সহচরী ৩/ শ্রীরূপা মিত্র

Sahachari 4

২০১৯ এর প্রথম এবং আমার সহচরী ৩ হলেন ৫০ বছরের আমেরিকা-প্রবাসী এবং আদ্যন্ত কলকাতার মেয়ে শ্রীরূপা মিত্র। বাঙ্গালি দের কাছে শ্রীরূপা, আমেরিকান বন্ধুদের কাছে শ্রী আর আমার শ্রীদি।

ঠাকুরদা রায়সাহেব জিতেন্দ্রনাথ রক্ষিত গাজীপুর ওপিয়াম ফ্যাক্টরি শুরু করেন। পেশায় ও নেশায় কেমিষ্ট মানুষটি যুক্ত ছিলেন ক্যালকাটা কেমিক্যাল্‌স সঙ্গে।এই পরিবারটি বর্ধমানের অকালপোষের জমিদার পরিবার। এখনও এদের পারিবারিক দূর্গাপূজা হয়। মার দিকে দাদামশাই সতীশচন্দ্র মিত্র ছিলেন প্রথম ভারতীয় রেজিষ্ট্রার।ভীষণভাবে প্রিয় মামাবাড়ীটি আর্মহার্ষ্ট স্ট্রিটে। এখনও কলকাতায় গেলে শ্রীরূপা এখানে বেশ কিছুদিন সময় কাটান।

বাবাকে শ্রীরূপার মনে পড়ে খুব সুন্দর ও আকর্ষনীয় মানুষ হিসেবে। ইঞ্জিনীয়ার ছিলেন। শিকার করতেন, শিকারের মাংস রান্না করে খাওয়াতে ভালোবাসতেন, বেদে দিয়ে সাপ ধরাতেন। বাবা ছিলেন Spontaneous, adventurous। কলকাতায় মানিকতলায় পৈতৃক বাড়ীতে বেশ দিন কাটছিল এই পরিবারটির। অকস্মাৎ্‌ বিপর্যয় ঘটল।মাত্র ৪৫ বছর বয়সে করোনারী অ্যাটাক হয়ে বাবা মারা যান।শ্রীরূপা তখন সাড়ে ষোল, ভাই আট, মা অসহায়। এই সময় দাদুকে পাশে পেয়েছেন। মামাবাড়ীর ভরসা না পেলে পরিবারটি হয়ত ভেসে যেত। সেই কৈশোর থেকেই তিনি মা আর ভাইয়ের ভরসা। লরেটো থেকে সিনিয়ার কেম্ব্রিজ পাশ করে কাগজে অ্যাড দেখে মেয়েদের ইংলিশ পড়িয়েছেন কিছুদিন।

যাদবপুর বিশববিদ্যালয়ে Electronics and Telecommunications engineering পড়তে শুরু করেন স্কুল পাশের পর। তাদের ক্লাসে ছিল তিনজন মেয়ে। ৫ বছরের কোর্স।অরূপ মিত্রের সঙ্গে আলাপ যাদবপুরে পড়তে পড়তে। অরূপ ও ছিলেন Spontaneous adventurous। বোধহয় সেইখান থেকেই ভালোলাগা আর ক্রমে ক্রমে ভালোবাসায় পরিণত হয়। ১৯৬৯ সালে বিয়ের পর আমেরিকায় পাড়ি দিলেন দুজনে। পিট্‌সবার্গ শহরে বাসা বাঁধলেন। দুজনেরি ইচ্ছা মাষ্টার্স করবেন। ভর্তি হলেন ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু শ্রীর ভালো লাগলো না পড়তে। তিনি চাকরী দেখতে শুরু করেন। কিন্তু চাকরী পাননি বেশ কিছুদিন কারণ তিনি মহিলা ইঞ্জিনীয়ার। সময়টা ১৯৬৯। যারা জুলিয়া রবার্টস এর “মোনালিসা স্মাইল” দেখেছেন তারা জানবেন। যারা দেখেননি তাদের মনে করিয়ে দিই ১৯৫০-১৯৭০ অবধি মেয়েদের পড়ার বিষয় ছিল “হোম সায়েন্স”- এতে সেখানো হতো কিভাবে ভালো ঘরনী হওয়া যায়। সেই সময়ের একজন ইঞ্জিনীয়ার তায় মহিলা- নৈব নৈব চ! অনেক চেষ্টার পর L.K. Comstock এ Drafting এর কাজ পান। এদিকে এদেশে এলেও শ্রীর খুব একটা ভালো লাগছিল না। বাড়ির জন্য মনখারাপ আর চাকরীতে একটু disillusioned অনুভব করছিলেন। ইতিমধ্যে অরূপ এম বি এ শেষ করে চাকরীতে যোগ দিয়েছেন। দুটি মিষ্টি কুকুর নিয়ে তাদের সংসার।

শ্রী Duquesne Light এ Senior Planning Engineer এর চাকরী পেলেন।প্রায় ২৭ বছর চাকরী করেছেন এখানে।এখানে তিনি প্রথম ভালো কাজের পরিবেশ পান।ইতিমধ্যে ব্যাক্তিগত জীবনে পরিবর্তন এসেছে। অরূপের সঙ্গে তার ডিভোর্স হয়ে গেছে। শ্রী একাএকাই তার নিজের জীবন গড়ে তুলেছেন। অসম্ভব স্বাবলম্বী এই মানুষটিকে কখনই কিছু কাবু করতে পারেনি। শ্রীর মতে তিনি কখনো discriminated  হননি গায়ের রং এর জন্য, কিন্তু মহিলা ইঞ্জিনীয়ার হিসাবে কাজ করতে গিয়ে discriminated হয়েছেন। যখনি  কোনো কনফারেন্সে গেছেন ও অন্যান্য মহিলা ইঞ্জিনীয়ারদের সঙ্গে দেখা হয়েছে এবং তাদের কাছেও এই একই কথা শুনেছেন।

ইতিমধ্যে আমেরিকায় Economic crisis  এলো। সময়টা ২০০১ এর পর। অনেকের সাথে শ্রীও চাকরী হারালেন। এরপর অ্যালেনটাউনে কিছুদিন চাকরী করেন। এরপর আবার তার প্রিয় পিট্‌সবার্গে ফিরে আসেন এবং Mitsubishi তে যোগ দেন। পাঁচ বছর কাজ করার পর অবসর নেন। এতদিনে অনেকদিন কাজ করেছেন, পরিবারের প্রতি অনেক কর্তব্য করেছেন। এবার তার অবসর নেবার পালা। দেখতে দেখতে ১০ বছর হয়ে গেল শ্রী খুব আনন্দের সঙ্গে তার অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, প্রতিদিন জিম এ গিয়ে এক্সেসাইজ, দেশবিদেশ ভ্রমণ- এই নিয়েই দিব্যি সময় কেটে যাচ্ছে। অনেক দেশ ঘুরেছেন শ্রীরূপা। কখনো একা, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে।সবথেকে ভালো লেগেছে কেনিয়া। ছবির মতো সুন্দর বাড়ী তার। বাড়ীর দেখাশুনা, গাছের পরিচর্যা করে তার দিন কেটে যায়। কলকাতা যান বছরে একবার। দেশে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে ভালো লাগে।

শ্রীরূপা একা, কিন্তু একাকীত্বে ভোগেন না। সবকিছুই নিজে করেন, কারুর ওপর নির্ভর করেন না। নিজেকে অপূর্ণ মানুষ ভাবেন না। সেই ষোলবছর বয়স থেকেই তিনি মা আর ভাইয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং সারাজীবন ধরে পালন করেছেন। তার মতে জীবনে অনেক ঝড়ঝাপটা আসে, কিন্তু উঠে দাঁড়াতে হয়। তার মতে জীবনে অনেক ঝড়ঝাপটা আসে, কিন্তু উঠে দাঁড়াতে হয়।তিনি তার সব দায়িত্ব পালন করেছেন। বাবা মারা যাবার পর থেকে মা আর ভাই-এর দায়িত্ব নিয়েছেন। মা কয়েক বছর হল মারা গেছেন।

শ্রীর বক্তব্য প্রবাসী বাঙালি মেয়েদের প্রতি – আরো mainstreamed হওয়া উচিত।নিজেদের ethnicity ভালো কিন্তু তার বাইরেও একটা জগত আছে। অন্যান্য মানুষের সাথে মেশা উচিত। বাঙ্গালি মেয়েদের আরো এগিয়ে আসা উচিত। আরো আত্মবিশ্বাসী হওয়া উচিত। বাঙ্গালি মেয়েরা অনেকেই খুব শিক্ষিত কিন্তু নিজের ক্ষমতার ওপর অতটা বিশ্বাস নেই।

     শেষ করার আগে বলে রাখি আমার সঙ্গে শ্রীর আলাপ পিট্‌সবার্গ শহরে আসার আগেই। এখানে এসে বন্ধুত্ব হয়েছে। যদিও তিনি প্রায়ই বলে থাকেন তিনি আমার মায়ের বয়সি, তবুও আমি তাকে একজন বন্ধু বলেই ভাবি। বন্ধুত্ব অনেক রকমের হয়। ঠিক এক বাক্স চকোলেটের মতো- বাইরে থেকে দেখতে হয়ত একই, কিন্তু খেলে একে্কটা একেক রকম। শ্রী সঙ্গে অনেক বিষয়ে আলোচনা করা যায়। বেশী ভালো লাগে তার গল্প শুনতে। শ্রীর সাহস আর প্রাণশক্তি আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমার এই সহচরী নিজের গুনে অপরূপা।

Advertisements

One thought on “সহচরী ৩/ শ্রীরূপা মিত্র

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s