সহচরীর কলমে/ এপ্রিল ২০২০

সহচরীর কলমে/এপ্রিল ২০২০

এই প্রথম এই ব্লগে প্রকাশিত হল এক সহচরীর কলমে রবি ঠাকুর কে নিয়ে স্মৃতিচারণ। আমার এই সহচরীর নাম কাকলি মজুমদার এবং আমার স্কুলের সহপাঠী।  কাকলির পরিচিতি রয়েছে এই লেখার শেষে।

Kakoli pic 1

এই রবীন্দ্র জয়ন্তীতে ছেলেবেলার রবি ঠাকুরের মুখোমুখি

কাকলি মজুমদার, ক্যালগেরি, কানাডা

আজ করোনা মহামারীতে বিশ্ববাসী এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিদিন চোখের সামনে দিয়ে এক অবিশ্বাস্য এবং ভয়াবহ মৃত্যু মিছিল চলে যাচ্ছে। এই নতুন সন্ত্রাস আমাদের আপন অস্তিত্বকে বিপন্ন করে ফেলেছে।  কাল কি অপেক্ষা করে আছে, তা আমরা জানি না। শুধু জানি যে এক অনিশ্চয়তার কালো মেঘে আকাশ ঢেকে আছে। তবুও আমরা এগিয়ে চলেছি। কেন না, এগিয়ে যাওয়াই জীবনের ধর্ম ,আর থেমে যাওয়া মৃত্যুতুল্য।

এই সর্বনাশা মহামারীর মধ্যে থাকতে থাকতে হঠাৎ কেন জানি না মনে পড়ে গেল যে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ  পরে ২৫শে বৈশাখ।  আগামী ৮ মে রবীন্দ্রজয়ন্তী। আহা! প্রত্যেক বছর এই সময় থেকেই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। এই বছর, সংকটের দিনে আমরা যেন এই বিশেষ দিনটিকে ভুলে না যাই। কোন মতেই যেন রবীন্দ্রজয়ন্তী নীরব অবহেলায়  চলে না যায়। আসুন, সবাই মিলে রবীন্দ্র স্মৃতিতে নিমগ্ন হই।  খোলা আকাশের নীচে ছাতিমের ছায়ায় একত্রে বসে,  পাঞ্জাবি-লাল-সাদা ঢাকাই শাড়িতে সেজে গুজে একত্র হয়ে অনুষ্ঠান  করতে নাই বা পারলাম। একাকি ঘরে বসে আমরা তাঁর তর্পণ তো করতে পারি। আমরা zoom, skype -এর মাধ্যমে virtually একত্র হয়ে লেখায়, গানে, কবিতা পাঠের মধ্য দিয়েও তাঁকে স্মরণ করতে পারি।

এ’কথা সে কথা, নানা কথায় মন আজ রবীন্দ্র কথায় ডুব দিয়েছে। ভাবছি কবে, কখন কিভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার জীবনে ঢুকে পরেছিলেন?  আমার সাথে তাঁর পরিচয় সেই কোন শৈশবে। মা আমাকে ছোটবেলা থেকে পাড়ার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃতি করাতে নিয়ে যেতেন। চার বছর বয়সে প্রথম মঞ্চে উঠেছিলাম । অনেক কসরত করে মা আমাকে মুখস্থ করিয়েছিলেন

“আমি আজ কানাই মাস্টার, পোড়ো মোর বেড়াল ছানাটি।

আমি ওকে মারি নে মা বেত, মিছিমিছি বসি নিয়ে কাঠি।”

গল্প শুনেছি যে স্টেজে উঠে রীতিমতন বিপর্যয় ঘটিয়েছিলাম। মাইকের সামনে গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে, আবৃতি করতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করি। পাড়ার লোকেদের সামনে মেয়ের এই বেয়াদপিতে, বাবা রেগে আগুন হয়ে ঠামাকে নিয়ে বাড়িমুখো হাঁটা দিয়েছেন। ঠিক তখনই আমাকে ফুলের মালা পরিয়ে উদ্যোক্তারা আবার মঞ্চে ফিরিয়ে আনলেন। এবং আমি পুরো কবিতাটা বলেছিলাম। কিছু মেয়ে সেজেগুজে মালা পরে মঞ্চের পিছনে বসেছিল নাচবে বলে। কি অন্যায়, আমি কেন ওদের মতন মালা পাবোনা?

 

এইভাবে একদম ছোট্টবেলায় আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  এসে গেলেন। আপনাদের জীবনেও নিশ্চয়ই কবিগুরুকে নিয়ে এইরকম নানা গপ্পো আছে? নেই? একটু ভেবে দেখুন তো। এরপর থেকে ২৫ বৈশাখে পাড়ার অনুষ্ঠানের জন্য কবিতা শিখেছি আর আবৃতি করেছি। শিশু, শিশু ভোলানাথের কবিতা আর তার সাথে সহজ পাঠ, যার ভাষা, ছন্দ আর ছবি ছিলো শিশু মনের এক আশ্চর্য্য আনন্দের ভান্ডার। এই দাঁড়িওয়ালা প্রশান্ত মানুষটি যে কে, আর কি ব্যাপক গভীর যে তাঁর সৃষ্টি, তা উপলব্ধি করবার বয়স তখনও হয়নি। তবুও তিনি এক বিশুদ্ধ শিশু মনের সঙ্গী হয়েছিলেন।  তাঁর হাত ধরে কখনও বীরপুরুষ হয়ে মাকে নিয়ে ঘুরে এসেছি

“মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে, মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।

তুমি যাচ্ছো  পাল্কিতে মা চড়ে, দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে”

আবার কখনও বা মায়ের সাথে লুকোচুরি খেলেছি

“আমি যদি দুষ্টুমি করে, চাঁপার গাছে  চাঁপা হয়ে ফুটি,

ভোরের বেলায় মা গো, ডালের পরে কচি পাতায় করি লুটোপুটি”

মা আমি এলেম কোথা থেকে? শিশু মনের সেই আজন্ম প্রশ্ন যার উত্তর দিতে মায়েরা যদিও বা বিব্রত হতেন, কবি কিন্তু এর জবাব এক অনবদ্য ভাবে দিয়েছেন। যা শুধু রবি কবিই দিতে পারেন। একেবারে শিশুদের উপযোগী করে।  মা বলছেন হেসে কেঁদে –

“ছিলি আমার পুতুল-খেলায়, ভোরের শিবপূজার বেলায়। তোরে আমি ভেঙেছি আর গড়েছি।

তুই আমার ঠাকুর সনে ছিলি পূজার সিংহাসনে, তাঁরি পূজায় তোমার পূজা করেছি।”

কবিতার হাত ধরে তাঁর সাথে পরিচয় হলেও, পরে স্কুলে প্রাথমিক বিভাগে পরবার সময়ে নৃত্য নাট্যেও অংশ নিয়েছি। নানা রঙের শাড়ি পরে, মাথায়-গলায়-কানে ফুলের গয়না পরে আলো ঝলমলে স্টেজে গানের তালে তালে নাচা খুবই আনন্দের ছিল। নাচে পটু না হলেও শিক্ষিকারা ঠিক চালিয়ে নিতেন।  এইসব কিছুই আমার শিশু মনকে রঙে, রসে, কল্পনায় সম্বৃদ্ধ করেছে। মনে পড়ে ডাকঘর নাটকে সুধার ভূমিকায় অভিনয় করবার কথা। বহুদিন ধরে পাশের ফ্ল্যাটে কাকিমার  ঘরে রিহার্সাল হয়েছিলো। ছোট্ট ডাইনিং রুমে বাচ্চারা ভিড় করে বসে থাকতো। আর তাদের ধাক্কাধাক্কি, খিলখিল হাসিতে একদম জমজমাট রিহার্সাল। স্নেহশীলা কাকিমা আমাদের দুষ্টুমিকে খুব প্রশ্রয় দিতেন। আমাদের মধ্যে বোধহয় সবাই ছেলেবেলায় ডাকঘরে ছোট বড় ভূমিকায় অভিনয় করেছি। ঠিক কিনা?

দেখতে দেখতে শৈশব পার করে কৈশোর, যৌবন, তারপর এই দীর্ঘ প্রবাস জীবন। আমার সকল সুখে-দুঃখে, সকল ভালোবাসায়, সকল প্রেমে-পূজায়, কবিগুরু তুমি আমার প্রিয় সখা হয়ে সাথে ছিলে। তোমার কোন কবিতায় হয়তো কোন বাল্যবন্ধুর স্মৃতি মিশে আছে। আবার কোন গানের মধ্যে এগিয়ে চলবার প্রেরণা । তুমি আমার শহুরে জীবনে গ্রাম বাংলার সোঁদা গন্ধ এনেছো। তোমার কবিতায় আমি না দেখা নদীর উচ্ছলতার শব্দ শুনেতে পেয়েছি। তোমার হাত ধরে আমার প্রেম মিশেছে পূজায়, আর পুজা মিশেছে প্রেমে।

সেই কোন ছোট্টবেলা থেকে কত যে দিয়েছো দু হাত ভরে। তাই আমি তোমার কাছে চির ঋণী। কবি গুরু তোমায় সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়ে তোমারই  কবিতার মধ্য দিয়ে এই লেখা শেষ করছি।

“দিনের আলো নিবে এলো সূ্য্যি ডোবে ডোবে।

আকাশ দিয়ে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।

মেঘের উপর মেঘ করেছে, রঙের উপর রঙ।

মন্দিরেতে কাঁসর ঘন্টা বাজল ঢং ঢং।

ও পারেতে বিষ্টি এলো, ঝাপ সা গাছপালা।

এপারেতে মেঘের মাথায় একশ মানিক জ্বালা।

বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে ছেলেবেলার গান –

বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এলো বান।”

এই কঠিন সময়ে তুমি আমাদের অন্তরের ভিতরে থেকে সাহাস যুগিয়ে যাও। আজকের এই মহামারির দিনে, কবিগুরু এ যে বড্ড জরুরি।


লেখিকা পরিচিতিঃ কাকলির জন্ম এবং পড়াশুনা কলকাতায়। সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর ছাত্রী। বর্তমানে কাকালি কানাডার ক্যালগেরি শহরে থাকে সপরিবারে।  পেশায় কাকলি  ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালগেরির শুলিক স্কুল অফ ইঞ্জিনীয়ারিং -এ সিনিয়ার রিসার্চ অ্যাডভাইসার। অনেক  দেশ  ঘুরেছে। লেখা তার বহুদিনের সৃষ্টিশীল ভালোবাসা। তার লেখায় ছুঁয়ে  থাকে প্রকৃতি, প্রেম পূজা আর মানুষের কাহিনী। কিছু গভীর অনুভবের আর অনুপ্রেরণার উপলব্ধি। সে লেখে নানা স্বাদের ছোট গল্প, প্রবন্ধ, আর ভ্রমণ কাহিনী। তার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে দেশ, সাপ্তাহিক বর্তমান ও অন্যান্য পত্রিকায়।

3 thoughts on “সহচরীর কলমে/ এপ্রিল ২০২০

  1. আমার দুই সহচরীর এই রচনায় আমি শুধুই পুলকিত নয়, গর্বিত ও বটে। এত বছরের , দীর্ঘ স্কুল জীবনে প্রতিদিন এদের কাছ থেকে দেখে ও কত কিছু অজানা থেকে যায়! ধন্যবাদ অরুন্ধতী এই প্রতিবেদনটির জন্যে।

    Like

  2. কাকলি, তোর লেখা পড়তে সবসময়ই খুব ভালো লাগে।এর আগের ভ্রমণ কাহিনী গুলোর মতো ই এই লেখাটা ও খুব সাবলীল ও স্বচ্ছ লেখা হয়েছে।

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s