সহচরী ৭ সুকন্যা ঠাকুর মুখ্যার্জী

কবিগুরুর জন্মতিথি উপলক্ষে এবার আমার সহচরী ৭ হলেন ঠাকুরবাড়ীর মেয়ে সুকন্যা ঠাকুর মুখার্জী। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর সুকন্যার প্রপিতামহ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন গগনেন্দ্রনাথের কাকা। পিতামহ কনকেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন গগনেন্দ্রনাথের ছোটছেলে। এই হল বাবার দিকের পরিচয়। মায়ের দিক থেকে চিল্ড্রেন্স লিটিল থিয়েটার (সি এল টি) বা অবনমহলের সৃষ্টিকর্তা শ্রী সমর চ্যাটার্জী হলেন তার মাতামহ।এই দাদু ছোট্ট সুকন্যার (ঝুমকু)জীবনে খুব প্রভাব ফেলেছেন। বাড়ীতে গান-বাজনার পরিবেশ ছিল। যোগসাহেব (ভি জি যোগ) খুব আসতেন। দেখেছেন দাদুর সঙ্গে সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণা্ন, জওহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধীর ছবি। কিন্তু সেগুলো কোনোদিনই ডিস্প্লেড হয় নি।দাদু ছবি টাঙিয়ে রাখায় বিশ্বাস করতেন না।বাড়িতে প্রচুর নামীদামী লোক আসতান দাদুর সুত্রে। সি এল ট তে ছোট্ট ঝুমকুর যাওয়া শুরু হয় ৩ বছর বয়স থেকে। তখন সি এল টির অবস্থান ছিল দেশপ্রিয় পার্কের একটি ভাড়া বাড়িতে।এরপর ডাঃ বিধান রায়ের ডোনেট করা জমিতে তৈরী হয় সি এল টি। এর সংক্রান্ত একটি খেলার মাঠ ছিল। কিন্তু সেটি আর খেলার মাঠ হিসেবে রাখা যায় নি। দাদু সমর চ্যাটার্জী  অনেক উদ্যমে অনেক গ্রান্ট পেয়ে অবনমহল তৈরী করেন।

ছোটবেলা থেকেই অবনমহলের এই স্রষ্টার প্রভাব পড়েছিল  ছোট্ট সুকন্যার ওপরে।স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে কোনোরকমে হোমওয়ার্ক শেষ করেই গাড়িতে চেপে বসতেন সি এল টি যাবার জন্য।ক্লাসে গিয়ে বসে নাচ দেখতে তার খুব ভালো লাগত।কিন্তু দানুর ধারণা ছোট্ট ঝুমকুর নাচ হবে না। দিদা মোটেই মানবার পাত্রী নন। একদিন দিদা দক্ষিনীতে ভর্তি করে দিলেন নাচ শেখার জন্য।সেই হল নাচের শুরু। লরেটো স্কুলে পড়েন সুকন্যা। রক্তে আছে নাচের ছন্দ!সেখানে বিখ্যাত পলিটিক্যাল লিডার সাধন গুপ্তর মেয়ে চান্দ্রেয়ী ছিল তার সঙ্গী। চান্দ্রেয়ী ভালো গান গাইতো। দুজনে মিলে একসঙ্গে প্রোগ্রাম করতেন।লরেটোর নানরা বলতেন গুপ্তা আন্ড টেগোর সিঙ্গিং ডান্সিং  টিম।স্কুলের মেয়েদের নাচ শিখিয়ে রবিঠাকুরের নৃত্যনাট্য করিয়েছেন স্কুলের ফাংসানে বহুবার।ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে লিডারশিপের একটা প্রবণতা ছিল।একবার চন্ডালিকা নৃত্যনাট্য হচ্ছে তার তত্ত্বাবধানে, তিনি করছেন “আনন্দ”-এর রোল। সবাইকে তৈরী করিয়ে নিজে যখন “আনন্দ” হয়ে স্টেজে ঢুকছেন, তখন তার  মাথায় বিনুনী আর চোখে চশমা! সবাইকে তৈরী করিয়ে নিজে রেডী হতে ভুলেই গেছেন! এইভাবেই তরতর করে স্কুলের সিনিয়ার কেম্ব্রিজ পাশ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকনমিক্স নিয়ে পড়তে ঢুকলেন। জিওলজীতে পড়ার ইচ্ছা ছিল। প্রেসিডেন্সীতে চান্স পেয়েছিলেন। কিন্তু দাদুর একদম ইচ্ছা ছিল না তার আদরের নাতনীর ফিল্ডট্রিপে যাওয়ায়।

এরমধ্যে ১৯ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে গেল। স্বামী শমীন মুখ্যার্জী, পেশায় ইঞ্জিনীয়ার।শ্বশুরবাড়ি ছিল খুব উদার।শ্বশুর ছিলেন উদার, শাশুড়ি আর্টস্কুলে পড়েছেন। স্বামী শমীনের দাদু ছিলেন শ্রী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। বিয়ের পরপর পার্ট ওয়ান পরীক্ষা। কিছুতেই দিতে চাইছিলেন না। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির নির্দেশ “পরীক্ষা তোমাকে দিতেই হবে”। অগত্যা কি আর করা! পরীক্ষা দিতে হল। পার্ট ওয়ান আর পার্ট টু পাশ করে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়তে ভর্তি হলেন নৃত্য নিয়ে। বি এ পাশ করার ক্রেডিট তিনি সম্পূর্নভাবে দেন তার শ্বশুরবাড়ীকে।ঝুমকু বারংবার স্বীকার করেন তার শ্বশুরবাড়ীর উদারতার কথা। এম এ পড়ার সময় রবীন্দ্রভারতীতে ক্লাস করে গুরুজীর কাছে নাচ শিখে প্রত্যেকদিন রাত ১২টা থেকে দুটো ওবধি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে স্বামীর সঙ্গে বাড়ি ফিরতেন। বাড়ী থাকতেন সাকুল্যে প্রায় ৬ ঘন্টা।

ইতিমধ্যে বেশ কিছু ধরনের ক্ল্যাসিক্যাল ড্যান্সে ট্রেনিং নেওয়া হয়ে গেছে। তবে তার বিশেষ পারদর্শিতা হল ওড়িসি নাচে। পদ্মবিভূষণ গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র তার ওড়িসি নাচের গুরু। এছাড়াও শ্রী বালাকৃষ্ণ মেনন এবং শ্রী চিত্রেশ দাসের কাছে নাচ শিখেছেন। এম এ পাস করলেন গোল্ড মেডেল নিয়ে। এম এ পাশ করে পি এইচ ডি করার ডাক পেলেন সঙ্গীত নাটক একাডেমীতে শ্রীমতী কমলা দেবী চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। বলেছিলেন সোম থেকে শুক্র এখানে থেকে পি এইচ ডির কাজ করবে, তারপর শনি-রবিবার বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু ততদিনে এদেশে আসার ডাক পেয়ে গেছেন স্বামী। শমীন পড়তে এলেন এম আই টি তে, বোষ্টনে।ঝুমকু আসিন্টেটসিপ পেয়েছিলেন স্ট্যানফোর্ড এ। কিন্তু যান নি স্বামীকে ছেড়ে। এই নিয়ে তার কোনো দুঃখ নেই। স্বামী কোনোদিন তার কোনো কাজে বাঁধা দেন নি।

এরপর পাড়ি আমেরিকায়। সময়টা ১৯৮৪ সাল।প্রথমে আভন প্রোডাক্ট সেল করতেন। এরপর কেম্ব্রিজে একজন প্রফেসারের কাছে ডাটা প্রসেসিং এর কাজ করেছেন কিছুদিন।এরমধ্যে হারভার্ড এ সামার স্কুলে কোরিওগ্রাফি নিয়ে কাজ শিখলেন কিছুদিন।

বছরখানেক বাদে স্বামীর সাথে ওয়াসিংটন ডিসিতে চলে এলেন। অনেক নাচ করেছেন লোকাল অনুষ্ঠানে। একবার সংস্কৃতিতে পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর গানের পর নাচ করেন। ১৯৮৭ সালে মেয়ে হল। কিন্তু নাচ থেমে থাকেনি। যে যখনি ডাকত, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করতেন। মেয়ে একটু বড় হলে নাচ শেখাতে শুরু করলেন। সেই সময়ে কমুউনিটির বাচ্ছাদের নিয়ে দাদুর তৈরী সি এল টির “অবনপটুয়া” করলেন।সেই থেকে স্কুল তৈরী করার কথা মাথায় এল।প্রথমে তিনটে বাচ্ছা নিয়ে স্কুল আড়ম্ভ হল।১৯৯৩ সালে তার স্কুল ময়ূর এর শুরু। এখন বড় স্কুল হয়েছে। ১৯৯৩-২০১৯, প্রায় ২৬ বছর ধরে স্কুল চালিয়ে যাচ্ছেন ঠাকুর পরিবারের এই মেয়ে।

বেশীরভাগ চ্যারিটি প্রোগ্রাম করেন। অর্থ যা ওঠে, ফুড ব্যাংকে দিয়ে দেন।ময়ূর এর মধ্যে কলকাতায় গিয়ে চ্যারিটি প্রোগ্রাম করে প্রায় ১ লাখ টাকা সি এল টি তে ডোনেট করা হয়েছে। আরেকটি কথা লেখা খুব জরুরী। ময়ূরের ছাত্র-ছাত্রীদের নাচের পোষাক- যা মঞ্চে নাচার জন্য খুবই দরকারী।ড্রেস এর ফ্যাব্রিক, ডিসাইন, রঙ পছন্দ করা, বানানো এবং দেশ থেকে নিয়ে আসা- সবই তিনি করেন।

অনেক ছাত্র-ছাত্রী তৈরী করেছেন। স্বামী খুব চাকরীসুত্রে ট্যুরে যান। তাই তিনি নিজে বাড়িতে নাচের স্কুল নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। সুকন্যার মতে নিজে কাজ করে খুশী থাকাই ভালো। ১০০ জনের মধ্যে ১০ জন সত্যিকারের নাচের শিল্পী তৈরী হয়। তাই তিনি এই ভবিষ্যত প্রজন্মকে নিয়ে নাচের শিল্পী তৈরী করার প্রচেষ্টায় মেতেছেন। মেয়ে মিশকাকে নিজে হাতে তৈরী করেছেন। সেও ভালো নাচে। ময়ূরের হয়ে প্রোগ্রাম করে।

সুকন্যা মানুষ খুব ভালোবাসেন। ভালো লাগে আড্ডা দিতে। বেড়ানো আর নাচ এই তার দুই প্যাশন। প্রচুর দেশ ঘুরেছেন। সবচেয়ে ভালো লেগেছে জর্ডন। তবে চয়েস করতে বললে, তিনি নাচকেই নেবেন। তার নিজের কথায়- “নাচ যখন করবে শুধু যদি আনন্দ নিয়ে করো তবেই ভালো লাগবে। যদি আনন্দ না পাও তবে ফল ভালো হবে না”।

মেয়ে মিশকা, ছেলে সাগ্নিক দুজনেই চাকরী করে। এখন বাড়িতে শুধুই স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু বাড়ি মোটেই খালি নয়। রোজই চলে ময়ূরের নাচের ক্লাস। এই নিয়েই বেশ আছেন সুকন্যা। আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল সুকন্যার জন্য।

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s