সহচরীর কলমে/ জুন ২০২০

প্রকৃতির মুখোমুখি প্রথম পর্ব

সুশান্ত সিং রাজপুতের জন্য

কাকলি মজুমদার, ক্যালগেরি, ক্যানাডা

Kakoli Image 1

ছবি ১) এই কাহিনীর লেখিকা কাকলি মজুমদার

এই গ্রীষ্মে বার বার প্রকৃতির কাছে চলে যাবো। ২০২০ সালটা আমাদের খুবই দুঃসময়ে এনে ফেলেছে। করোনার দৌরাত্য, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং গভীর অর্থনৈতিক মন্দা। ইদানিং আমাদের জীবনের আর কোন  নিশ্চয়তা নেই। এই অস্থির নৈরাশ্যেভরা  সময়ে, নিজের সহজাত সত্ত্বাকে প্রায়ই হারিয়ে ফেলছি। নিজেকে খুঁজে পেতে তখন প্রকৃতির কাছে আশ্রয় নিতে হয় । যেখানে গেলে প্রকৃতির আদি এবং অকৃত্রিম রূপ দেখতে পাই । এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পারিপার্শিকের মধ্যে, জীবনের একটা কিছু যে স্থিতধী আছে, সেই অনুভব আমাকে এগিয়ে চলবার সাহস দেয়।

কানাডার পশ্চিমে রকি মাউন্টেন বড্ড রুপসী।  বাড়ি থেকে মাত্র এক-দু’ঘন্টা ড্রাইভ করলেই অচেনা কোন পাহাড়ি পথে, ছোট্ট নদী বা লেকে পৌঁছে যাওয়া যায়। এই বছরে আর জনপ্রিয় জায়গাগুলোতে যাবো না। চলে যাবো অন্যস্থানে, যেথায় আগে যাওয়া হয় নি। এখন জীবনের যে ধ্বংসলীলা দেখছি, তাতে যা কিছু করা হয়ে ওঠে নি  – তা চটপট করে নিতে হবে।

লেখার মধ্য দিয়ে আমার নতুন করে বেঁচে উঠবার কাহিনীগুলো আপনাদের কাছে নিয়মিত পৌঁছে দেবার ইচ্ছে রইলো।

শুরুতেই গেরো। সপ্তাহান্তে, শনিবারে বৃষ্টি এলো ঝেঁপে। আমাদের কোথাও যাওয়া হোল না।

রবিবার ঘুম থেকে উঠে বিছানায় শুয়ে সেল ফোনে খবরের পাতায় চোখ বোলাতেই সুশান্ত সিং রাজপুতের জ্বলজ্বলে হাসি মুখ। তার নীচে  লেখা “found dead in his Bandra apartment।” সটান উঠে বসলাম।  সুশান্ত আমার – আমাদের সবারই খুব প্রিয় অভিনেতা – দারুণ প্রতিভাবান। মাত্র ৩৪ বছর বয়স।  এই মর্মান্তিক মৃত্যু সত্যি বিশ্বাস হচ্ছে না। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে জানিয়েছে আত্মহত্যা। মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে সংবাদ মাধ্যমে অভিনেতার “clinical depression” নিয়ে পাহাড় প্রমাণ কথা হয়ে গেছে। খুব মনে হতে লাগলো “M.S. Dhoni – the Untold Story” তে দুর্দান্ত অভিনয়, কেদার নাথের রোমান্টিক “sweetheart”, “কাই পো চে” সেই নায়কটিকে। সুশান্ত খুব সহজাত ভঙ্গিমায় চরিত্রগুলোর সাথে এক হয়ে যেতো।  আর কিছু না হলেও, সে M.S. Dhoni এর মধ্যেই বেঁচে থাকবে। স্বল্পভাসি, সপ্রতিভ এবং দুর্দান্ত প্রতিভাবান এই নায়কটির অস্বাভাবিক মৃত্যুতে, তার ব্যক্তিগত জীবন ঘিরে চূলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।  Instagram-এ লক্ষাধিক follower, নানা ভক্তমন্ডলী, বলিউডের স্টার, সাংবাদিকরা কেউ বাদ নেই। এরা এতো দিন কোথায় ছিলো? তখনও শেষকৃত্য হয়নি। পুলিশের তদন্ত সবে শুরু হয়েছে। হত্যা না আত্মহত্যা? হঠাৎ সুশান্তের জীবনটা খবরের কাগজের খোলা পাতা হয়ে গেছে।

Sushant-Singh-Rajput-biopic-in-the-works-1200x675-1

ছবি ২) সুশান্ত সিং রাজপুত (গুগুলের সৌজন্য)

সারাটা দুপুর ধরে খুব মন খারাপ। কোন মানুষের অসময়ে চলে যাওয়াটা আমাকে খুব নাড়া দেয়। অন-লাইনে সুশান্ত সংক্রান্ত সব পোস্ট পড়েই চলেছি। খুব ভয় করছে। তথাকথিত বিদগ্ধ বিশেষজ্ঞেরা সুশান্তের গায়ে না জানি কি তকমা এঁটে দেবে! সব শুরুর শেষ আছে। সেই শেষে সব বিবাদ, গ্লানি ও অবসাদ ঘুচে গিয়ে, যেন ওর অসাধারণ অভিনয় প্রতিভাটাই উজ্জ্বল হয়ে থেকে যায়।

আমার অবস্থা দেখে সৌরভ বল্লো  “চলো একটু ঘুরে আসি।” “কোথায় যাবো?” ততক্ষণে রবিবারের দুপুর তিনটে গড়িয়ে গেছে। “AllTraills” App দেখে এক ঘন্টার ড্রাইভে চেনা পাহাড়ি শহর ক্যানমোরে (Canmore) চলে এলাম। আরও ১০ মিনিটের মধ্যে  কোয়্যারি লেকে (Quarry Lake)-এ পৌঁছে গেলাম। “ওমা কি অপূর্ব! ক্যানমোরে এতোবার এসেছি, এই লেকের কথা তো জানতাম না?” ঘন সবুজাভ-নীল কাঁচের মতন স্বচ্ছ জলে ভরা ছোট্ট লেক। চারিধারে নরম-সবুজ মাঠের মাঝে গাঢ়ো-কালচে-সবুজ পাইনবন ছড়িয়ে আছে।  আর সেই বনের মধ্যে ডানা মেলেছে কচি সবুজের দলবল ।  ক’দিন আগে বসন্তের শুরুতে, এ্যাস্পেন আর পপলারের ডালে নতুন পাতা এসেছে। তাই বনে সবুজের মহোৎসব। পিছনে  পাহাড়ের সারি – Mount Rundle, Ha Ling Peak, Three Sisters।

Quarry Lake 1

বি ৩) Quarry Lake,  সঙ্গে পাহাড় ও গাছের সারি

বরফ গলে গিয়ে ছিঁটেফোঁটা সাদা শীতের চিহ্ন বাদামি-নীল পাহাড়ের গায়ে লেগে আছে। দূরে Three Sisters-এর মাথায় হিমবাহের আভাস দেখা যাচ্ছে। আজ ভারি ঝকঝকে সুন্দর দিন। জুন মাসের হাল্কা ঠান্ডা মেশানো তরতাজা বাতাসে ভরপুর জীবনের গন্ধ।  চারিপাশে নিতান্ত অলসভাবে পড়ে থাকা লেক-পাহাড়-বন-রদ্দুর আমার মনের মধ্যে একটা জলছবি হয়ে ওঠে। যেন কোন শিল্পী একটু আগেই এঁকে রেখে গেছে।

লেক ঘিরে পিকনিক টেবিল, হাঁটার পথ, মাছ ধরবার ব্যবস্থা। লেকের চারপাশে বাঁধানো পথে দু’চারটি পরিবার হাঁটছে। মাঠে বসে কেউবা আড্ডা দিচ্ছে। টুকটাক খাওয়া দাওয়া চলছে। এতো ছড়ানো জায়গায়, গুটি কয়েক মানুষের মধ্যে “social distancing” এর সমস্যা নেই। আমরা  দুজনে বনের পিছনে নুড়ি বিছানো পথে খানিকটা হেঁটে এলাম।  এই পথটা জুড়ে মাথার উপর দিয়ে ইলেকট্রিক তার চলে গেছে। ঘন্টা খানেক হাঁটলে এখানকার সবচেয়ে বড় লেকে (Spray lake) পৌঁছে যাওয়া যাবে। আপাতত সেটা তোলা থাক।

Quarry Lake 2

ছবি ৪) Quarry Lake

লেকের ধারে মেঘে-মাখা আকাশের তলায় অনেকক্ষণ হাত পা ছড়িয়ে বসে থাকলাম। কি যে নির্ভার লাগছে, তা আর কি বলবো। অনেকটা যেন মায়ের আঁচলের স্নেহে আশ্রয় নেওয়ার মতন।  লেকের মধ্য থেকে কলকল খুশির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। কাছে গিয়ে দেখি চারটি ছোট ছেলে এ-পাড় থেকে ও-পাড়ে সাঁতার কাটছে। লেক কিন্তু ৮০-১০০ মিটার গভীর। দেখে মনে হয় এরা স্থানীয় এবং প্রায়ই সাঁতার কাটে। ছুঁয়ে দেখি যে জল ইষৎ-ঊষ্ণ আর ভারি মনোরম। কয়েক মাস ধরে “lockdown” – এর বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে, ছেলেরা আজ জীবনের উৎসবে মেতেছে।

সারাদিনের দমবন্ধ অবস্থয় থেকে, এবার আমার মাথাটারও মুক্তি হোল। প্রকৃতির কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ হোই। Dear Zindagi- সিনেমার প্রিয় গানটি গুনগুন করতে করতে গাড়িতে  উঠি “love you জিন্দেগি। love me জিন্দেগি। love you জিন্দেগি।”

লেখিকা পরিচিতিঃ কাকলির জন্ম এবং পড়াশুনা কলকাতায়। সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর ছাত্রী।  বর্তমানে কাকালি কানাডার ক্যালগেরি শহরে থাকে সপরিবারে। অনেক  দেশ  ঘুরেছে। লেখা তার বহুদিনের সৃষ্টিশীল ভালোবাসা।  তার লেখায় ছুঁয়ে  থাকে প্রকৃতি, প্রেম পূজা আর মানুষের কাহিনী। কিছু গভীর অনুভবের আর অনুপ্রেরণার উপলব্ধি।  সে লেখে নানা স্বাদের ছোট গল্প, প্রবন্ধ, আর ভ্রমণ কাহিনী। তার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে দেশ, সাপ্তাহিক বর্তমান ও অন্যান্য পত্রিকায়।

3 thoughts on “সহচরীর কলমে/ জুন ২০২০

  1. লেখার বিষয় খুব ভালো লাগলো।
    সত্যি, আমাদের চারপাশে যখন হতাশায় ভরে যায়, যখন মনে হয় যে কিছুই ঠিক চলছেনা, সব কিছু বোধহয় শেষ হলে গিয়েছে, তখন প্রকৃতির কাছে গিয়ে দাড়াল মনে হয যে তার কাছ থেকে আমাদের এখনো এতকিছু পাওয়ার বাকি আছে যে সে ভান্ডার কোনোদিনই ফুরানোর নয়।

    Like

  2. খুব ভাল লাগল। যখন আমরা ভবি সব শেষ হয়ে গেল, ঠিক সেই সময়ে আবার নতুন করে কিছু একটা শুরু হয়।
    প্রকৃতির কাছাকাছি গেলে নিজেদের ক্ষুদ্রতা আর প্রকৃতির মহত্বটা উপলব্ধি করা যায়, সাথে সাথে একটা নতুন শক্তিও পাওয়া যায় আবার নতুন করে লড়াই করার জন্য।
    লেখকের পরবর্তী লেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

    Like

কল্লোল রায় শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s