সহচরী ২/ সুমিত্রা ভট্টাচার্য্য

Sahachari 4

সহচরী ২ সুমিত্রা ভট্টাচার্য্য

এবার আমার সহচরী পর্ব পোষ্ট করতে একটু দেরী হল। কাজের চাপে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমার সহচরী ২ হলেন সুমিত্রাদি- সুমিত্রা ভট্টাচার্য্য। দীর্ঘদিন পরিচয়। আমার ক্লীভল্যান্ড-জীবনের শুরু থেকে। শান্ত-শিষ্ট, স্নেহময়ী এই মানুষটিকে দেখলে বোঝা যায় না যে ভিতরে একজন শক্ত, দৃঢ়চেতা মানুষ আছেন।আরো গুন আছে, ক্রমশঃ প্রকাশ্য।

সুমিত্রার জন্ম কালিঘাটের পটুয়াপাড়া লেন -এর মামাবাড়িতে।কাছেই নিজেদের বাড়ি।সেখানে বড় হয়েছেন দাদু-ঠাকুমা, মা-বাবা ও পিসির স্নেহছায়ায়, দুই দাদা আর ছোটবোনের সংগে।আদি বাড়ি ছিল ঢাকায়। তারপর কলকাতা চলে আসে এই পরিবারটি।

বাবা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী ঢাকায়।পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে ঢাকা থেকে কলকাতা আসার সময় জাহাজে ধরা পড়ে যান। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে প্রায় বছর আষ্টেক কারাবন্দী ছিলেন।জেলে বন্দী থাকাকালীন বি এ পাশ করেন। মুক্তি পেয়ে ব্যাঙ্কে চাকরী পান। মা ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী। খুব ভালো গান গাইতেন। খুব অল্প বয়স থেকেই অনেক গানের প্রোগ্রাম করেছেন। ১৭ বছর বয়সে বিয়ে হবার পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ল। খুব ভালো সেলাই করতেন। মায়ের তৈরী করা জামা পড়ে বড় হয়েছেন চার ভাইবোন।

এরকম বাবা-মায়ের সন্তান যে বড় হয়ে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হবেন সেটা বলা বাহুল্য।পড়াশুনা দেবেন্দ্র বিদ্যাপীঠে। স্কুলের গন্ডী পেরিয়ে মুরলীধর গার্লস কলেজে ভর্তি হলেন বাংলায় বি এ পড়তে। পরীক্ষার সময় এল ঝড়- বাবা চলে গেলেন অসময়ে, মাত্র ৫০ বছর বয়সে। কলেজে পড়ার আগে থেকেই বাবার শরীর খারাপ। হাইপ্রেসার ছিল আগে থেকেই, স্ট্রোকও হয়ে গেছে।পরীক্ষার চার-পাঁচদিন আগে বাবা ভর্তি হলেন হাসপাতালে সার্জারী হবার জন্য।বাবার জন্য মনখারাপ হলেও যথাসময়ে পরীক্ষা দিতে বসলেন সুমিত্রা।এক্সামিনার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও লেখার খাতা দি্যে গেছেন। প্রথম পাতায় লিখতে গিয়ে পেনের কালিতে পাতা ঢেকে গেল। কোনোমতে লিখে পরীক্ষা দিয়ে বেড়িয়ে এলেন।সাধারণতঃ পরীক্ষার বিরতির সময় মা আসেন খাবার নিয়ে। বেড়িয়ে এসে দেখেন মা নেই, তার বদলে মাসী এসেছেন। একটু অবাক হলেন।মনে উদ্বেগ নিয়ে পরের পরীক্ষায় বসলেন।কিছুক্ষন বাদেই খবর এল বাড়ী থেকে লোক নিতে এসেছে। অর্ধেকলেখা খাতা জমে দিয়ে বেড়িয়ে এলেন।এসেই শুনলেন বাবা মারা গিয়েছেন সকাল দশটায়। মনে পড়ল ঠিক ওই সময়েই তো তার পরীক্ষার খাতা কালিময় হয়ে গিয়েছিল! মনে হল যেন বাবা জানিয়ে গেলেন যে তিনি চলে গেলেন।আর পরীক্ষায় বসতে চাইছিলেন না। কিন্তু মাষ্টারমশাই এর নির্দেশে ওই অবস্থায় পরীক্ষা দিলেন। মনে জানেন পাশ করার কোনো সম্ভাবনা নেই। রেসাল্ট বেরোলে দেখেন যে তিনি পাশ করেছেন। ঘটনাটা খুব অদ্ভুত তাই না! সুমিত্রার ও তাই মনে বিশেষভাবে দাগ কেটেছিল।

এর কিছুদিন বাদেই ১৯৬৯ সালে সুমিত্রা রায়ের বিয়ে হল ইঞ্জিনিয়ার দিব্যেন্দু ভট্টাচার্যের সঙ্গে। বিয়ের পর সবামীর বিশেষ ইচ্ছায় এম এ পড়তে শুরু করলেন। ১৯৭০ -এ দিব্যেন্দু এলেন আমেরিকার মেরীল্যান্ডের বাল্টিমোর শহরে।কিন্তু তখনো সুমিত্রার পড়া শেষ হয়নি। তখন রাজনৈতিক ডামাডোল চলছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরীক্ষার দিন পিছিয়ে যাচ্ছে, রেজাল্ট বেরোতে দেরী হচ্ছে।তার মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে পড়া শেষ করে ১৯৭১ সালে সুমিত্রা পাড়ি দিলেন আমেরিকায়।

বাল্টিমোর শহরে শুরু হল তাদের সংসার।ইতিমধ্যে স্বামী এম বি এ পড়তে শুরু করেছেন University of Maryland এ। সুমিত্রা IBM -এ কম্পিউটার ট্রেনিং এ ভর্তি হলেন। কাজ করলেন কিছুদিন Johns Hopkins University -তে। Data recording এর কাজ।বছর দুয়েক কাজ করে একটি consulting company Euelle & Bomhardt এ computer record keeping এর চাকরী পেলেন। কম্পিউটার ডিপার্টমেন্টের ছয়জনের মধ্যে তিনি একমাত্র মহিলা।সহকর্মীদের কাছে সন্মান পেয়েছেন। ইতিমধ্যে দিব্যেন্দু নতুন চাকরীতে যোগ দিয়েছেন।

ছেলে সায়ন এল ১৯৭৪ এর ডিসেম্বরে। তার আগে নভেম্বর অবধি কাজ করেছেন। মনস্থির করেছেন ছেলে পাঁচমাস হলে আবার কাজে ফিরে আসবেন। ছয়মাসের ছুটি মঞ্জুর হয়ে গেছে।ছোট্ট সায়ন কে নিয়ে চোখের নিমেষে কেটে গেল পাঁচমাস।ছেলের জন্য ডে কেয়ার ঠিক। কিন্তু যখন সময় এল, মায়ের মন কিছুতেই ছেলেকে পাঠাতে পারল না।অগত্যা আর কাজে যাওয়া হল না। ছেলেকে নিয়ে সুমিত্রা ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন। অনেক সময় কাটিয়েছেন ছেলের সঙ্গে।

ইতিমধ্যে তাদের বাসাবদল হয়েছে মেরীল্যান্ড, ভার্জিনিয়া ও মিশিগানে।মিশিগানে ছিলেন দেড়বছর। মেয়ে ঈশানীর জন্ম এখানে। এর ছয়মাসের মধ্যে দিব্যেন্দু বড় চাকরী নিয়ে BP তে যোগ দিলেন ক্লীভল্যান্ডে। জীবন ক্রমশঃ ব্যাস্ত হয়ে উঠেছে। সবামীর বড় চাকরী, ব্যাস্ত জীবন, ছেলে পড়াশুনা ও অন্যান্য extracurricular activity, ছোটো ঈশানী, সঙ্গে আছেন। ছেলের ১৩ বছর বয়সে তাকে একটি ভালো বোর্ডিং স্কুলে পাঠানোর ব্যাবস্থা হল। কিন্তু মায়ের মন মানবে কেন?খুব মনখারাপ। ছেলে চলে যাবার পর আবার চাকরী করা শুরু করেন ডে কেয়ারে।প্রথমে খুব অল্প সময় কাজ করতেন, কারণ মেয়ে তখনো ছোটো। মেয়ে হাই স্কুলে যেতে শুরু করলে সময় বাড়িয়ে দিলেন এবং রোজ যেতে শুরু করেন। বড় হয়ে ঈশানীও এই ডে কেয়ারে কাজ করেছে কিছুদিন। ৭ বছর কাজ করেন United Way র এই ডে কেয়ারে। এরপর অন্য একটি ডে কেয়ারে কাজ শুরু করেন full time employee হয়ে। ২৪ বছর কাজ করেছেন এখানে। এই দীর্ঘদিন কাজে অনেকবার award পেয়েছেন। Pride Award পেয়েছেন ১৯৯৮ তে।তিনি ছিলেন বাচ্ছাদের প্রিয়। বাবা-মাদের কাছে অনেক ভালোবাসা পেয়েছেন। তাদের অনেকে এখন তার ফেসবুক বন্ধু, যদিও বাচ্ছারা বড় হয়ে গেছে।

ইতিমধ্যে মেয়ে ঈশানীর বিয়ে হয়েছে এবং কর্মসুত্রে সে এখন ক্লীভল্যান্ডে। তার দুই ছেলে। ঈশানীর ছোট ছেলে হবার পর সুমিত্রা ঠিক করেন তিনি এবার ডে কেয়ার ছেড়ে দেবেন এবং নাতির সঙ্গে সময় কাটাবেন। কিন্তু তিনি বললে কি হবে, তাকে কর্মস্থল ছাড়বে না। এরকম কর্মনিষ্ঠ এমপ্লয়ী ছাড়তে তাদের মন চায় না। অবশেষে এল কাজের শেষদিন। সহকর্মীদের ও বাচ্ছাদের বিদায় জানিয়ে সুমিত্রা কাজ থেকে অবসর নিলেন।

এখন সবামী -স্ত্রী দুজনেই অবসর জীবন কাটান তাদের বিশাল বাড়ীতে। একা নয়, নাতিদের নিয়ে বাড়ী এখন গম্‌গম্‌ করছে। আর কি?  ৪৯ বছর বিয়ে হয়েছে। জীবনে সব কর্তব্য পালন হয়ে গেছে। ছেলে সায়ন Law farm partner New York এ থাকে। মেয়ে ঈশানী Clinical Psychology তে Ph.D করে এখন প্রাকটিস করছে।তাদের জীবন তাদের নিজস্ব।

আমার এই সহচরীকে নিয়ে লিখব ভাবলাম কারণ সুমিত্রা এমন একজন মানুষ যিনি খুব Simple – সবামী বিশাল চাকরী করেছেন, সুমিত্রার চাকরী করার কোনো দরকার-ই ছিল না। কিন্তু তিনি করেছেন, কারণটা তার কাছে বাচ্ছারা খুব প্রিয়। তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে তিনি ভালোবাসেন। শুধু তাই নয়, সুমিত্রা অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ।নিজের জীবনেও এবং কাজেও। সুমিত্রা এমন একজন মানুষ যিনি সবরকম মানুষের সাথে কথা বলতে পারেন। কোনো অহংকার নেই। আমি তার কাছে জীবনের অনেক শিক্ষা পেয়েছি এদেশে এসে। আমার এই সহচরী নিজগুনে অন্যন্যা।

Advertisements

2 thoughts on “সহচরী ২/ সুমিত্রা ভট্টাচার্য্য

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s