছর বয়সে। কলেজে পড়ার আগে থেকেই বাবার শরীর খারাপ। হাইপ্রেসার ছিল আগে থেকেই, স্ট্রোকও হয়ে গেছে।পরীক্ষার চার-পাঁচদিন আগে বাবা ভর্তি হলেন হাসপাতালে সার্জারী হবার জন্য।বাবার জন্য মনখারাপ হলেও যথাসময়ে পরীক্ষা দিতে বসলেন সুমিত্রা।এক্সামিনার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও লেখার খাতা দি্যে গেছেন। প্রথম পাতায় লিখতে গিয়ে পেনের কালিতে পাতা ঢেকে গেল। কোনোমতে লিখে পরীক্ষা দিয়ে বেড়িয়ে এলেন।সাধারণতঃ পরীক্ষার বিরতির সময় মা আসেন খাবার নিয়ে। বেড়িয়ে এসে দেখেন মা নেই, তার বদলে মাসী এসেছেন। একটু অবাক হলেন।মনে উদ্বেগ নিয়ে পরের পরীক্ষায় বসলেন।কিছুক্ষন বাদেই খবর এল বাড়ী থেকে লোক নিতে এসেছে। অর্ধেকলেখা খাতা জমে দিয়ে বেড়িয়ে এলেন।এসেই শুনলেন বাবা মারা গিয়েছেন সকাল দশটায়। মনে পড়ল ঠিক ওই সময়েই তো তার পরীক্ষার খাতা কালিময় হয়ে গিয়েছিল! মনে হল যেন বাবা জানিয়ে গেলেন যে তিনি চলে গেলেন।আর পরীক্ষায় বসতে চাইছিলেন না। কিন্তু মাষ্টারমশাই এর নির্দেশে ওই অবস্থায় পরীক্ষা দিলেন। মনে জানেন পাশ করার কোনো সম্ভাবনা নেই। রেসাল্ট বেরোলে দেখেন যে তিনি পাশ করেছেন। ঘটনাটা খুব অদ্ভুত তাই না! সুমিত্রার ও তাই মনে বিশেষভাবে দাগ কেটেছিল।

এর কিছুদিন বাদেই ১৯৬৯ সালে সুমিত্রা রায়ের বিয়ে হল ইঞ্জিনিয়ার দিব্যেন্দু ভট্টাচার্যের সঙ্গে। বিয়ের পর সবামীর বিশেষ ইচ্ছায় এম এ পড়তে শুরু করলেন। ১৯৭০ -এ দিব্যেন্দু এলেন আমেরিকার মেরীল্যান্ডের বাল্টিমোর শহরে।কিন্তু তখনো সুমিত্রার পড়া শেষ হয়নি। তখন রাজনৈতিক ডামাডোল চলছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরীক্ষার দিন পিছিয়ে যাচ্ছে, রেজাল্ট বেরোতে দেরী হচ্ছে।তার মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে পড়া শেষ করে ১৯৭১ সালে সুমিত্রা পাড়ি দিলেন আমেরিকায়।

বাল্টিমোর শহরে শুরু হল তাদের সংসার।ইতিমধ্যে স্বামী এম বি এ পড়তে শুরু করেছেন University of Maryland এ। সুমিত্রা IBM -এ কম্পিউটার ট্রেনিং এ ভর্তি হলেন। কাজ করলেন কিছুদিন Johns Hopkins University -তে। Data recording এর কাজ।বছর দুয়েক কাজ করে একটি consulting company Euelle & Bomhardt এ computer record keeping এর চাকরী পেলেন। কম্পিউটার ডিপার্টমেন্টের ছয়জনের মধ্যে তিনি একমাত্র মহিলা।সহকর্মীদের কাছে সন্মান পেয়েছেন। ইতিমধ্যে দিব্যেন্দু নতুন চাকরীতে যোগ দিয়েছেন।

ছেলে সায়ন এল ১৯৭৪ এর ডিসেম্বরে। তার আগে নভেম্বর অবধি কাজ করেছেন। মনস্থির করেছেন ছেলে পাঁচমাস হলে আবার কাজে ফিরে আসবেন। ছয়মাসের ছুটি মঞ্জুর হয়ে গেছে।ছোট্ট সায়ন কে নিয়ে চোখের নিমেষে কেটে গেল পাঁচমাস।ছেলের জন্য ডে কেয়ার ঠিক। কিন্তু যখন সময় এল, মায়ের মন কিছুতেই ছেলেকে পাঠাতে পারল না।অগত্যা আর কাজে যাওয়া হল না। ছেলেকে নিয়ে সুমিত্রা ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন। অনেক সময় কাটিয়েছেন ছেলের সঙ্গে।

ইতিমধ্যে তাদের বাসাবদল হয়েছে মেরীল্যান্ড, ভার্জিনিয়া ও মিশিগানে।মিশিগানে ছিলেন দেড়বছর। মেয়ে ঈশানীর জন্ম এখানে। এর ছয়মাসের মধ্যে দিব্যেন্দু বড় চাকরী নিয়ে BP তে যোগ দিলেন ক্লীভল্যান্ডে। জীবন ক্রমশঃ ব্যাস্ত হয়ে উঠেছে। সবামীর বড় চাকরী, ব্যাস্ত জীবন, ছেলে পড়াশুনা ও অন্যান্য extracurricular activity, ছোটো ঈশানী, সঙ্গে আছেন। ছেলের ১৩ বছর বয়সে তাকে একটি ভালো বোর্ডিং স্কুলে পাঠানোর ব্যাবস্থা হল। কিন্তু মায়ের মন মানবে কেন?খুব মনখারাপ। ছেলে চলে যাবার পর আবার চাকরী করা শুরু করেন ডে কেয়ারে।প্রথমে খুব অল্প সময় কাজ করতেন, কারণ মেয়ে তখনো ছোটো। মেয়ে হাই স্কুলে যেতে শুরু করলে সময় বাড়িয়ে দিলেন এবং রোজ যেতে শুরু করেন। বড় হয়ে ঈশানীও এই ডে কেয়ারে কাজ করেছে কিছুদিন। ৭ বছর কাজ করেন United Way র এই ডে কেয়ারে। এরপর অন্য একটি ডে কেয়ারে কাজ শুরু করেন full time employee হয়ে। ২৪ বছর কাজ করেছেন এখানে। এই দীর্ঘদিন কাজে অনেকবার award পেয়েছেন। Pride Award পেয়েছেন ১৯৯৮ তে।তিনি ছিলেন বাচ্ছাদের প্রিয়। বাবা-মাদের কাছে অনেক ভালোবাসা পেয়েছেন। তাদের অনেকে এখন তার ফেসবুক বন্ধু, যদিও বাচ্ছারা বড় হয়ে গেছে।

ইতিমধ্যে মেয়ে ঈশানীর বিয়ে হয়েছে এবং কর্মসুত্রে সে এখন ক্লীভল্যান্ডে। তার দুই ছেলে। ঈশানীর ছোট ছেলে হবার পর সুমিত্রা ঠিক করেন তিনি এবার ডে কেয়ার ছেড়ে দেবেন এবং নাতির সঙ্গে সময় কাটাবেন। কিন্তু তিনি বললে কি হবে, তাকে কর্মস্থল ছাড়বে না। এরকম কর্মনিষ্ঠ এমপ্লয়ী ছাড়তে তাদের মন চায় না। অবশেষে এল কাজের শেষদিন। সহকর্মীদের ও বাচ্ছাদের বিদায় জানিয়ে সুমিত্রা কাজ থেকে অবসর নিলেন।

এখন সবামী -স্ত্রী দুজনেই অবসর জীবন কাটান তাদের বিশাল বাড়ীতে। একা নয়, নাতিদের নিয়ে বাড়ী এখন গম্‌গম্‌ করছে। আর কি?  ৪৯ বছর বিয়ে হয়েছে। জীবনে সব কর্তব্য পালন হয়ে গেছে। ছেলে সায়ন Law farm partner New York এ থাকে। মেয়ে ঈশানী Clinical Psychology তে Ph.D করে এখন প্রাকটিস করছে।তাদের জীবন তাদের নিজস্ব।

আমার এই সহচরীকে নিয়ে লিখব ভাবলাম কারণ সুমিত্রা এমন একজন মানুষ যিনি খুব Simple – সবামী বিশাল চাকরী করেছেন, সুমিত্রার চাকরী করার কোনো দরকার-ই ছিল না। কিন্তু তিনি করেছেন, কারণটা তার কাছে বাচ্ছারা খুব প্রিয়। তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে তিনি ভালোবাসেন। শুধু তাই নয়, সুমিত্রা অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ।নিজের জীবনেও এবং কাজেও। সুমিত্রা এমন একজন মানুষ যিনি সবরকম মানুষের সাথে কথা বলতে পারেন। কোনো অহংকার নেই। আমি তার কাছে জীবনের অনেক শিক্ষা পেয়েছি এদেশে এসে। আমার এই সহচরী নিজগুনে অন্যন্যা।