সহচরী ৯ রোজমেরী মিতু রিবেইরো

Sahachari 4Mitu 5

 

 

জুলাই মাসের সহচরী হলেন মেরীল্যান্ডবাসী রোজমেরী মিতু রিবেইরো। বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতিক ডেলিগেট হয়ে বিদেশে নৃত্য পরিবেশন করেছেন একাধিকবার। ফোক্‌ড্যান্স করেন, এদেশে এসেও নাচ বন্ধ হয়নি। নিজের একটি নাচের স্কুল আছে, এবং ডেলি ও পাব (গিলিস্‌) একাই চালান। নাচ তার ভালোবাসা, Early Childhood Education নিয়ে  পি এইচ ডি করছেন। এহেন একটি সাহসী মেয়ের গল্প এবার আপনাদের কাছে বলব, তবে শুরু করতে হবে রোজমেরীর ছোটবেলা থেকে।

রোজমেরীর জন্ম পুরোনো ঢাকা লক্ষীবাজার অঞ্চলে।দুই ভাই, দুই বোন-সবচেয়ে ছোট মিতু।বাবা ছিলেন সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের অ্যাসিন্টেট ভাইস্‌ প্রিন্সিপ্যাল।এই স্কুলে তার দাদারা পড়াশুনা করেছে। মিতু আর তার দিদি পড়েছেন সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার হাই স্কুলে। ছোটোবেলা থেকেই নাচ তার ভালো লাগে। চার বছর বয়স থেকেই নাচের শুরু। ১৯৭৭ সালে ৭ বছর বয়সে জাগো আর্ট সেন্টারে তার নাচের প্রশিক্ষণ শুরু হল। তারপর আর থামেন নি। ১২ বছর ধরে শিখেছেন লোকনৃত্য (প্রধান), ভারতনাট্যম, কত্থক, মণিপুরী নাচ।লোকনৃত্যের গুরু গওহর জামিল। গুরু ১৯৮১ সালে পথ-দূর্ঘটনায় মারা যান। ভারতনাট্যম শিখেছেন বিলায়েত হোসেন খানের কাছে আর কত্থকের গুরু শ্রী নিকুঞ্জবিহারী পাল।

Mitu 2

মিতুর নাচের অনপ্রেরণা হলেন তার মা। মায়ের একান্ত ইচ্ছা আর উদ্যমে মিতুর নাচের জীবণে প্রবেশ সেই ছোট্টবেলা থেকে। দিদি গান গাইতেন, ছায়ানটের ছাত্রী, বড়দাদা গিটার বাজাতেন আর ছোটভাই তবলায়। পুরো পরিবারটি সুর, লয়, তাল, নাচ ও গানে মেতে উঠতেন।

এখানে শিশুশিল্পী হিসেবে মিতুর কিছু পুরস্কার প্রাপ্তির কথা বলি।১৯৭৭ সালে ঢাকা বেতারকেন্দ্রের ২৫ বছর জুবিলীতে শিশু-শিল্পীদের লাইভ নৃত্যনাট্য পরিবেশিত হয়। এখানে মিতু বিশেষ পুরস্কার পান শিশুশিল্পী হিসেবে।এছাড়াও বেতারে “কলকাকলীর আসর” নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন শিশুশিল্পী হিসেবে। এরপর ১৯৮১ তে জাতীয় নাট্য প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী, ১৯৮৬ সালে কত্থকে বাংলাদেশ জাতীয় শিশু পুরস্কার পান। এই প্রতিযোগিতা পাঁচটি পর্যায়ে হয়েছিল- জেলা, উপজেলা, আঞ্চলিক, বিভাগ ও জাতীয়।

এদিকে পড়াশুনা চলেছে জোরকদমে। ম্যাট্রিক পাশ করে উইমেন্স্‌ ফেডারেশন কলেজে কমার্সে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি এ পাশ করে মাস্টার্স করেন আকাউন্টিং এর ওপর। ইতিমধ্যে তিনি সরকারী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ টিভির এনলিষ্টেড আর্টিষ্ট। নিয়মিত প্রোগ্রামের জন্য ডাক পান। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাপানে ওকায়ামা ইন্টারন্যাশন্যাল ফেষ্টিভ্যালে ১৫ দিন লোকনৃত্য পরিবেশন করে্ন। ১৯৯৩তে সাউথ কোরিয়া যান সরকারের পক্ষ থেকে  ফেস্টিভ্যাল এক্সপো ৯৩। ১৯৯০-১৯৯৪ সার্ক কনফারেন্স ও সার্ফ গেম্‌স সরকারী নৃত্যশিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন।

এদেশে এলেন ১৯৯৫ এর শুরুতে, বিয়ে হল। নাচ চলতে লাগল। যখন যেখানে সু্যোগ পান, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন, অন্যদের নাচ শেখান আর মনে আনন্দ পান। ১৯৯৮  সালে বড়ছেলে হল। ইতিমধ্যে ২০০০ সালে এম বি এ করলেন ডাউলিং কলেজ (Dowling College)।২০০২ তে ছোটছেলে এল। ইতিমধ্যে Early Childhood Education  এ degree নিয়ে Little Sunshine Learning Center  খুলে ফেললেন বাড়িতেই। বেশ কিছুদিন চলল। ইতিমধ্যে ২০০৭ সালে Education  এ Ph.D র কাজ করতে শুরু করেন Walden University। সে কাজ এখনও শেষ হয়নি। ২০১৩ এ আবার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে  Johns Hopkins University তে Program Quality Control Specialist হিসেবে ২ বছর কাজ করেন। ২ বছর Childcare Center এর Director হয়ে কাজ করেছেন। ব্যাক্তিগত জীবনে ২০১০ সালে মাকে হারান। মা ছিলেন তার সবকিছুর প্রেরণার মূলে। Ph.D শুরু করা মার উৎসাহে। ২০১৮ তে বাবাও চলে গেলেন।

মিতুর নাচের স্কুলের নাম সৃষ্টি। এই নাচের স্কুলটির মূখ্য উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশের লোক-নৃত্য এবং সংস্কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সংরক্ষণ করা। এছাড়াও তাদের বিভিন্ন নাচ সম্বন্ধে প্রশিক্ষণ দেওয়া। ২০১০ থেকে নাচের প্রোগ্রাম করেছে সৃষ্টি স্কুল। ২০১৬ তে “Peace through dance” প্রোগ্রামটি বেশ সুনাম অর্জন করেছিল।

Mitu 6

এবার আসি রোজমেরীর জীবনের বর্তমান পর্বে। ইচ্ছা হল নিজের বিজনেস করবেন। এ ব্যাপারে অনেক ভেবেচিন্তে ২০১৮ র নভেম্বর মাসে Gilly’s deli and pub এর বিজনেস take over করলেন। এই পাবটির অনেক পুরোনো customer/patron আছেন যারা নিয়মিত আসেন এবং এই ডেলি ও পাবটিকে ভালোবাসেন। এর আরেকটি কারণ হল রোজমেরী বিজনেসটি কেনার পর খুব একটা অদল-বদল করেন নি। ম্যানেজার এবং পুরোনো কর্মীরা সবাই কাজে বহাল আছেন। কাজেই যারা আগে আসতেন মালিকানা বদলের আগে, তাদের কাছে পাবটি আছে আগের মতোই, এমনকি মেনুও। আমার Gilly’s এ গিয়ে Cheers  টিভি সিরিয়ালটির কথা মনে পড়ে গেল। একদম সেইরকম আন্তরিক পরিবেশ আর আছে একটা কিছু যা Gilly’s এর নিজস্ব। গত ছয় মাসের মধ্যে Blackflag  এর সঙ্গে collaboration এ বেরিয়েছে “Celebrew” এটা Gilly’s -এর নতুন ব্র্যান্ড। 6.8 HPA  টেষ্টলেভেল,  যা সবাই খুব পছন্দ করে। এই প্রথম নিজের ব্র্যান্ডের কিছু বার করে খুব আনন্দ পেয়েছেন রোজমেরী এর আগে কখনো Gilly’s এর নিজস্ব কিছু বেরোয়নি। কাজেই এর মধ্যে Creativity -র একটা আনন্দ তো আছেই। এখানে মূলতঃ Craft Beer  (tap beer) ,Can  beer, Wine, Vegetarian wine  পাওয়া যায়। এদের ডেলির স্যান্ডুইচ নিজস্ব।খুব নাম আছে।

Mitu 3

এইপ্রসঙ্গে একটু বিয়ার সম্বন্ধে বলে রাখি। বিয়ার তৈরী করাকে বলে ব্রিউয়িং। মল্ট কে প্রথমে ছোট ছোট টুকরোতে ভেঙ্গে, তার সঙ্গে এন্‌জাইম মিশিয়ে কিছুদিন রাখা হয়। তারপর ইষ্ট (Yeast) দিয়ে ফারমেন্টেশন ভ্যাট (Fermentation Vat) -এ রাখা হয়। এর সঙ্গে মেশানো হয় হপ্‌স (Hops)  নামে একধরণের লতানো গাছ (vine)। হপ্‌স-এর অ্যান্টি- ব্যাকটিরিয়াল গুণ ব্যাকটিরিয়া জন্মাতে দেয় না ভ্যাটের মধ্যে। আর আছে হপ্‌স -এর বিশেষ কেমিক্যাল যা বিয়ারের স্বল্প তেঁতো স্বাদের কারণ। নিউ বেলজিয়াম ব্রিউয়িং কম্পানির বিয়ার তৈরীর এক নতুন উপকরণ হল হেম্প (Hemp)। উদাহরণ হিসেবে যদি বলি Hemperor HPA is 7% HPA , তাহলে মানে হল এটা এক ধরণের পেল এল (Pale Ale) ব্রিউ করা হয় হপ্‌স (এক ধরণের গাছ, যেটি দিয়ে ওয়াইন ও বিয়ার ব্রিউ করা হয়) ও হেম্প দিয়ে। এবারে বলি “পেল এল” এর কথা।এটি এক ধরণের বিয়ার তৈরী হয় “পেল মল্ট” থেকে যাতে মল্ট ও হপ্‌স সমান অনুপাতে থাকে।যেমন, IPA, India Pale Ale, এক ধরণের হপ্‌স সমৃদ্ধ বিয়ার “পেল এল” জাতীয় বিয়ারের মধ্যে পড়ে। আরো আছে, Double IPAs, Imperial IPAs, অ্যালকোহল ৭.৫%।

Mitu 1aগিলিস্‌ পাবে HPA, IPA জাতীয় প্রচুর বিয়ারের স্টক আছে যার জন্য বিয়ারপ্রেমীরা নিয়মিত আসেন তাদের এই প্রিয় পাবে বিয়ার পান করতে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডার স্বাদ নিতে। এছাড়াও মিতু তার পাবের কর্মীদের নিয়ে শুরু করেছেন Celebrew Outdoor Celebration। যা বিক্রী হয়, তার ১০% যায় অন্ধদের সাহায্যে জন্য। আরেকটি Outdoor Activity হল Oktoberfest , একটি ফেষ্টিভ্যালের মতো। এটি তার পাবের পুরোণো Patron দের অনুরোধে নতুন শুরু হয়েছে- বিয়ার আর মিউজিসিয়ানদের নিয়ে Outdoor fun। এছাড়াও গিলিস্‌-এর নিজস্ব ওয়েবসাইট, ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রাম (Website, Facebook, Instagram)আছে। এখানে কিছু বিয়ারপ্রেমী মানুষ আসেন যারা প্রত্যেকে ডক্টরেট করেছেন বিয়ার ব্রিউয়িং এর ওপর। এরা এখানকার স্থানীয় খবরের কাগজে তারা নিয়মিত লেখেন মেরীল্যান্ড ও বাইরের ব্রিউয়ারী সম্বন্ধে। প্রত্যেক মাসের দ্বিতীয় সোমবার তারা মিলিত হন তাদের এই প্রিয় পাবে কিছুক্ষন সময় কাটাতে। গিলিস্‌ এর নিজস্ব ওয়াইন ক্লাস হয়(Wine class) প্রত্যেক quarter-এ। মিতু জানালেন একটি দম্পতির কথা। তাদের প্রথম আলাপ এই পাবে, পরে বিয়ে করেছে এবং এখনো আসে এই পাবে। মিতুর কথায় গিলিস্‌ একটি ঘরোয়া, ফ্রেন্ডলি ডেলি ও পাব যেখানে কর্মীরা খুব সমঝদার এবং রেগুলার প্যাট্রনদের তাদের নামে চেনে।

এতক্ষণ বলছিলাম মিতুর কথা। এবার শেষ করার আগে তার ছেলেদের কথা একটু বলি। ছেলেরা বড় হয়ে গেছে। বড়ছেলে কলেজে আর ছোটছেলে সামনের বছর হাইস্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েট করবে। দুইছেলেই আমেরিকান ফুটবল, বাস্কেটবল খেলে। বড়জন তাইকোওনডু তে 3rd degree blackbelt, ছোটজন 2nd degree blackbelt। মিতুর পরিবারের সবাই (দুই দাদা ও দিদি) মেরীল্যান্ডবাসী। বাবা ও মা মৃত্যুর আগে ওবধি মেরীল্যান্ডেই বাস করেছেন।

মিতুর সম্বন্ধে আগেই শুনেছিলাম। কথা বলে আরো অনুপ্রাণিত হলাম।মিতুর কথায় নাচ তার প্যাশন, এডুকেশন নিয়ে পি এইচ ডি করছেন, এরি পাশাপাশি বিজনেস ‘গিলিস্‌” চলছে। আমার এই সহচরীর জন্য আমার একান্ত শুভেচ্ছা রইল।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s