একটু আধটু কথা

Sahachari Pic 1

পুজো আসছে। আগামী ৭ই অক্টোবর মহালয়া। পুজো মানে আমার কাছে রেডিও তে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের মহালয়ার অনুষ্ঠান, ঢাকের আওয়াজ, ধুনোর গন্ধ, নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ আর পাড়ার মাইকে বাজা কিশোরকুমারের গাওয়া “তারে আমি চোখে দেখিনি” অথবা “নয়ন সরসী কেন ভরেছে জলে”। নতুন জামার গন্ধ এখনো চোখ বন্ধ করলে পাই। আমাদের বাড়ির কাছে দুটো পুজো হত। গোলপার্ক আর কাকুলিয়া। সকাল থেকেই গানের আওয়াজ আসত। মহালয়ার দিন ভোরে মহালয়া শুনতে শুনতে দক্ষিণেশ্বর যাওয়া, অষ্টমীর দিন সকালে উপোস করে নতুন শাড়ী পরে অঞ্জলী দিতে যাওয়া, ফিরে এসে বাবার আনা গাঙ্গুরামের খাস্তা কচুরী আর গরম গরম সিঙ্গারা দিয়ে চা খাওয়া, রাতে ঠাকুর দেখতে যাওয়া পাড়ায় পাড়ায়- কত স্মৃতি মনে ভিড় করে আসে। মায়ের ছিল অসম্ভব এনার্জি। আগে থেকে টিকিট কেটে রাখত বাসে করে ঠাকুর দেখার। সপ্তমীর দিন রাতে বেড়িয়ে পড়ত আমাদের নিয়ে। বাসে করে সারারাত ধরে কলকাতার ঠাকুর দেখা। আমাদের প্রায়  ৬-৭ জনের একটা দল হত। আমরা সারারাত ধরে ঠাকুর দেখে ক্লান্ত হলেও মার কোনো ক্লান্তি নেই। বাড়ী ফিরে অঞ্জলী দিতে যেত আমাদের নিয়ে।

এখন শুনেছি কলকাতায় পুজোয় সন্ধেবেলায় ঠাকুর দেখা অসম্ভব- এত ভীড়! লোকজন তৃতীয়া বা চতূর্থীর দিন রাতে ঠাকুর দেখতে বেরোয়। তবুও একবার কলকাতায় পুজো দেখতে যেতে ইচ্ছে করে। যাব একবার।

প্রবাসে পুজো অনেক ঘরোয়া। ষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী – এই পাঁচ দিনের পুজো সাধারণতঃ শুক্রবার সন্ধ্যে, শনি আর রবিবারের বিকেলের মধ্যে শেষ করা হয়। বিকেলের মধ্যে বলছি তার কারণ এরপর সব পরিস্কার করে গুছিয়ে তুলে নিয়ে যেতে হবে প্রতিমা সমেত, কারণ পুজো হয় ভাড়া করা বাড়ীতে। স্কুলবাড়ী্র কাফেতারিয়া  অথবা কোন বড় হল এ। কাজেই শুক্রবার সব জিনিষ নিয়ে সাজিয়ে পুজো, আবার পুজো শেষে রবিবার বিকেলে সব গুটিয়ে ফেলা। কিন্তু এই দুদিনে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী আর দশমী পুজো সব হয়। এরমধ্যেএ অষ্টমীতে -শনিবার সকালে অঞ্জলী থাকবেই। শনিবার দুপুরে খাবারের পর স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে অনুষ্ঠান হয়। কোনো কোনো জায়গায় সন্ধাবেলায় আরতি শেষে অনুষ্ঠান হয়। রবিবার দশমী পুজো। পুজো শেষ হলে ঠাকুর বরণ, সিঁদুরখেলা, ধুনুচি নাচ, তারপর খাওয়া। পুজো শেষ।পুজোর কর্মকর্তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম সার্থক। আসছে বছর আবার হবে বলে সব গুটিয়ে ফেলা। প্রবাসী হিসাবে আমার এই পুজো ভালোই লাগে। দ্বিতীয় প্রজন্মের জন্য অঞ্জলীর মন্ত্র সংস্কৃতে ছাড়াও ইংলিসে অনুবাদ করা হয়। এই দ্বিতীয় প্রজন্মের কাছ থেকে শুনেছি তাদের মনে দুর্গা পুজো, ভারতীয় পোষাক পরা, অঞ্জলী, প্রসাদ, পুজোর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা এগুলি বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। তারাও পরে তাদের বাচ্ছাদের নিয়ে পুজোমন্ডপে আসে। এখানেই প্রবাসের পুজো সার্থক। দুর্গাপুজো বাঙ্গালীয়ানা বা বাঙ্গালী সংস্কৃতির এক প্রধান অংশ এটা প্রবাসী বাঙ্গালীরা তাদের সন্তান-সন্ততির মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারে।দুর্গাপুজোর আরেকটা বৈশিষ্ট্য হল এই পুজো সার্বজনীন- মানে অনেকে মিলে করা। নিজের বাড়ীতে লক্ষীপুজো করছি-এরকম নয়। কাজেই সবাই মিলে একটা কাজ সুষ্ঠুভাবে করছি-এটাও একটা শেখার বিষয়। কেউ পৌরোহিত্য করছেন, কেউ রান্না দেখভাল করছেন, কেউ খাবার পরিবেশন করছেন, কেউ বাজার করছেন ইত্যাদি অসংখ্য কাজ। আমার প্রবাসের পুজো ভালোই লাগে। অনেক কিছু শেখার আছে। প্রবাসের পুজো শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, সংস্কৃতির ধারক ও বাহক।

Advertisements

One thought on “একটু আধটু কথা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s