সহচরী ১৮ ২য় পর্ব/নাসীম আহমেদ/সেপ্টেম্বর ২০২০

সহচরী ১৮ ২য় পর্ব/ নাসীম আহমেদ

নাসীম আহমেদ
দিদির নামে ট্রাষ্ট ” শামীম আহমেদ মেমোরিয়াল ট্রাষ্ট”

আগের পর্বে নাসীম আহমেদের কথা শুরু করেছিলাম, কিন্তু শেষ হয়নি। এবারে আবার নাসীমকে নিয়ে এলাম আরো কথা শোনার জন্য। এই পর্বে থাকছে নাসীমের ইউ এস এ আসার পরবর্তী জীবণের কথা।

ঢাকায় পড়াশুনা চলাকালীন তার ইচ্ছা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবেন। সেই ইচ্ছা পূরণ করতে ১৯৭৫ সালে ইউনিভার্সিটি অফ পিটস্‌বার্গে মাষ্টার্স (Masters of Public administration in Graduate school of public and International Affairs, GSPIA) চলে এলেন সুদূর ঢাকা থেকে এদেশে।এক পরিচিত পরিবারের বাড়ি এসে উঠেছেন। ভোরে ঘুম থেলে উঠেই শুনলেন মর্মান্তিক খবর! শেখ মুজিবর রহমান সপরিবারে নিহত হয়েছেন আততায়ীর হাতে।শেখ সাহেব ছিলেন তাদের পারিবারিক বন্ধু। মর্মাহত হলেন খবরটি পেয়ে। এ শুধু তার পারিবারিক নয়, জাতীয় ক্ষতি!

ভালোই পড়াশুনা চলতে লাগল।সেই সময়ে খুব বেশী আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রী ছিলনা। কাজেই দু একজন ছাড়া নিজের দেশের কাউকে চিনতেন না। এখন সময়ের সাথে সাথে প্রচুর ছেলেমেয়ে বিদেশে পড়তে আসছে। এদের আত্মপ্রত্যয় দেখে নাসীমের খুব ভালো লাগে। মাষ্টার্স পড়া শেষ করলেন ভালোভাবেই। এরপর পি এইচ ডি করতে শুরু করেন। কম্প্রিহেন্সিভ (Comprehensive exam)ও কোর্স ওয়ার্ক (Course Work) শেষ করার পর বিয়ে করেন। এদেশে এসে দুজনের আলাপ। তারপর চার বছর ধরে দুজনের সম্পর্ক। নাসীম বরাবরই বিয়ের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। তার কাছে এই বিবাহ নামক সামাজিক প্রতিষ্ঠানটির কোনোদিনই খুব একটা মূল্য ছিল না। তার মতে এটি গড়ে উঠেছে পুরুষদের কথা ভেবে, মেয়েদের কথা ভেবে নয়। কিন্তু আলাপের চার বছর বাদে তার মনে হল যে তার বয়স বেড়েছে, একটি মানূষ তাকে বিয়ে করতে চাইছে, যাকে তিনি ভালোবাসেন। বিয়ে হয়ে গেল। দুজনেই ছিল অনেক গুণ, যা অপরকে পূর্ণ করত। স্বপ্ন দেখেছিলেন পি এইচ ডি করে একসঙ্গে ঢাকায় ফিরে যাবেন, পড়াবেন ও রিসার্চ করবেন একসাথে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি। তাদের অশান্তি হতে লাগল। সম্পর্কটা ছিল উদ্বায়ী (volatile)। এর জন্য তার গবেষণার কাজে ব্যাঘাত ঘটতে লাগল। তার তিনবার গর্ভপাত (Miscarriage) হল। তখন ভীষণভাবে সন্তান চাইছিলেন। না পাওয়ায় ক্রমশঃ অন্ধকারের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিলেন। এই ব্যার্থতা এবং দুঃখ তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। এর প্রভাব পড়ল তাদের সম্পর্কের ওপরে। যদিও দুজনে একে অপরকে ভালোবাসতেন, কিন্তু ঘাত-প্রতিঘাতে দুজনের সম্পর্কে ক্ষয় হতে লাগল। এইসবের মধ্যে আর পি এইচ ডি হল না। । তিনি কাজ নিয়ে চলে গেলেন ইন্ডিয়ানাপোলিসে।

 ওখানে সহকারী পরিচালক (Assistant Director)হয়ে  যোগ দিলেন “Universities Field Staff International (UFSI)” নামক সংগঠনটিতে। এই সংগঠনটি মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে গিয়ে পড়াশুনা করা যায়, অনেকটা “Study Abroad”-এর মতো।এদের কাজ ছিল ১৩ টি বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে “Seminar at Sea” প্রকল্পের আয়োজন করা। এই প্রোগ্রামটিতে স্টুডেন্টরা জাহাজে থেকে ঘুরবে বিভিন্ন দেশে। জাহাজেও পড়াশুনা হবে, আর জাহাজ বিশেষ বিশেষ দেশের বন্দরে গিয়ে থামলে সেখানেও পড়াশুনা করবে। এদের কিছু “In-house” ও কিছু “In-port” প্রফেসর ছিলেন। রাজনৈতিক রিপোর্ট আসত সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পোর্টের ফিল্ড  অফিস থেকে।নাসীমরা তাদের ফিল্ড অফিস থেকে পাবলিশ করতেন সেই সব রিপোর্ট। তার কাজ ছিল সব মেম্বার ইন্সটিটিউশনের সঙ্গে ও ফিল্ড আসোসিয়েট্‌সদের মাধ্যম হয়ে (liaison)সুষ্ঠভাবে কাজ পরিচালনা করা। এছাড়াও কনফারেন্স, সেমিনারের অয়োজন করা, গ্র্যান্ট লেখা ইত্যাদিও ছিল।এর পর তিনি প্রায় এক বছর এদের একটি প্রজেক্টে (UFSI funded) প্রধান গবেষক (Principal Investigator)হিসেবে কাজ করেন। বলাই বাহুল্য, এই প্রজেক্টের গ্র্যান্ট লেখা, ফান্ডিং আনা এবং পরবর্তীকালে পেপার পাবলিশের কাজও তিনিই করেন। প্রজেক্টটির নাম “National Policy affecting women: A study of Bangladesh, Brazil, China & Egypt)”। তার ইন্ডিয়ানাপোলিসে আসার ছয়মাসের মধ্যে তার স্বামী আসেন তার কাছে। এই সময়ে তাদের জীবণে এল একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান। নাসীমের জীবণ ভরে উঠল আনন্দে মেয়েকে নিয়ে। মেয়ে জীবণে এলেও নাসীমের কাজ কিন্তু থেমে থাকেনি। তার প্রজেক্ট ফান্ডিং পেল।ফিল্ড রিপোর্ট থেকে নিজের ভাবা প্রজেক্টে ব্রাজিল, ইজিপ্ট, বাংলাদেশ ইত্যাদি দেশে জেন্ডার সংক্রান্ত কাজ করবেন। এই কাজটি করতে তাকে ছয়মাসের জন্য বাংলাদেশ যেতে হবে। মেয়ে তখন তিন মাসের। ইতিমধ্যে স্বামী ফিরে গেছেন ইন্ডিয়ানাপোলিস থেকে পিটস্‌বার্গে তার নিজের কর্মক্ষেত্রে।

নাসীম মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে প্রজেক্ট শেষ করলেন। এই সময়ে আবার আব্বা আর আম্মার সঙ্গে দেখা হল। ভালো সময় কাটল। কাজ সম্পূর্ণ করে এদেশে ফিরে এলেন, প্রথমে ইন্ডিয়ানাপোলিস, তারপর পিটস্‌বার্গ। মেয়ে তখন দেড়বছর বয়স। এই সময় তার পি এইচ ডির উপদেষ্টার (অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অফ পিটস্‌বার্গ) সঙ্গে আবার কথা বললেন। জোর কদমে লেখা চলতে লাগল। প্রায় তিনটে অধ্যায় লেখা শেষ হল। সেই বছরের শেষের দিকে সবামীকে ছেড়ে মেয়েকে নিয়ে উঠলেন এক এপার্ট্মেন্টে। একদিন তার উপদেষ্টা তাকে জানালেন তিনি কিছুদিনের জন্য তার দেশে যাচ্ছেন, ফিরে এসে আবার কথা বলবেন। কিন্তু কথা আর হয়নি, এক বিমান দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। নাসীম এই সময়ে একটি অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ জোগাড় করেছিলেন এবং তার  সঙ্গে গভর্নর স্কুলে কাজ করে চালাতেন। চাকরী দেখতে শুরু করেছিলেন।

আবার চরৈবেতি। এবার গন্তব্যস্থল ইলিনয় স্টেটের কারবন্ডেল শহরে। সেখানে ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ইলিনয়ের International Program and Services গবেষণা প্রকল্প বিশেষজ্ঞ (Research Project Specialist)হিসেবে যোগদান করলেন। নাসীম চেয়েছিলেন একটু নিরিবিলি জায়গায় শান্তিতে মেয়েকে বড় করবেন। তিনি কারবন্ডেলে এসে সেটাই পেলেন। এখানে ছিলেন অনেকদিন, ২২ বছর। এই সময়ে তিনি নিজেকে মেলে দিলেন তার কাজে। তার কাজ হল ১) গ্রান্ট লেখা ও প্রজেক্ট তৈরী করা ও দেখা; ২) উইমেন এন্ড ডেভেলপমেন্ট (Women and Development); 3) আন্তর্জাতিক শিক্ষা সমন্নয়ক(International Edication Coordinator); ৪) শিক্ষিকা (Teaching Women Studies related courses)। এই ভাবেই ধীরে ধীরে নিজের একটি যোগ্য স্থান গড়ে তুলেছিলেন। ২০১১ সালে মাত্র ৫৯ বছর বয়সে অবসরগ্রহণ করেন।

মেয়েকে ভালোবাসেন, কিন্তু বড় হবার পরে তাকে ছেড়ে দিয়েছেন। মেয়ে ধীর, স্থির, শান্ত। কোনোদিন মাকে কোনরকম বিব্রত করেনি বা অসুবিধায় ফেলেনি। বরাবরি পড়াশুনায় ভালো। মেটিরিয়াল সায়েন্সে ইঞ্জিনীয়ারিং শেষ করে তার মেডিসিন পড়ার ইচ্ছে হল। যেই ভাবা, সেই কাজ। এখন সে এক প্রতিষ্ঠিত এন্ডোক্রিনোলজিস্ট (Endocrinologist)। নাসীমের মতে তার মেয়ে তাকে পরিপূর্ণ করেছে।

এবার আসি নাসীমের অবসরজীবণের কথায়। নাসীমের মনের কথা হল “জীবণে একার জন্য বেঁচে থাকব, এটা কোন জীবণই নয়, অপরের জন্য কিছু করব”। আগেই বলেছি দিদি শামীম ছিলেন নাসীমের ভীষণ কাছের মানুষ। তাদের দুইবোনের অনেক স্বপ্ন ছিল একসঙ্গে কাজ করবেন, গ্রামে গিয়ে ক্লিনিক করবেন ইত্যাদি। ১৯৯৯ সালে খুবই অল্প বয়সে দিদি চলে গেলেন।সেই সময়টা নাসী্মের জীবণে খুব কষ্টকর সময়। ছয়মাসের মধ্যে বাবা ও দিদি দুজনকে হারিয়েছেন। তখন থেকেই নাসীম দিদির নামে একটি বিশেষ বৃত্তি (Scholarship)-র ব্যাবস্থা করেন মেধাবী দুস্থ মেয়েদের জন্য। বিদেশ থেকেই কাজ করছিলেন। অবসরগ্রহণের পরে ২০১১ সালে শুরু করেছেন নিজের দিদির নামে “শামীম আহমেদ মেমোরিয়াল ট্রাষ্ট”। তার নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই টাকার এক-তৃতীয়াংশ  তিনি এই ট্রাষ্ট ও অবসর-নিবাস  (এর কথায় পরে আসছি)-এর জন্য রেখেছেন। তিনি এই ট্রাষ্টের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক (Founder and Executive Director)।এটি একটি নন-প্রফিট সংস্থা, উদ্দেশ্য শিক্ষাবিষয়ক এবং মানবিক কাজের প্রচেষ্টা। এই ট্রাষ্ট থেকে মেধাবী মেয়েদের ডাক্তারী, নার্সিং ও অন্যান্য সবাস্থ্য-বিষয়ক জীবিকা, বিজ্ঞান, বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, আই টি, ফটোগ্রাফি ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশুনার জন্য বৃত্তি দেওয়া হয়। এছাড়াও প্রাকৃতিক বা মানুষকৃত বিপর্যয়ে ত্রানের কাজে নিয়মিত সাহায্য করে থাকে এই সংস্থা।

এছাড়াও নাসীমের বর্তমান প্রজেক্ট হল বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য একটি অবসর-সমাজ (Retirement Community) তৈরী করা। এটিও তার নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া টাকা থেকে সম্পৃষ্ট।নাসীমের মতে বার্ধক্যে মানুষের মধ্যে প্রবল একাকীত্ব, মানসিক অবসাদ আসে। মনে হয় আমার এই পৃথিবীকে আর কিছু দেবার নেই। তাই নিজের কিছু নতুন ভাবনা নিয়ে তিনি শুরু করছেন তাই এই অবসর-নিবাস।বলাই বাহুল্য এই বৃদ্ধাবাস তৈরীর অনেক খরচ নাসীম নিজেই বহন করবেন। ঢাকার বাইরে, মেঘনার পাশে, মধ্যবিত্ত মানুষের বৃদ্ধাবাসের জমি কেনা হয়ে গেছে। এই কমিউনিটিতে ৩০ শতাংশ লোক বিনাখরচে থাকতে পারবে (যাদের ভাড়া দেবার সামর্থ্য নেই), বাকী ৭০ শতাংশকে ভাড়া দিয়ে থাকতে হবে। আর্কিটেক্ট তার পরিকল্পনা শুনে উব্ধুদ্ধ হয়ে  বিনা-পারিশ্রমিকে অবসর-বাসস্থানের প্ল্যান বানাচ্ছেন। কাজও শুরু হবার কথা ছিল, কিন্তু কোভিডের জন্য তিনি ঢাকায় যেতে পারলেন না এই বছর। আশা করা যায় সামনের বছর এই বৃদ্ধাবাস  তৈরীর কাজ শুরু হবে।

এই নিয়েই আছেন নাসীম। আব্বা আগেই চলে গেছেন। দিদি শামীম ডাক্তার, আব্বা-আম্মার দেখাশুনা করতেন। ছোটবোন ও ভাই দুজনেই বিদেশে। আব্বা মারা যাবার পর আম্মা নিজের মধ্যে গুটিয়ে যান। তাদের পৈতৃক বাড়ি আম্মা একাই ধরে রেখেছেন। তিনজন কাজের লোক নিয়ে একাই থাকতেন। ২০১১ তে আম্মার অ্যালজাইমার রোগ (Alzeimer disease) ধরা পড়ে। দিদি শামীমও চলে গেছেন অকালে। নাসীম মনস্থির করেন যে তিনি নিজে চাকরী থেকে অবসর নিয়ে আম্মাকে দেখাশুনা করবেন।  নাসীম এখন প্রতিবছর ঢাকায় যান, আম্মার সঙ্গে সময় কাটান। এখনো মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন নানাভাবে। সেই যে কৈশোরে আব্বার সমর্থনে দুই বোনের একসঙ্গে মানুষের সেবায় পথচলা শুরু হয়েছিল, এখনো থামেনি। এই মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাদের দুইবোনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, শিরায় শিরায় ছড়িয়ে আছে। দিদি চলে গেলেও নাসীমের এই পথচলা থামেনি, থামবেও না।

নাসীম ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন এবং আরো অনেক কাজ করুন এই কামনা করি।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s